মায়ারানি বলল, হুগাউক আর যাই করুক, দিদির লাহান সোন্দর মাইয়া এই দেশে আর একজনও নাই। না হিন্দুগো ঘরে না মোসলমানগো ঘরে।
এই ধরনের কথা শুনলে ফুলমতির অস্বস্তি লাগে। ভেতরে ভেতরে কীরকম জড়সড় হয়ে যায় সে। এখনও হল। কিন্তু এই নিয়ে কোনও কথা বলল না।
মায়ারানি বলল, দিদি যুদি মোসলমান ঘরে জন্মাইতো তয় এমুন জীবন দিদির অইতো না। এত সোন্দর মাইয়া, এত গুণে ভরা, যেমন কামকাইজ যেমন লেখাপড়া চালচলন, জামাই মইরা যাওনের পরও বহুত বড়ঘরে দিদির বিয়া অইতো।
আরতি বলল, দিদি যুদি কইলকাত্তায় থাকতো তাও তার আবার বিয়া অইতো। আমি হুনছি ইন্ডিয়াতে আইজ কাইল হিন্দু বিধবাগো বিয়া হয়।
ফুলমতি শান্ত গলায় বলল, চুপ কর। এই হগল প্যাচাইল পারি না। আমার ভাল্লাগে না।
আরতি একটু একরোখা ধরনের মেয়ে। ধমকধামক পাত্তা দেয় না। তবে এখন সে অন্যকথা বলল। ও দিদি, আপনে কোন কেলাস তরি পড়ছেন?
ফুলমতি বলল, কোনও কেলাস না।
তয়?
বাইত্তে বইয়া বইয়া যেডু হিগার হিগছি।
মায়ারানি বলল, আপনের আসলে সবদিক দিয়াঐ পোড়া কপাল। বড়ঘরে জন্মাইলে বহুত বিদ্যান অইতেন আপনি। জজ বালিস্টার (ব্যারিস্টার) অইতেন।
পুষ্পর বোধহয় ক্ষুধা লেগেছে। একহাতে মায়ের বুক খুঁজছিল সে। মায়ারানি হয়তো বুকের দুধ দিতও মেয়েকে কিন্তু তখনই বারবাড়ির দিক থেকে হনহন করে হেঁটে ভিতর বাড়িতে ঢুকল নিখিল। হাতে ঝুলছে দুইখান ডেকরা মোরগ।
নিখিলকে দেখে মেয়েকে আর বুকের দুধ দিল না মায়ারানি। আরতিকে বলল, ল রে আরতি, বাইত যাই। নিখিল দাদায় আইছে, অহন কাম আছে দিদির। ওই যে মোরগ দেকতাছচ অহনঐ মোরগ জব কইরা কষাইয়া দেওন লাগবো দাদারে।
মায়ারানি বা আরতির দিকে তাকাল না ফুলমতি। নিখিলের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল, আইজ আমি আর কিছু পারুম না। আমার খুব কেলান্ত লাগতাছে।
নিখিল হাসিমুখে বলল, উপায় নাই। করন লাগবো। তুই তেল মেশলা বাইর কর, আমি মোরগ জব কইরা, বানাইয়া দিতাছি।
মায়ারানি আর আরতি তখন উঠান পেরিয়ে চলে যাচ্ছে।
ফুলমতি বিরক্ত গলায় বলল, দুই-চাইর দিন পর পর এইকাম আমার ক্যান করন লাগবো? তর অন্য দোস্তগো বাড়ির কেঐ রানতে পারে না?
