দেলোয়ারার এই আচরণ ভাল লাগল না রাবির। সে যে ধরনের মন নিয়ে বিচার দিতে এল তার ধারকাছ দিয়েও গেলেন না দেলোয়ারা। ছেলেটাকে মেরেছে এটা যেন পাত্তাই দিলেন না।
ভিতরে ভিতরে রেগে গেল রাবি। চাপা গলায় বলল, আপনের কাছে আইলাম বিচার দিতে আর আপনে কথাডা গায় লাগাইলেন না, এইডা ঠিক করলেন না বুজি!
রাবির মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন দেলোয়ারা। তুই তাইলে কী করতে কচ? আমি গিয়া বইক্কামু (বকে আসব) মোতালেইব্বারে, না মাইরামু (মেরে আসব)।
হেইডা আপনে পারবেন না। হেই ক্ষমতা আপনের নাই। মোতালেইব্বা তো কইছে অর লগে কাইজ্জা করলে আপনেরে সুদ্দা বাড়িত থন বাইর কইরা দিবো।
কথাটা দেলোয়ারার খুবই গায়ে লাগল। ভুরু কোঁচকালেন তিনি। কী কইলি?
হ। বিশ্বাস না অইলে বাদলারে জিগান।
ছেলের দিকে তাকাল রাবি। কীরে বাদলা,কয় নাই?
বাদলা বলল, হ কইছে।
কো মোতালেইব্বা কো? ল তো আমার লগে।
তিন বয়সী তিনজন মানুষ যখন পা বাড়িয়েছে মান্নান মাওলানা এসে দাঁড়ালেন পালানে। বইন আছোনি বাইত্তে?
মান্নান মাওলানাকে দেখে বেতিব্যস্ত হল তিনজন মানুষ। দেলোয়ারা রাবি মাথায়। ঘোমটা দিল।
দেলোয়ারা কথা বলবার আগেই রাবি বলল, এহেনেঐ বইবেন না ঘরে যাইবেন হুজুর?
মান্নান মাওলানা রাবির দিকে তাকালেন না। দেলোয়ারার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ঘরে বহি, কী কও বইন! তোমার লগে কথার কাম আছে।
দেলোয়ারা বললেন, লন তাইলে ঘরে লন।
দেলোয়ারা আর মান্নান মাওলানা ঘরে ঢোকার আগেই প্রায় ছুটে এসে বড়ঘরে ঢুকল রাবি। উত্তরমুখি কামরায় রাখা হাতলআলা চেয়ারগুলির একটা আঁচলে মুছে পরিষ্কার করল। দেলোয়ারার সঙ্গে মান্নান মাওলানা এসে এই কামরায় ঢোকার লগে লগে বলল, বহেন হুজুর। বহেন।
মান্নান মাওলানা তবু রাবির দিকে তাকালেন না। দাঁড়ি হাতাতে হাতাতে তাকালেন দেলোয়ারার দিকে। বহো বইন।
মাথায় ঘোমটা দেওয়া দেলোয়ারাকে এখন অন্যরকম দেখাচ্ছে। বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক, বেশি ভারিক্কি। গুছিয়ে নরম ভঙ্গিতে একটা চেয়ারে বসলেন তিনি। চশমার ভিতর থেকে মান্নান মাওলানার দিকে তাকালেন। তিনি কথা বলবার আগেই রাবি বলল,
চা বানামু বুজি?
এবার রাবির দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। বানাও, ভাল কইরা চা বানাও। দুদ দিবা না। লাল চা। আদা তেজপাতা দিবা। গলাডা দুইদিন ধইরা খুসখুস করতাছে।
রাবি দেলোয়ারার দিকে তাকাল। আপনেরেও দিমু বুজি?
দেলোয়ারা বললেন, না। চা আমার ভাল্লাগে না।
রাবি যতক্ষণ বাড়িতে থাকে বাদলা আছে তার লগে লগে। মায়ের আঁচলটা ধরেই থাকে। এখনও আছে। চায়ের কথা শুনে রাবির আঁচল ধরে একটা টান দিল। রাবি বিরক্ত হয়ে ছেলের দিকে তাকাল। কী রে, এমন করচ ক্যা?
