তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল নিখিল। তার হাতে চার বাটির পুরানা আমলের টিফিন কেরিয়ার। ছাপরাঘরের চৌকির উপর জ্বলছিল হারিকেন, হারিকেনের আলোয় নিখিলের মুখোন করুণ, বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল।
.
গভীর রাতে ভাত খেতে বসে তছি বলল, নাইতে গিয়া আমার মনডা বহুত খারাপ হইছে মা।
রোয়াইলতলার ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে পিতলের কুপি। সেই আলোয় খানিক আগে গোসল করে আসা তছিকে ভিজা ভিজা দেখাচ্ছে। মাথার চুল এখন বেলকাটার মতো লম্বা। হয়েছে। দিনভর কাঁথার তলায় থাকার ফলে, রোদহাওয়া গায়ে না লাগার ফলে শরীরের রং হয়েছে পাকা গাবের ভিতরকার মতো। মুখ ফুলে ঢলঢল হয়েছে। শরীরও মোটার দিকে।
মা বুঝতে পারে, শুয়ে থাকার ফল।
রাত অনেকখানি হয়ে যাওয়ার পর, বাড়ির লোকজন খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রোজ রাতের মতো আজও কাঁথার তলা থেকে বেরিয়েছে তছি। বেরিয়ে মাথার কাছে রাখা ধোয়া শাড়ি হাতে ঘর থেকে বেরিয়েছে। আজ ম্যাটম্যাটে একটুখানি জ্যোৎস্না আছে, সেই আলোয় পেসাব পায়খানা সেরে উঠানের কোণের চুলা থেকে একখাবলা নাড়ার ছাই তুলে অনেকক্ষণ ধরে দাঁত মেজে গেছে পুকুরঘাটে নাইতে। বদনা ভরে পানি তুলে অনেকক্ষণ ধরে নেয়ে খানিক আগে ঘরে এসে খেতে বসেছে।
হুমহাম করে খেতে খেতেই কথাটা বলল।
আজ ক’দিন হল বারেক ছেলেটি রানাদিয়া গেছে নানার বাড়ি বেড়াতে। গিয়ে দাদিকে ভুলেছে। রাতবিরাত যখন তখন নাতির কথা মনে পড়ে তছির মা’র। একদিকে তছির জন্য জ্বালা, অন্যদিকে নাতির জন্যও বুকটা পোড়ায়।
মানুষের যে কতরকমের অশান্তি!
দিনে ভাত তছি আজকাল আর খায় না। খায় রাতে। একবার সন্ধ্যারাতে, আরেকবার ভোররাতে। সন্ধ্যারাতে খেয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। অন্ধকারে ভূতের মতো সারারাত ঘুরে বেড়ায় বাড়িতে। পেটের ভাত হজম হওয়ার পর ঘরে এসে আরেকবার খায়। মা’কে। ডেকে তুলে আবার ঢুকে যায় কাঁথার তলায়। সে যতক্ষণ জেগে থাকে মা ঘুমায়, আর সে যখন ঘুমায় মা তখন জেগে বসে থাকে শিথানে।
নাতির জন্য ঘুমটা রাতে ক’দিন ধরে ভাল হয় না তছির মা’র। যখন তখন ভাঙে। আজও ভেঙেছে। ভাঙার পর উঠে বসে আছে। মা’কে জাগনা দেখেই কথাটা তছি বলল।
মা বলল, কীর লেইগা মন খারাপ অইছে তর?
তছি ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে চাবাতে চাবাতে বলল, আইজ্জাদার বউর লেইগা?
বানেছার লেইগা?
হ।
কী করছে বানেছা?
