আজ তেমন আছড়া-আছড়ির কাজ ছিল না। দ্রুতই গোসল সারতে পেরেছে ফুফু ভাইঝি। নাড়ার পালার আড়ালে দাঁড়িয়ে যখন কাপড় বদলাচ্ছে দুইজনে, রহিমা না, হাসু দেখে পুবদিককার কচুরি ভরতি পুকুরের ওপারে মুকসেইদ্দা চোরার বাড়ির পিছন দিককার জামগাছতলায় দাঁড়িয়ে একটা লোক বিড়ি টানছে আর আড়চোখে হাসুর কাপড় বদলানো দেখছে।
কথাটা ফুফুকে বলেনি হাসু। মনে মনে হাসছে। ওই বেডা, কী দেহো আমারে? আমার শইল অহন আর মাইয়ামাইনষের শইল না। দেহনের কিছু নাই।
লোকটা কে?
মান্নান মাওলানার বাড়িতে বহুদিন ধরে আসা-যাওয়া হাসুর। এই বাড়ির সব শরিককেই হাসু চিনে। আশপাশের বাড়ির লোকজন বউঝি পোলাপান সবাইকেই কমবেশি দেখেছে, চিনে। মুকসেইদ্দা চোরার বাড়ির লোকজনও তার অপরিচিত না। শুধু যার নামে বাড়ির নাম, ‘মুকুসেইদ্দা চোরার বাড়ি’ সেই মুকসেদ আলীকে কখনও দেখে নাই। যখনই এই বাড়িতে আসে তখনই শোনে চুরির দায়ে মুকসেদ আবার ধরা পড়েছে, আবার গেছে জেলে।
এবার কি ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছে মুকসেদ? ওই লোকটাই কি সে?
এসব ভাবতে ভাবতে ফুফুর বাড়ি ফিরেছে হাসু। বাড়ির লোকজনের খাওয়াদাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাদের খাওয়ার নিয়ম। মাকুন্দা কাশেমকে জেলে দেওয়ার আগেই হাফিজদ্দি নামে একজন গোমস্তা রেখেছেন মান্নান মাওলানা। বিলে গোরু চরাতে দিয়ে দুপুরশেষে সেও আসে ভাত খেতে। তিনজন মানুষ ক’দিন ধরে একলগে বসে ভাত খাচ্ছে। হাফিজদ্দি ভাত খায় খুবই আয়েশ করে, ধীরে সুস্থে। রহিমারও একই অবস্থা। হাসু খায় হুমহাম করে, দ্রুত। যেন এখনই নাকে মুখে ভাত গুঁজে কোনও জরুরি কাজে ছুটতে হবে। এই দেখে প্রথমদিনই হাফিজদ্দি তাকে বলেছিল, এমুন হরতরাইস্যা (ছটফটে) ক্যান তুমি? যেই খাওনের লেইগা দুইন্নাইদারি হেই খাওনডা জুইত কইরা খাও। লোকমান্ডা ভাল কইরা দেও।
হাসু কথা বলবার আগেই রহিমা বলেছে, কইয়া ফয়দা অইব না। হাসু এমন।
আজও তিনজন মানুষ এক বসে খেয়েছে কথা বলতে গেলে হয়ইনি। খাওয়া শেষ করে মাজায় বান্দা গামছা খুলে মুখ মুছেছে হাফিজদ্দি, রান্নাঘরের কোণ থেকে নারকেলের হুঁকা নিয়ে তামাক সাজাতে বসেছে। এখন অনেকক্ষণ ধরে তামাক টেনে আবার বিলমুখী মেলা দিবে। সন্ধ্যার আগে আগে গাইগোরু নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
হাফিজদ্দি তামাক নিয়ে বসার পরই ফুফুর গোলাঘরে এসে ঢুকেছে হাসু।
