আহা এই সুখী চেহারা এখন আর নাই সেই বাড়িতে। কয়েক মাসের মধ্যে কত ঘটনা। ঘটে গেছে গাওয়াল বাড়িতে। মাইট্টাতেল খাইয়া মরল ছনুবুড়ি, বানেছার একটা মেয়ে। হল, নাভিতে পচন ধরে সাত দিনের মাথায় মরল সেই মেয়ে। খরচ বাঁচাতে মেয়ের দাফন কাফনও করল না গাওয়ালে। তারপর নিজে গাওয়ালে বেরিয়ে উধাও হয়ে গেল না। ডাকাতের হাতে মরল সেই হদিশও কেউ পাচ্ছে না।
আহা রে মানুষের জীবন! কখন যে কী থেকে কী হয়ে যায় আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ বলতে পারে না।
নূরজাহানের জীবনই যে এমন হবে নূরজাহান কি ভুলেও কখনও তা ভেবেছে! কোন কুক্ষণে সেদিন সে ছুটে গিয়েছিল সড়কপারে, দেশগ্রামের এতলোকে দেখছিল মাকুন্দাকে, এতলোকে টের পাচ্ছিল আসল ঘটনা কী ঘটেছে, কেউ ওই নিয়ে কোনও কথা বলল না, কাণ্ডটা ঘটাল নূরজাহান। সেই কাণ্ডের মাসুল দিতে দবির-হামিদাকে কতই না অনুনয় বিনয়ের মাশুল দিতে হয়েছে মান্নান মাওলানা আর আতাহারের কাছে, কত না হাতে পায়ে ধরতে হয়েছে তাদের। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে নূরজাহানকে আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়েছিল মরনি। ভয়ে আতঙ্কে জ্বরে পুড়ে মরতে বসেছিল নূরজাহান।
তারপর বন্দিজীবন।
এই বাড়ি হয়ে গেছে জেলখানা। বাড়ির চারদিকে আকাশসমান উঁচু হয়ে আছে লোহার গরাদ। সেই গরাদের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাবার উপায় নাই নূরজাহানের। দুই হাতে দুই গরাদ ধরে তার মাঝখানে মুখ রেখে অসহায় চোখে বাইরের দুনিয়া দেখা ছাড়া নূরজাহানের আর কিছু করার নাই।
তামাক খাওয়া শেষ করে কাটা বেড়ার লগে ঝুলিয়ে রেখেছে দবির। হামিদা বলল, রাইত ম্যালা অইলো। দুয়ার লাগানো, ঘুমাইয়া পড়ি।
দবির বলল, ধূর কীয়ের রাইত অইছে! চইত মাইস্যা গরম। আটু খোলা থাউক দুয়ার। হাওয়া বাতাস আহুক।
হাওয়া বাতাস কইত থিকা আইবো? থাকলে তো?
হ। ইট্টুও হাওয়া বাতাস নাই। তাও দুয়ার খোলা থাকলে আরাম লাগে।
যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় দবির বলল, গাওয়ালের লেইগা জিন ডাক দিছিলো বাইতে।
হামিদা উদগ্রীব হল। কী কইলো জিনে?।
হেরা তো খোলসা কইরা কিছু কয় না, ইশারা ইঙ্গিতে বলে বুজাইছে, বাইচ্চা আছে গাওয়ালে। অষইদ দিয়া গেছে। খাইতে কইছে বানেছারে। নিয়ম মতন খাইলে কাম অইবো।
ফিরত আইবো গাওয়ালে?
হোনলাম তো।
এইডা তোমারে কে কইলো?
দেলরা বুজিগো বাড়ির বাদলা। বাদলার লগে দেহা অইছিলো পুরানবাড়ির সামনে।
হামিদা দয়ালু গলায় বলল, আল্লায় য্যান তাই করে। গাওয়ালে য্যান ফিরত আহে।
খোলা দরজা দিয়ে অন্ধকার উঠানের দিকে তাকাল দবির। তয় গাওয়াল নিরুদ্দিশ অইয়া যাওনের পর থিকা আমার খালি তোতার বাপের কথা মনে অয়। এমুন পরহেজগার মানুষ, এই যে নিরুদ্দিশ অইলো, আর কোনদিন ফিরত আইলো না। জীবনডা ভর ধরণীখালায় হের লেইগা পথ চাইয়া রইলো।
হ গো, ঠিকঐ কইছো।
গাওয়ালেও যুদি এমুন করে? আর ফিরত না আহে?