ঘাটপার গিয়া হোনলাম বিলাপ কইরা কানতাছে। নাদেরের বাপ গো, ও নাদেরের বাপ, আমগো হালাইয়া কই গেলা গা তুমি! এতডি পোলাপান লইয়া আমি অহন একলা একলা কেমুন করুম? আমার কথা নাইলে তুমি ভুইল্লা গেলা, এতডি পোলাপানের একজনের কথাও তোমার মনে অয় না? কেঐর লেইগা ইট্টু মায়া লাগে না? নাদেরের বাপ গো, ও নাদেরের বাপ, ফিরা আহো তুমি। আল্লা রসুলের দোহাই লাগে, ফিরা আহ।
ভাত খাওয়া শেষ করে ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খেল তছি। যে গামলায় খেয়েছে সেই গামলায়ই কচলে কচলে হাত ধুয়ে ফেলল।
তছির দুপুর আর রাতের ভাত একবারেই সন্ধ্যাবেলা নিয়ে আসে তছির মা। প্রথম প্রথম। আবদুলের বউ বিরক্ত হত, বলত, এইডা কোন রঙ্গের পাগলামি? এমুন তো কোনওদিন দেহি নাই যে কোনও পাগলের কাছে দিন গেছে রাইত অইয়া আর রাইত অইছে দিন। যত রঙ্গের কারবার এই বাইত্তে।
কিন্তু করার নেই কিছুই। মেনে নিতে হয়েছে। এই পাগলামির ভিতরে যে কী রহস্য জানে শুধু তছি, তার মা আর ভাই।
হাত ধুয়ে আঁচলে হাত মুখ মুছল তছি। দুঃখী গলায় বলল, এমুন কামডা আইজ্জাদায় কীর লেইগা করলো কও তো মা?
ইচ্ছা কইরা করছেনি? আমার মনে হয় জিনেরা যা কয় কউক, আইজ্জা বাইচ্চা নাই। ডাকাইতেঐ খাইছে অরে।
না ডাকাইতে খায় নাই। হেয় বাইচ্চাঐ আছে।
তুই কেমতে কচ?
আমার মনে কয়। আমি দেকছি আমার মনে যা কয় হেইডা সত্য অয়।
তছির কথা শুনে মা একটু উদগ্রীব হল। খুনের ঘটনার পর তছি অনেক বদলেছে। তার কথাবার্তা চালচলন এখন সুস্থ মানুষের মতো। মনের মধ্যে চেপে বসে থাকা অপরাধের চাপে বুঝি মাথার গন্ডগোল কেটে গেছে তার। এই ধরনের পরিস্থিতিতে কোনও কোনও পাগলের ভিতর আধ্যাত্মিক শক্তি এসে ভর করে। কামেল ফকির হয়ে যায় তারা। তছির তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি তো?
আল্লাহ, আল্লাহ! যদি তেমন হয়ে থাকে তছি তা হলে বেঁচে গেল। কামেল ফকির ধরনের পাগল মেয়েমানুষ কাউকে খুন করতে পারে এই সন্দেহ দারোগা পুলিশরা কখনও করবে না। জেল ফাঁসি কিছুতেই হবে না তছির।
অতি উৎসাহের গলায় মা বলল, ক তো তয় কী কয় তর মনে?
আমার মনে কয় আইজ্জাদার কিছু অয় নাই। হেয় ভাল মতনঐ বাইচ্চা আছে। দূরের। কোনও দেশগেরামে আছে। ইচ্ছা কইরাঐ বাইত্তে আহে না।
আইবো তর মনে অয়?
হ আইবো। না আইয়া পারবো না।
কীর লেইগা এমুন পলাইয়া রইছে?
মনে অয় আমার লাহান কোনও কাম করছে হেয়।
শুনে চমকে উঠল মা। কী? খুন করছে?
তছি বিরক্ত হল। আরে না, খালি খুন করনঐ খারাপ কাম নি? এইডা ছাড়াও তো কত খারাপ কাম আছে। খুনের থিকাও বড় খারাপ কাম আইজ্জাদায় হের মা’র লগে করছে। বউর ডরে মা’রে ভাত দেয় নাই।
হ এইডা ঠিক কথা।
তারবাদে মাইয়াডারে দিল জঙ্গলে হালাইয়া। খরচের ডরে দাফোন কাফোন করলো না। এই কামড়াও খারাপ।
তছির কথা শুনে অবাক হচ্ছিল মা। একদম ভাল মানুষের মতো কথা। বুঝদার মানুষের মতো কথা। কাঁথার তলায় শুয়ে শুয়ে কোন ফাঁকে পাগল মেয়েটা এভাবে বদলে গেল, ভাল হয়ে গেল! এভাবে কথা বলতে শিখে গেল কখন?
