এসবের কোনও কিছুই যেন খেয়াল করল না ফুলমতি। আগের মতোই উদাস গলায় বলল, আমি জানি আতাহারগো লগে থাইক্কা তুই আসলে অগো মন ভুলাইয়া রাখচ, আমারে পাহারা দেচ। এইডা না করলে যহন তহন বিপদ অইবো আমার। আমরা হিন্দু মানুষ। আমগো পক্ষে থাকবো কেডা? রাইত বিরাইত যহন তহন অরা আইয়া….।
সিগ্রেট ছুঁড়ে ফেলে নিখিল রুক্ষ গলায় বলল, চুপ কর। এই হগল চিন্তা তর করন লাগবো না। আমি যা করতাছি, যেমতে চলতাছি এমতে চলনঐ ভাল।
কিন্তু আমার লেইগা তুই তর জীবন নষ্ট করতাছচ ক্যা? আমারে তুই আমার কপালের উপরে ছাইড়া দে। তুই তর পথ দেখ। আমার কপালে যা আছে তাই অইবো। মনে কর আমি তর বইন না, আমি তর ভাই।
নিখিল আর কোনও কথা বলল না, চুপচাপ উঠানের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। চৈত্রদিনের বিকালবেলার ছায়াময় রান্নাঘরে বসে থাকা দুটি ভাইবোনকে দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হচ্ছিল।
.
কী রে, মালাউনের বাচ্চায় দিহি অহনতরি আহে না!
কথাটা আতাহার কাকে বলল কেউ জানে না, তবে জবাব দিল সুরুজ। মনে অয় মুরগি কষাইন্না অয় নাই।
একথা শুনে খ্যাক করে উঠল আতাহার। চেডের (লিঙ্গের) কথা কইচ না। দুইহান মুরগি কষাইতে কতক্ষুন লাগে?
আলমগীর বলল, ছেমড়ারে মতো দোষ দিচ না। কাম তো খালি মুরগি কষাইন্না না! দুইফরের পর পয়লা গেছে মুরগি বিচড়াইতে। কোন বাইত্তে পাইছে কে জানে! তারবাদে হেই মুরগি লইয়া বাইত্তে গিয়া পয়লা জব করছে, তারবাদে ফইর মইর হালাইয়া মুরগি দুইহান বানাইছে। তারবাদে দিদিরে দিছে কষাইতে। এতডি কাম করতে সময় তো ইট্টু লাগবোঐ।
আলমগীরের কথা শুনে চৌকির পুবকোনায় বসা আলী আমজাদ চোখ তুলে তাকাল। আজ তার পরনে সাদা লুঙ্গি আর লাল সবুজের চেক হাওয়াই শার্ট। কোলের কাছে দুই হাতে ধরা কেরু কোম্পানির বড় বোতলের দুই বোতল মল্টেড হুইস্কি। পাঁচটা কাঁচের গ্লাস রাখা আছে পায়ের কাছে। নীল রঙের প্লাস্টিকের একটা পানি ভরতি জগ আছে। অর্থাৎ মদ খাওয়ার সব ব্যবস্থাই পাকা। শুধু নিখিল এলেই হয়।
কিন্তু নিখিলের জন্যই যে এখনও বোতল ভোলা হয়নি তা না। কষানো মুরগির মাংসের জন্যে অপেক্ষাটা চলছে। আতাহার আর আলী আমজাদ দুইজনেরই স্বভাব হচ্ছে গ্লাসে বড় করে চুমুক দিয়েই ঝাল ঝাল মাংস মুখে দেওয়া, তারপর সিগ্রেটে টান দেওয়া। এই না। হলে মদ খাওয়াটা তাদের জমে না। সুরুজ আলমগীরের অবশ্য এসব সমস্যা নাই, মদের লগে তাদের শুধু সিগ্রেট হলেই হয়। তারপরও মদটা যদি বাংলা হয়, সাধনা নয়তো শক্তি ঔষধালয়ের মৃতসঞ্জীবনী যদি ঠেকায় পড়ে খেতে হয় তখন গ্লাসে চুমুক দেয়ার পর পরই মুখের বদস্বাদ মারার জন্য চানাচুর লাগে। কারণ বাংলা আর মৃতসঞ্জীবনী দুটাই নিকৃষ্ট জিনিস, মুখে দিলে মনে হয় বরকির মুত খাচ্ছি।
তবে কেরু কোম্পানির মালের স্বাদ ভাল। এক্সপোর্ট কোয়ালিটির একটা ড্রাই জিন আছে, সেভেন-আপের লগে লেবু দিয়ে খেলে মন ভরে যায়। খেতে যেমন মজা নেশাও। হয় তেমন। কেরুর হুইস্কির মধ্যে মল্টেডটা অসাধারণ। সহজে পাওয়াই যায় না। এই জিনিসের লগে কেন যে ঝাল ঝাল কষানো গোস্তের দরকার হয় আতাহার আলী আমজাদের, আলমগীর সুরুজ কারও তা মাথায়ই ঢোকে না।
আলমগীর একবার বলতে চাইল, কনটেকদার সাব, বতল খোলেন। ঢালেন গেলাসে। আমরা মারতে থাকি। নিখিলা আহুক অর সুবিদা মতন।
তার আগেই আলী আমজাদ বলল, আলমগীর, তুমি একহান কথা ভুল কইছো।
আলমগীর অবাক হল। কোন কথা?