এমুন কথা কইয়ো না। বাঁইচ্চা থাকলে ফিরত না আইয়া যাইবো কই?
মাইনষের অনেক যাওনের জাগা থাকে, জানো। একজন মানুষ যুদি ইচ্ছা করে যেহেনে ইচ্ছা ওহেনে যাইবো গা, যাইতে পারে।
বউ পোলাপান, সংসার?
এই হগলের মায়া কাডাইতে অয়। মায়ার বানহান (বন্ধনখানি) না কাডাইতে পারলে বিবাগী অইতে পারে না কেঐ। মাইনষের মনডা বহুত ঝামেলার, বোজলা না? কোনও কোনও মাইনষের আথকা মনে অইলো, ধুত্তরি, ঘোড়ারআন্ডা সংসার পোলাপান বউঝি দিয়া কী করুম, এই জীবন আমার ভাল্লাগে না। আমি এই সংসারে থাকুম না। যাইগা যেই মিহি দুই চকু যায়। মনের মইদ্যে একবার এই টান উটলে সংসারের মায়া কাটাইতে পারে মাইনষে। বিবাগী অইতে পারে। কত মানুষ আছে না বেবাক কিছু হালাইয়া বচ্ছরের পর বচ্ছর মাজার মোজারে পইড়া থাকে। সংসার বউ পোলাপান হালাইয়া নিরুদ্দিশে গিয়া নতুন কইরা বিয়াশাদি কইরা সংসার পাতে। আগের জীবনের কথা ভুইল্লা যায়।
হামিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ, মানুষ বহুত আজব পদের। কুনসুম যে মনের মইদ্যে কী টান দিবো, কী কাম যে তহন কইরা বইবো, হেয় নিজে তো জানেঐ না, এক আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না।
মুখ উঁচু করে চৌকিতে শোয়া নূরজাহানের দিকে তাকাল হামিদা। আমাগো মাইয়াডার কথা চিন্তা করো। যেই কামডা করছিলো, ওই কামডা কি অর করনের কথা! অলক্কিতে না টানলে এমুন কাম কেঐ করে! ওই একহান কামের লেইগা অর জীবনডা কেমুন বদলাইয়া গেল।
দবির মন খারাপ করা গলায় বলল, হ। মাইয়াডার কথা চিন্তা করলে আমার খালি মালেক দরবেশ সাবের কথা মনে অয়। দরবেশ সাবে কইতো, দুনিয়া ভইরা আল্লায় খালি জেলখানা বানাইয়া থুইছে। নানান পদের জেলখানা। কোনও জেলখানা দারোগা পুলিশের, কোনও জেলখানা সমাজ পনচাইতের, কোনও জেলখানা মা বাপ জ্ঞাতিগুষ্ঠির শাসনের, আর কোনও জেলখানা অইলো মাইনষের নিজের মনের ভিতরের জেলখানা। তুমি যুদি খুন খারাপি কইরা, চুরি ডাকাতি কইরা ধরা পড়ো, তয় দারোগা পুলিশের জেলখানায় যাইবা। সমাজের মাইনষের লগে যুদি কোনও অন্নাই কর, তয় সমাজ পনচাইত তোমারে একঘইরা করবো, এইডা অইলো আরেকপদের জেল। নূরজাহানের লগে আমরা যেইডা করতাছি হেইডা অইলো শাসনের জেলখানা। অর ভালর লেইগাঐ অরে আমরা আটকাইয়া থুইছি।
এই জেলখানাডা আমি মনে করি ভাল। মাইয়া মাইনষের এমুন জেলখানায় থাকনঐ ভাল। তয় আর বেশি তেড়িবেড়ি করতে পারে না।
