নিজের বুকপকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল আতাহার, ম্যাচ বের করে সিগ্রেট ধরাল। তার ভঙ্গি দেখে আলী আমজাদ বুঝল, যত কায়দাই করুক আতাহারকে কিছুতেই সুরুজ আলমগীরের কাতারে সে নামাতে পারবে না। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব নাই ঠিকই তয় আতাহার তেমন কাক না। সব কিছুর পরও কোনও না কোনওভাবে নিজের মর্যাদা সে রাখে। আলী আমজাদের লগে সবই করে আবার দূরত্বও রাখে। ছোটখাটো নানা রকমের ছলচাতুরি করেও আলী আমজাদ দেখেছে শেষ পর্যন্ত আতাহার আলাদাই থাকে। নিজেকে সস্তা করে ফেলে না। সিগ্রেট নিতে বলে আজও ওরকম একটা পরীক্ষা আতাহারকে সে করল, আতাহার ঠিকই বুঝল ব্যাপারটা, ঠিকই ফসকে গেল। আলী আমজাদের সিগ্রেট ছুঁয়েও দেখল না।
এসব নিয়ে আতাহার আবার কোনও কথা তোলে কি না ভেবে চটপট অন্যদিকে কথা ঘুরাল আলী আমজাদ। হিন্দুগো থিকা কইলাম মোসলমানরা অনেক ভাল।
তার কথা লুফে নিল সুরুজ। কেমুন?
মোসলমান বাইত্তে কইলাম হিন্দুরা সহজে খায় না। আর হিন্দুগো রানঘরে যুদি কোনও মোসলমান হাইন্দা যায় তাইলে কইলাম চুলার বেবাক জিনিস হেরা হালাইয়া দেয়। আবার নতুন কইরা রান্দন চড়ায়। আর আমরা মোসলমানরা কত ভাল, হিন্দুগো হাতের বেক কিছুঐ খাই। এই যেমুন নিখিলার বলি দেওয়া মুরগি, ফুলমতির হাতের রান্ন। জানি যে হারাম খাইতাছি, তাও খাই। জাইন্না হুইনাঐ খাই।
আতাহার বলল, আপনে মিয়া বহুত পঁাচগি মানুষ। কথাবার্তা কোনমিহি ঘুরান বুজা যায় না।
আলী আমজাদ হাসল। আমি বাতাস বুইজ্জা চলি। বাতাস যেই মিহি যায় আমিও হেইমিহিঐ যাই।
এইডা আর আমারে কওন লাগবো না। আমি জানি। আমাগো দলের মইদ্যে আমিঐ আপনেরে সবথিকা ভাল চিনি। হোনেন, বহুত হারাম হালাল তো এতক্ষুণ ধইরা বুজাইলেন, অহন আমার একহান কথার জব দেন তো?
কও।
হিন্দুগো এইডা হারাম, ওইডা হারাম, হিন্দু মাইয়া হারাম না হালাল?
আলমগীর বলল, ধুৎ বেড়া! তুই খালি আকথা কচ।
আলমগীরকে ধমক দিল আতাহার। আকথা কইলে তর কী? তুই চুপ কর।
সুরুজ বলল, আমার হোনতে ভালঐ লাগে। আতাহর, তুই ক।
আলী আমজাদ বলল, তোমরা চুপ করো। জিগাইছে আমারে, জবটাও আমি দেই।
আতাহার বলল, দেন।
হিন্দুগো হাতেরডা খাওন যেমুন হারাম, অগো মাইয়া খাওনও অমুন হারাম।
না, আপনে কিছুই জানেন না। হোনেন আমার কাছে। মোসলমানের লেইগা হিন্দু মাইয়া পুরাপুরি হালাল। আমাগো ধর্মে আছে, যুদ্ধ কইরা বিধর্মীদের সম্পত্তি আর মাইয়াছেইলা দখল করবা। তাদেরকে ভোগ করবা। এইডা জায়েজ। এর লেইগাঐ একাত্তোর সালে পাকিস্তানি মেলেটারিরা খালি হিন্দু মারছে আর হিন্দু মাইয়াগুলিরে ধর্ষণ করছে। ওইডা জায়েজ, মানে হালাল।
আলমগীর তার হাতের সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে ছাপরাঘরের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে ধীর শান্ত গলায় বলল, ওই আতাহার, তুই তো মুসল্লিঘরের পোলা, ধর্মের কথা অনেক জানচ। তয় একহান কথা ক তো আমারে। আমগো ধর্মে বিধর্মীগো লইয়া যেই হগল কথা আছে, বিধর্মীগো ধর্মেও আমগো লইয়া তাইলে হেই হগল কথাঐ আছে?