ওই যে কইলা নিখিলার অনেক কাম। মুরগি জোগাড় কইরা জব কইরা বানাইয়া তারবাদে ফুলমতিরে দিবো কষাইতে।
আলমগীর চোখ ছোট করে বলল, হ, মিছাকথা কইলামনি?
না ঠিকঐ আছে তয় একহান কথা কইছো ভুল।
কোনডা?
মুরগি জব করনের কথা।
আলমগীর কথা বলবার আগে সুরুজ বলল, ক্যা, এইডা ভুল ক্যা?
পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল আলী আমজাদ। নিজে সিগ্রেট ধরিয়ে খুবই হেলাফেলার সঙ্গে প্যাকেটটা ফেলে রাখল চারজন মানুষের মাঝখানে, ভাবটা এইরকম, যেন সে কাউকে সাধবে না, যার ইচ্ছা খাবে, যার ইচ্ছে নাই সে খাবে না।
সিগ্রেটে বড় করে টান দিয়ে আলী আমজাদ বলল, হিন্দুরা তো কোনও কিছু জব কইরা খায় না। কল্লাডা খালি কাইট্টা হালায়। পুজার সময় হোতনা না পাড়া বলি দেয়। বলি অইলো এক কোবে কলা নামায় দেওন। মুরগিও কইলাম অমতেঐ বলি দেয়!
সুরুজ তার স্বভাব মতো অবাক হল। কন কী?
হ।
আলমগীর বলল, মোসলমান অইয়া আমরা বলি দেওয়া মুরগির কষাইন্না গোস্ত খাই? ওইডা তো হারাম। বিসমিল্লা বইলা জবো না করলে কোনও জিনিস হালাল অয় না!
আলী আমজাদ বলল, হ। একে হিন্দু মাইয়ার হাতের রান্দন, তার উপরে বলি দেওয়া মুরগি, দুইডাঐ আমগো লেইগা হারাম।
সুরুজ সিগ্রেট ধরাল। প্যাকেটটা নিজের মনে করে আলমগীরের দিকে বাড়িয়ে দিল। খাবিনি?
দে।
বলে আলমগীরও সিগ্রেট ধরাল।
আতাহার অনেকক্ষণ ধরে থম ধরে আছে। মুখ দেখে বোঝা যায় নিখিলের উপর রেগেছে। আলী আমজাদ তাকে একটু প্রফুল্ল করতে চাইল। দুই হাতে ধরা মদের বোতল কোলের কাছে রেখে বলল, বোস্তাছি নিখিলার উপরে তুমি খুব চেচ্ছ। চেইত্তো না। আইয়া পড়বো নে। পাঁচজনে মদ খাইতে বইয়া একজনে চেইত্তা থাকলে মজমাড়া জুইতের অয় না।
সিগ্রেটের প্যাকেট দেখিয়ে বলল, নেও সিগ্রেট খাও। আতাহার নাক ফুলিয়ে বলল, আমার কাছে সিগ্রেট আছে।
