তছি একবার মায়ের দিকে তাকাল, তারপর ফুঁ দিয়ে কুপি নিভিয়ে দিল।
মা অবাক। কুপি নিভালি ক্যা?
বোজ নাই কীর লেইগা নিভাইলাম?
বুজছি। কোনহান থিকা কেঐ য্যান না দেকতে পায় হাজামবাড়ির রোয়াইলতলার ঘরে রাইত দোফরে কুপি আঙতাছে। কেউ য্যান কিছু সন্দ না করে।
হ।
বাইরে মধ্যরাতের ম্যাটম্যাটে জোৎস্না আছে। ঘরের ভাঙাচোরা বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে জ্যোৎস্নার আভাস দেখা যায়।
তছি একবার জ্যোৎস্না দেখল। তারপর বলল, রুস্তম রিশকাআলারে খুন কইরা আমার যেই দশা অইছে, মা’র লগে মাইয়ার লগে খারাপ কামড়ি কইরা আইজ্জাদারও হেই দশাঐ অইছে। আমি পাগল অই আর যাঐ অই মাইয়ামানুষ তো! আমি তো ইচ্ছা করলেঐ কোনও মিহি চইলা যাইতে পারি না। দুইন্নাই ভইরা ঐত্তো খালি রুস্তম রিশকাআলা। যে যেহেনদা পারবো জঙ্গল মিহি টাইন্না নিতে চাইবো। কয়জনরে খুন করুম আমি! কয়জনের হাত থিকা বাঁচুম! এর লেইগা নিজেগো বাইত্তে, নিজেগো ঘরে কেঁতার তলে পলাইয়া থাকি। আইজ্জাদায় তো পুরুষপোলা, এর লেইগা হেয় পলাইছে বাড়ির বাইরে। পুরুষপোলাগো তো কোনও অসুবিদা নাই, যেহেনে রাইত হেহেনে কাইত। তয় আমার মনে কয় ফিরত আইবো আইজ্জাদায়। কয়দিন সংসার থিকা, বউ পোলাপানের কাছ থিকা পলাইয়া থাইক্কা, নিজের দোষের কথা, গুণার কথা যহন ইট্টু কইম্মা আইবো মনে, তহন ফিরত আইবো, দেইক্কোনে।
সত্যঐ কচ তুই?
হ সত্যঐ কই।
আল্লায় য্যান তাই করে গো মা, আল্লায় য্যান তাই করে। নাইলে এতডি পোলাপান লইয়া কী উপায় অইবো বানেছার!
তছি আর কথা বলল না। চুপ করে বসে রইল।
মা বলল, তরে একহান কথা জিগামু মা?
তছি শান্ত গলায় বলল, জিগাও।
তুই কি আসলেই পাগল, নাকি ভাল অইয়া গেছচ?
মায়ের কথা শুনে তছি অবাক হল। আথকা এই কথা জিগাইলা ক্যা? তুমি জানোনা আমি ছোডকাল থিকা পাগল, জন্ম থিকা পাগল।
হ জানি তো। জানুম না ক্যা? তুই তো আমার পেডেঐ অইছচ। মায় জানবো না মাইয়া কেমুন!
তয় আবার জিগাও ক্যা?
জিগানের কারণ আছে।
কী কারণ?
কয়দিন ধইরা আমার মনে অয় তুই আর পাগল না। তুই ভাল অইয়া গেছচ।
একথা শুনে একটুও অবাক হল না তছি। আগের মতোই ধীর শান্ত গলায় বলল, সত্য তোমার মনে অয় মা?
হ।
তছি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্য কথাঐ মনে অয় তোমার।
মা চমকাল। কী?
হ। আমি অহন আর পাগল না। আমি ভাল অইয়া গেছি। মাথা নাইড়া কইরা যেদিন কেঁতার তলে ঢুকছি হেদিন থিকা ইট্টু ইট্টু কইরা ভাল অইয়া গেছি মা।
একটু থেমে বলল, তয় ভাল অওন মনে অয় ঠিক অয় নাই মা?
ক্যা? ক্যা ঠিক অয় নাই?