হ। তর কথাডা আমি বুজছি। যুদ্ধ জয় করনের পর বিধর্মীগো সহায় সম্পত্তি আর মাইয়াছেইলা ভোগ করন আমগো লেইগা যেমুন জায়েজ, আমগো জাগায় যুদি অরা অয় তাইলে অইবো এইটার উলটা। অর্থাৎ আমগো সহায় সম্পত্তি আর মাইয়াগুলিরে ভোগ করন অগো লেইগা জায়েজ অইয়া যাইবো।
এইবার তাইলে আরেকহান কথার জব দে।
ক।
একাত্তোর সালে পাকিস্তানি মেলেটারিগো মইদ্যে কি হিন্দু সোলজারও আছিলো?
আরে না বেড়া?
তয় আমগো দেশের মোসলমান মাইয়াগুলিরে ধর্ষণ করলো কারা? ওই টাইমে তো তিনলাখ মা বইন ধর্ষিতা অইছে। তার মইদ্যে হিন্দু কয়জন আর মোসলমান কয়জন?
একশোতে নাইলে পঞ্চাশটাঐ ধরা যায় হিন্দু! বাকিডি? তাগো ধর্ষণ করছিল কারা?
সুরুজ বলল, আরে থো এই হগল প্যাচাইল। আইছি মদ খাইতে, শুরু অইছে। পলেটিস।
আলী আমজাদ বলল, তয় আলমগীর যে আওয়ামি লিগ সাপোর্ট করে, এইডা আইজ আবার বুজাইয়া দিলো। এই হগল প্যাঁচ আওয়ামি লিগ ছাড়া আর কেঐর মাথায় খেলবো না। কোনহান থিকা কথাডারে কোনহানে লইয়া গেছে।
আতাহার সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, আমরা এহেকজন এহেক পারটি সাপোর্ট করি, তারবাদেও দোস্ত। একলগে বইয়া মদ খাই।
বোজলাম, কিন্তু নিখিলা তোমগো দোস্ত অইলো কেমতে? তোমরা বেবাকতে বড়ঘরের পোলা, আর নিখিলা অইলো গরিব হিন্দুঘরের। ও তোমগো দোস্ত অইলো কেমতে?
সুরুজ বলল, এই কথার জব আমরা আগেও একদিন দিছি। আমরা চাইরজন কাজির পাগলা ইসকুলে একলগে পড়তাম।
আলমগীর বলল, গরিব অউক আর যাই অউক নিখিলরা বেবাকতে খুব ভাল। মা বাপ ভাই বইন, বেবাকতে।
আলী আমজাদ বলল, তয় আমি আগেও কইছি আইজও আবার কই তোমরা নিখিলারে দোস্ত মনে করো আর যাই মনে করো, ও কইলাম তোমগো তা মনে করে না।
ধুৎ মিয়া, না মনে করলে আমগো লগে দিনরাইত ও আছে ক্যা?
আছে নিজের স্বার্থে। তোমগো লগে আছে দেইক্কাঐ দ্যাশগেরামে এমুন দাপটে অরা থাকতে পারতাছে। তোমগো ডরে অগো কেঐ কিছু কয় না। নাইলে অগো বাড়িঘর জাগা জমিন বেবাক এতদিনে মোসলমানরা দখল কইরা হালাইতো। ফুলমতি আর ফুলমতি থাকতো না। বারাঙ্গনা অইয়া যাইতো।
আতাহার বলল, আমি আপনের লগে একমত। আমার দোস্তরা এইডা বুজুক না বুজুক আমি বুজি। বুজি দেইক্কাঐ নিখিলারে চাকরের লাহান খাড়াই। আর গোপন একহান খায়েশও আছে মনে। হেইডা আপনেগো কেঐরে কমুনা। একদিন ওই খায়েশহানও আমি মিডামু। আমিও আমার বাপের লাহান।
