ঠিকঐ কইছো। তয় এই হগল ছাড়াও আরেকহান জেলখানা আছে, দরবেশ সাবে কইতো, হেইডাঐ বলে আসল জেলখানা। নিজের মনের ভিতরের জেলখানা। কোনও মানুষ হয়তো এমুন কোনও অন্নাই কাম, পাপকাম করছে, যেইডা হেয় নিজে ছাড়া অন্য কেঐ জানে না, এমুন কোনও কোনও মানুষ আটকা পড়ে নিজের মনের জেলখানায়। হেই জেলখানার ভিতরে বইয়া তার মনডা খালি কান্দে। কাইন্দা কাইন্দা কয়, আমি এইডা কী করছি, ক্যান করছি! মনের জেলখানার গারদে মাথা কুইট্টা মরে। ওই জেল থিকা আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ তারে ছাইড়া দিতে পারে না।
হামিদা বলল, বুজছি। অহন ওডো, দুয়ার লাগাও। আমার ঘুম আইতাছে।
দবির উঠে দাঁড়াল।
চৌকির ওপর তখনও জেগে আছে নূরজাহান। মা-বাবার সব কথাই সে শুনেছে। শুনে নিজের জন্য এত দুঃখ হয়েছে! বুক ঠেলে উঠেছে কান্না। নিঃশব্দে তখন কাঁদছিল নূরজাহান। চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যাচ্ছিল তার।
২.৬ চৈত্রমাসে রাই যমুনার যে পথে
‘চৈত্রমাসে রাই যমুনার যে পথে নাইতে যেতেন, সে পথ জল ঢেলে কানু শীতল করে রাখতেন। দুপুরে পশরা নিয়ে যাবার সময় হাতজোড় করে এসে বলতেন, “এই দুপুরবেলা পথের ধুলো তেতে উঠেছে, তুমি এই কদমগাছের নীচে এসে খানিকটা বিশ্রাম করো, পথে আসতে বড় ব্যথা পেয়েছ!” তারপর রাই বসলে, কৌতুক করে বলতেন, “কত মণিমুক্তা তোমার গায়ে ঝলমল করছে। ব্রজের আহীরেরা দিনদুপুরে ডাকাতি করে, তুমি কোন সাহসে বের হয়েছ? এইখানে আমার কাছে থাকো। তোমার মুখখানি পদ্মের মতো, কী জানি যদি ভ্রমরের দল ফুল ভেবে দংশন করে! তুমি এইখানে আমার কাছে থাকো।”
তারপর, দানী সেজে রাইয়ের ওপর কত কৌতুকের জুলুম করেছেন, ‘দান দাও’ বলে পথ আগলে হাত পেতেছেন, সে সকল দিনের কথা স্মরণ করে রাইয়ের চৈত্রমাস কী করে কাটবে?’
এই তরি পড়ে ফুলমতি আনমনা হল। বহুপুরানা, পোকায় খাওয়া চটি বইখানা বন্ধ করে উদাস চোখে উঠানের কোণে তুলসী মঞ্চটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ফুলমতি বসে আছে পুবের ভিটির প্রায় ভেঙেপড়া দরদালানের বারান্দায়। বারান্দা আর দালানের ভিতরকার কামরাগুলি গোবর আর আঁটালমাটির মিশেল দিয়ে যত্ন করে লেপা, পয়পরিষ্কার। দরদালানে পলেস্তারা বলে কিছু নাই, শুধুই বহুকাল আগের ছোট সাইজের খয়েরি রঙের ইট চারদিকে। ছাদ দেওয়ালের কোথাও কোথাও এখনও জেগে আছে দুই এক চাক সুরকি। কখনও কখনও আপনা আপনিই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ে।