বাদলা ফিসফিস করে বলল, আমারেও ই চা দিও মা। বাডিতে কইরা দিও। ফুঁ দিয়া দিয়া খামুনে। চা খাইতে বহুত মজা।
দেলোয়ারা বললেন, ওই ছেমড়া কী কচ হাকিহুকি (ফিসফিস) কইরা?
রাবি হাসিমুখে বলল, না কিছু না। অন্যকথা।
তারপর ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে গেল।
দেলোয়ারা বললেন, কন মাওলানা সাব, কী কথা, হুনি।
মান্নান মাওলানা একটু গলা খাঁকারি দিনে। মুখখানা অমায়িক করে বললেন, তোমার বইনপো বাইত্তে আইবো না?
কে এনামুল?
হ।
আইবো।
কবে?
সঠিক কইতে পারি না। তয় তাড়াতাড়িঐ আইবো। বহুতদিন বাইত্তে আহে না।
এইবার আইলে আমারে ইট্টু খবর দিও। তার লগে কথার কাম আছে।
আইচ্ছা দিমুনে।
মান্নান মাওলানা হাসলেন। কী কথার কাম জিগাইলা না?
দেলোয়ারাও হাসলেন। যেই কথা এনামুলরে কইবেন হেই কথা আমার কাছে কইবেন কিনা জানি না তো!
কওনের কিছু নাই।
তাইলে কন।
তোমার বইনপোর তো টেকা পয়সার আকাল নাই! আল্লায় দিলে বহুত টেকা পয়সার মালিক হইছে। এখন তার উচিত আল্লার কাম করা।
সেইটা এনামুল করে মাওলানা সাব। আটরশি হুজুরের মুরিদ অইছে। কয়দিন পর পরঐ হুজুরের লগে দেহা করতে যায়। জাকাত ফেতরা ঠিক মতন দেয়, গেরামের গরিব মিসকিনগো কাপোড় লুঙ্গি দেয়, টেকা পয়সা দিয়া সাহাইয্য করে। কথায় কথায় মিলাদ শরিফ পড়ায়, মাদ্রাসার ছাত্রগো দিয়া কোরআন খতম দেওয়ায়। রোজার মাসে রোজঐ চাইর পাঁচজন কইরা রোজদাররে ইসতারি (ইফতার) করায়। আল্লার কাম অনেক করে এনামুল।
দেলোয়ারার কথা শুনে খুবই খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ভাল কথা, খুব ভাল কথা। আল্লার কাম করলে আল্লায়ও তাগো দেয়। তোমার বইনপোরেও আল্লায় দিছে এর লেগাই। তয় অহন আরেকখান বড়কাম এনামুলের করন উচিত।
কী কাম?
তোমগো এই পাড়ায় কোনও মজজিদ নাই। পুব পাড়ায় আমিন মুন্সির বাড়ির লগে ছোড একখান মজজিদ আছে। খাইগো বাইত্তে আছে বিরাট মজজিদ। তোমগো এই পাড়ায়ও একখান মজজিদ থাকন দরকার। এনামুলরে কও একখান মজজিদ কইরা দিতে। তুমি কইলে তোমার কথা হেয় না রাইক্কা পারবো না।
একটুখানি চুপ করে থেকে দেলোয়ারা বললেন, কথাডা মন্দ কন নাই। দেশে একখান মজজিদ কইরা দিলে নাম অইবো। বেবাকতে কইবো দেলরার বইনপোয় মজজিদ কইরা দিছে।
নামও অইবো আল্লার কামও অইবো। মচজিদ করন যে কত বড় ছোঁয়াবের কাম হেইডা কেঐরে কইয়া বুজান যাইবো না। আল্লায় কইছে, হে মমিন মোসলমান, হে আমার পেয়ারে বান্দা, রসুলের উম্মত, তোমাদের মইদ্যে যাহাদিগকে আমি ব্যাপক ধন সম্পদ দান করিয়াছি সেই ধন সম্পদের কিয়দাংশ তোমরা আমার কাজে ব্যয় করো। বলো সোবহানআল্লাহ।