আমার খালি ওই বেডার কথা মনে অয়। রুস্তম রিশকাআলা। মরণের সমায় কেমুন দাপড়ানডা দাপড়াইছিলো। বাঁচনের লেইগা কেমুন চেষ্টা করছিলো। কেঁতার তলে হুইয়া হুইয়া আমি খালি বেড়ার ওই চেহারা দেহি মা। ঘুমাইয়া থাকলেও দেহি, জাইগ্না থাকলেও দেহি। আর খালি নিজের মরণের কথা মনে অয়।
শুনে বুকটা কেঁপে উঠল মায়ের। কী, কী মনে অয়?
নিজের মরণের কথা। মরতে তো একদিন অইবোঐ। আমি যেমতে বেডার জান কবচ করছিলাম আজরাইল আইয়া আমার জানডাও তো ওমতেই কবচ করবো। তহন আমিও তো বেডার লাহান দাপড়ামু, বাঁচনের চেষ্টা করুম। আমার খালি এই হগল কথা মনে অয় মা। আর বেড়ার চেহারার বদলে আমি খালি তারবাদে নিজের চেহারা দেহি। গলায় য্যান ফাঁস দিয়া ধরছে আজরাইলে, চকু দুইহান বাইর অইয়া আইতাছে আমার, জিবলাহান বাইর অইয়া আইতাছে। মাগো, আমার তহন বহুত ডর করে মা। বহুত ডর করে।
মেয়ের কথা শুনে বুক তোলপাড় করে মায়ের। চোখ ফেটে নামে কান্না। কথা না বলে অন্ধকার ঘরে মেয়ের মাথাটা বুকে টেনে আনে। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে দুইহাতে মা’কে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে মেয়ে। ফিসফিস করে বলে, তুমি সব সময় আমার শিথানে বইয়া থাইক্কো মা। বইয়া বইয়া আমারে পাহারা দিয়ো। আমার জান কবচ করতে আজরাইল য্যান কেঁতার তলে না ঢুকতে পারে।
মা কোনও কথা বলে না। মা শুধু কাঁদে।
.
ও ফুবু, একখান কথা জিগামু তোমারে?
দুপুরের পর গোলাঘরের চৌকিতে কাত হয়েছে রহিমা। সারাদিনে এই সময়ই কিছুটা আজার পায় সে। সকাল থেকে শেষ দুপুর পর্যন্ত একটানা কাজ করে, বাড়ির লোকজনের খাওয়াদাওয়া যখন শেষ হয় তখন সে গিয়ে সামনের পুকুরে চওড়া তক্তা ফেলে যে ঘাটলা করা হয়েছে সেই ঘাটলায় বসে। ক’দিন হল হাসু আসছে তার কাছে। আসার পর থেকে ফুফুর লগে হাসুও আছে সবকাজে, সবসময়। ফুফুর লগে হাত লাগিয়ে সেও সকাল থেকে একটানা কাজ করে। তারপর ফুফু যখন ঘাটলায় গিয়ে বসে হাসুও যায়। হাতে অ্যালুমিনিয়ামের বদনা। ঘাটলায় বসে বদনা ভরে পানি তুলে গোসল করে দুইজনে। শুকনা কাপড়চোপড় রেখে যায় বাড়ির সামনের নাড়ার পালায়। গোসল শেষ করে নাড়ার পালার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাপড় বদলে ভিজা কাপড় হাতে আবার যায় ঘাটলায়। পুকুরের পানিতে কাপড় চুবিয়ে ঘাটলার তক্তায় দুই-তিনবার খুচে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে চিপড়ে আবার এনে মেলে দেয় নাড়ার পালায়।
মান্নান মাওলানার বাড়ির কাজের লোকদের সাবান ব্যবহারের কপাল নাই। মাসে এক দুইবার একটুখানি সোডা পায় রহিমা। ওই দিয়ে ত্যানা ত্যানা দুই-একখানা শাড়ি সিদ্ধ করে। মাস ধরে ধুলামাটি যা জমে শাড়িতে, গরম পানি আর সোডায় সেই ধুলামাটির যতটা না কাটে, বেশি কাটে ঘাটলার তক্তায় ফেলে রহিমা যখন কাপড়গুলি আছড়ায়।