দরদালানের এদিক ওদিকে গজিয়েছে বট অশখের চারা। কোনও কোনওটা বড়ও। হয়েছে। চৈত্রদিনের বিকালবেলার হাওয়ায় নিজেদের মধ্যে যেন ফিসফাস করছিল বট অশখের পাতারা। পিছন দিককার কার্নিশে চাক বেঁধেছে মৌমাছি। দিনভর মধু নিয়ে চাকে আনাগোনা তাদের। দিনভর গুনগুন শব্দ।
এখনও শব্দটা পাচ্ছিল ফুলমতি।
বারান্দায় পুরানা ছপ (মাদুর) বিছিয়ে বসেছে সে। দুপুরের পর পর ঠাকরুনবাড়ির বড় পুকুরের পুবপারে কয়েক ঘর বাসিন্দার কোনও কোনও বউঝি আসে ফুলমতির কাছে। কখনও রামায়ণ মহাভারতের গল্প, কখনও পুরাণের গল্পগাথা, কখনও বা কোনও বই থেকে। ধর্ম আর দেবদেবীর কথা তাদেরকে পড়ে শোনায় ফুলমতি। এই সময়টা তার যেমন প্রিয়, যারা তার কাছে আসে তাদেরও তেমন প্রিয়। আর ফুলমতি কথা বলে এত সুন্দর করে, পড়ে এত সুন্দর করে, সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনে।
আজ ফুলমতির কাছে এসেছে গণেশ নাপিতের বড়মেয়ে আরতি আর নিমাইয়ের বউ মায়ারানি। মায়ারানির কোলে দুই বছরের মেয়ে পুষ্প। মেয়েটা এতই চুপচাপ ধরনের, শব্দ বলতে গেলে করেই না। মায়ের লগে সেও যেন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল চৈত্রদিনে কৃষ্ণের বিরহে। কাতর হওয়া রাধার মনোকষ্টের কাহিনি।
বাড়িতে এখন লোক বলতে ফুলমতির মা বাসনা। দুইদিন ধরে একটু একটু জ্বর তার। লগে খুসখুসা কাশিও আছে। এই নিয়ে সংসার সে একদমই সামলাতে পারছে না। কাঁথা গায়ে ওই তো শুয়ে আছে বারান্দার লগের কামরায়। সংসার দু’দিন ধরে সামলাচ্ছে। ফুলমতি।
বাপ রামদাস পানের কারবার করে। দেশগ্রামের লোকে আস্তে ধীরে তাকে পাউন্না বলতে শুরু করেছে। রামদাস পাউন্না। আজ সকালবেলা উঠে সে চলে গেছে মুনশিগঞ্জের ওদিককার রনছ পারুলপাড়া নামের এক গ্রামে। সেই গ্রাম পানের বরজে ভরা। সেখান থেকে সস্তায় পান এনে শ্রীনগর, দিঘলি আর নয়তো গোয়ালিমান্দ্রার হাটে বিক্রি করবে। এই কারবারে রোজগার তার মন্দ না।
বড়ছেলে নিখিলকে অনেকদিন ধরেই চাইছে এই কারবারে নামাতে। নিখিল গা করছে। না। বাপের মুখের উপর একদিন বলেছে, মইরা গেলেও পাউন্না অমু না।
কিন্তু রামদাসের ছোট দুইছেলে সেন্টু মিন্টু বাপের কারবারটা পছন্দ করছে। চাষবাসের ফাঁকে ফাঁকে পাউন্না হতে কোনও আপত্তি নাই তাদের।
বারান্দায় বসে উদাস হয়ে ফুলমতি কি এখন এসব কথা ভাবছে! নাকি ভাবছে তার নিজের কথা। বাল্যবিধবা জীবনের কথা!
আরতি বলল, কী অইলো? ও দিদি, আর পড়বেন না?
উদাস মুখোন হাসিহাসি করল ফুলমতি। না গো দিদি, আইজ আর পড়ুম না। ভাল্লাগতাছে না।
মায়ারানি বলল, ক্যা, কী অইছে আপনের?
কিছু অয় নাই। মা’র শইলডা ভাল না তো, দুইদিন ধইরা বাড়ির বেবাক কাম করি, শইলডা কেলান্ত লাগে।
আরতি বলল, হ। আপনের মুখ দেইক্কাঐ বুজা যাইতাছে। এত সোন্দর মুখহান হুগাইয়া গেছে।