পারে। তয় তর লাহান না।
এই হগল কথা কইয়া আমারে ভুলান লাগবো না। আইজ আমি পারুমঐ না।
নিখিল অনুনয়ের গলায় বলল, দিদি তো ভাল। আউজকারডা কইরা দে। এরপরে আতাহাররা আবার যেদিন কইবো, আমি কমুনে দিদির শইল ভাল না। দিদি আইজ পারবো না।
রান্নাঘর থেকে বঁটি নিয়ে মোরগ কাটতে বাড়ির উত্তর দিকককার জঙ্গলমুখী চলে গেল নিখিল।
ফুলমতি বুঝেছে, যত ক্লান্ত থাক আর যাই থাক, উপায় নেই। কাজটা তাকে করতেই হবে।
তারপর সে উঠেছে। ঘরে গিয়ে হাতের বই জায়গা মতো রেখেছে, চৌকির দিকে তাকিয়ে দেখেছে মা জেগে আছে না ঘুমিয়ে।
ঘুমিয়েই আছে।
ফুলমতি তারপর রান্নাঘরে এসে ঢুকেছে। মশলা কিছুটা বাটাই থাকে রান্নাঘরে, শুধু চাক চাক করে পিঁয়াজ কাটতে হবে। তারপর তেল মশলা পিঁয়াজ দিয়ে কষাতে হবে মাংস।
ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে ফুলমতি তারপর পিঁয়াজ কুটতে বসেছে। পেঁয়াজ কোটা শেষ হতে না হতেই মোরগ বানিয়ে পুকুরঘাট থেকে ধুয়ে পাকলে একেবারে রেডি করে নিয়ে এসেছে নিখিল। এখন শুধু চড়িয়ে দিলেই হবে।
গুছিয়ে রান্নাটা চড়াল ফুলমতি।
নিখিল একটা সিঁড়ি নিয়ে বসেছে বোনের পাশে। বসে বুক পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। উদাস হয়ে টানতে লাগল।
কয়েক পলক ভাইকে দেখল ফুলমতি, হঠাৎ করে বলল, তর দিন কি এমতে যাইবো নিখিল?
আচমকা এরকম একটা প্রশ্ন, নিখিল চমকাল। বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমতে?
এই যে দোস্তগো লগে আমোদফুর্তি কইরা, মদ খাইয়া, সংসারের মিহি না চাইয়া।
এইডা ছাড়া কী করুম ক! বাবায় যেই কামের কথা কয় হেই কাম ভাল্লাগে না।
তয় অন্যকাম কর। ঢাকা গিয়া চাকরিবাকরি ল।
একথা শুনে চমকে উঠল নিখিল। আরে না না, গেরাম ছাইড়া যাওন যাইবো না।
ক্যা?
নিখিল সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, এমতে।
একটু থেমে কথা যেন ঘুরাল। ঢাকা গিয়া আমার ভাল্লাগবো না। বেবাকতে দেশে থাকবো আর আমি থাকুম ঢাকা, টিকতে পারুম না দিদি।
ফুলমতি গম্ভীর গলায় বলল, খালি এইডাঐ কারণ?
তয় আর কী কারণ থাকবো, ক? তরা বেবাকতে এহেনে, আমার দোস্তরা এহেনে আর আমি গিয়া থাকুম ঢাকায়, ধুৎ, মইরা গেলেও আমি হেইডা করুম না।
মাংসের হাঁড়িতে হাতা দিয়ে খানিক উলট পালট করে ফুলমতি বলল, আমি কইলাম জানি তুই কীর লেইগা যাইতে চাস না।
কীর লেইগা ক তো?
আমার লেইগা।
কী?
হ। আমার কথা চিন্তা কইরা তুই কোনওহানে যাইতে চাস না। এক রাইত গেরাম ছাইড়া থাকচ না।
বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে নিখিল বলল, কে কইছে তরে?
আমি জানি। আমার লেইগাঐ আতাহারগো লগে দুস্তি কইরা চলছ তুই, অরা তরে চাকরের লাহান খাড়ায়, যা তা কইয়া গাইল দেয়, বেবাক তুই মাইন্না লইতাছচ খালি আমার লেইগা। নিজের জীবন তুই নষ্ট করতাছস আমার লেইগা।
নিখিল কথা বলল না। উঠানের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে সিগ্রেট টানতে লাগল।
হাঁড়ির মাংস আবার উলট পালট করল ফুলমতি। সেই ফাঁকে তেল মশলা লং এলাচের গন্ধ উঠে ছড়িয়ে গেল ঘরে। হাঁড়িতে বলকে ওঠা তেলজলের ঘড়ঘড় একটুখানি শব্দও পাওয়া গেল।