বাড়িটা এখন একেবারেই নিটাল। চৈত্র মাসের দুপুরশেষের রোদ স্থির হয়ে আছে গাছপালায়, ঘরের চালে আর উঠানে। পশ্চিমের ভিটির বাংলাঘরের ছেমায় চালের ছায়া এসে ওই দিককার উঠানের অনেকখানি জায়গা ছায়াময় করেছে। আর সাচ্চারা (সাতচারা) খেলার খোপ কেটেছে মান্নান মাওলানার বড়ছেলে মোতাহারের তিন ছেলেমেয়ে, শিরিন, নসু আর নৃরি। নূরি এখন তার বিধবা মায়ের বুকের কাছে শুয়ে ঘুমাচ্ছে বড়ঘর গোলাঘরের কোণে, পুব-উত্তরের ভিটির চৌচালা পাটাতন ঘরে। শিরিন আর নসু খেলছে। আট-নয় বছরের শিরিনের পরনে নীলের উপর সাদা বুটিদার পুরানা ছেঁড়া জামা আর হাঁটু তরি লম্বা প্যান্ট। প্যান্টের ইলাস্টিক ঢিলা হয়ে গেছে। এখন তার দান। কোনও একটা ঘরে চারা ছুঁড়ে মারার পর লাফিয়ে লাফিয়ে খেলছে সে। নসু উৎসুক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। লাফাবার তালে তালে প্রায়ই পরনের প্যান্ট কোমর ছাড়িয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে শিরিনের। খেলার ফাঁকেই প্যান্ট টেনে তুলছে সে।
নসুর পরনে খয়েরি রঙের মোটা কাপড়ের হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি। গেঞ্জিটা প্রায় নতুন। কয়েকদিন আগে গোয়ালিমান্দ্রা হাট থেকে কেনা হয়েছে।
কিন্তু ছেলেমেয়ে দুইটা একেবারেই চুপচাপ। খেলছে ঠিকই মুখে শব্দ নাই।
হাসু জানে চুপচাপ তারা হয়ে আছে মান্নান মাওলানার ভয়ে। খেয়েদেয়ে মান্নান মাওলানা এসময় ঘুমান। বাড়িতে হইচই হচ্ছে, তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে এটা কিছুতেই সহ্য করবেন না তিনি। উঠে দিকবিদিক ভুলে হাতের কাছে যা পাবেন তাই দিয়ে পিটাতে শুরু করবেন যে শব্দ করেছে তাকে। তার উপর স্ত্রী তহুরা বেগম বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ। বুক ধড়ফড়ানির ব্যারাম হয়েছে। কখনও কখনও বুকে ব্যথাও হয়। ডাক্তার বলেছেন হার্টের অসুখ। সারাদিন চোখ বুজে শুয়ে থাকেন। সামান্য শব্দেও দিশাহারা মতো চোখ খোলেন, বুক ধড়ফড়ানি শুরু হয় তাঁর।
এইসব কারণে বাড়িতে শব্দ বলে কিছু নাই।
এখন এই দুপুরশেষের নির্জনতায় চৈত্র মাসের হাওয়া বইছে গাছের পাতায়, তার একটা শনশন শব্দ আছে, আর রান্নাঘরের পিছন দিককার ঝকড়া মাথার তেঁতুল গাছে একটানা ডেকে যাচ্ছে একটা কাক। কা কা। মাওলানা সাহেবের যত ক্ষমতাই থাক, প্রকৃতির এইসব শব্দ তো তিনি থামাতে পারবেন না। তাঁর কথায় কি আর হাওয়ার চলাচল বন্ধ হবে, গাছের পাতারা নড়বে না। তাঁর কথায় শাসনে কি আর স্তব্ধ হবে মুক্ত পাখিরা, হাম্বা দিতে ভুলে যাবে গোয়ালের গাই গোরু!
এই নির্জনতায় হাসুর কথাটা যেন জোরেই শুনতে পেল রহিমা। চৌকিতে কাত হওয়ার আগে মুখে একটুখানি পান দিয়েছে। তহুরা বেগমের পান খাওয়ার স্বভাব আছে। তাঁর পান থেকে দুই-একটা টুকরা দীর্ঘদিন ধরেই সরিয়ে রাখে রহিমা, সুপারি খয়ের চুন সরিয়ে রাখে। কোনও কোনওদিন গিটঠ দিয়ে রাখে। আজও রেখেছিল। দুপুরের ভাত খেয়ে গোলাঘরের চৌকিতে কাত হয়ে এই পানটুকু অনেকক্ষণ ধরে চাবানোই রহিমার একমাত্র শৌখিনতা।
