টাকা দেখে অবাক হয়েছে মরনি। বলল, কীয়ের টেকা?
হালাল টেকাঐ। মাইট্টালগিরি কইরা রুজি করছি। দুই হাজার থিকা পঞ্চাচ টেকা কম আছে।
এই টেকা আমারে দিতাছেন ক্যা?
তোমারে দিতাছি না, দিতাছি মজনুরে। কোনওদিন তো পোলাডার লেইগা কিছু করতে পারি নাই, আইজ কাইল মনে অয় কোনদিন রাইত্রে তোমার ঐ ঘরে হুইয়া ঘুমের তালে মইরা যামু, নাইলে মাডি ভরা গোড়া মাথায় লইয়া আছাড় খাইয়া পইড়া জানডা যাইবো, কোঁচড়ে টেকাডি থাকবো কিন্তু পোলারে দেওয়া অইবো না, এর লেইগা এই টেকাডি তোমার কাছে রাকতে আইছি বইন। টেকাডি তুমি রাখো। মজনুরে দিয়ো৷ দিয়া কইয়ো এক পোড়া কপাইল্লা বাপের ঘরে ও জন্মাইছিলো, বাপে অরে কিছু দিতে পারে নাই। না মায়া মহব্বত, না জাগা জমিন। তয় শইল্লের রক্ত দিয়া, জান পরান দিয়া রুজি করা শেষ সম্বল কয়ডা টেকা অরে দিয়া গেছে। এই টেকায় অনেক বরকত দিবো আল্লায়। ও যুদি কোনওদিন কায়কারবার শুরু করে, যুদি খলিফা দোকান দেয়, এই কয়হান টেকা ও য্যান কামে লাগায়। তাইলে মরণের পরও আমার মনডা শান্তি পাইবো বইন।
টাকাগুলি মরনির কোলের উপর রেখে দুইহাতে মরনির ডানহাতটা জড়িয়ে ধরল আদিলউদ্দিন। অনেকক্ষণ ধরেই বুক ঠেলে উঠছিল গভীর কষ্টের কান্না, সেই কান্না এখন আর ধরে রাখতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে জড়ানো গলায় বলল, আমার এই কথা তুমি রাইখো বইন। আর আমারে মাফ কইরা দিয়ো। মজনুরে কইয়ো অর পোড়া কপাইল্লা বাপটার উপরে য্যান রাগ না রাখে। বাপটারে য্যান মাপ কইরা দেয়।
আদিলউদ্দিনের কান্না দেখে মরনিরও তখন চোখ বেয়ে নেমেছে কান্না। কাঁদতে কাঁদতে কোনওরকমে সে বলল, আপনের জীবনডা এমুন অইলো ক্যান দুলাভাই? মজনু আর আমার জীবনডা এমুন অইলো ক্যান?
আদিলউদ্দিন জবাব দিতে পারল না। দুইজন মানুষের হৃদয় ভাঙা কান্নায় প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে ছিল।
.
গাওয়ালের কোনও খবর পাওয়া গেল না?
রাতের ভাত খেয়ে খোলা দরজার সামনে বসে তামাক খাচ্ছে দবির। অদূরে মেঝেতে পাতা হোগলার বিছানায় পা লম্বা বসে আছে হামিদা। সারাদিন সন্ধ্যার পরের সবকাজ সেরে এই সময়টা সে একদম আজার। খানিক আগে স্বামী কন্যাকে ভাত খাওয়াইয়া নিজে খাইছে। তারপর থালবাসন গুছিয়ে গা ছেড়ে বসছে। তামাক সাজাইয়া টানতে বসছে দবির আর নূরজাহান উঠে গেছে চৌকিতে। এখন মা-বাবার দিকে পেছন ফিরে শুয়ে আছে। কুপির আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না তাকে। ঘুমিয়ে পড়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।
আজকাল আগের মতো শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে না নূরজাহান। অনেকক্ষণ জেগে থাকে।
আগে সারাদিন টো টো করতো গ্রামে। এই বাড়ি যেত, ওই বাড়ি যেত। যখন তখন চকপাথালে ছুট লাগাত, একদৌড়ে চলে যেত সড়কপারে। ফলে ছুটাছুটির ক্লান্তিতে শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম। সারারাত হুশ থাকত না।
এখন সেইদিন নাই নূরজাহানের। এখন সে খাঁচার পাখি। চব্বিশ ঘণ্টা এই বাড়ির মধ্যে। এই ঘর রান্নাচালা ঘাটপার লাকড়িখড়ি রাখার ঘর আর বাঁশঝাড়তলার ওদিককার পেশাব পায়খানার ঘের, এই হচ্ছে নূরজাহানের দুনিয়া।
বাড়ি থেকে বেরুবার নামার মুখেই শুরু হয়েছে শস্যের মাঠ, চক। খানিকদূর দিয়ে মাটি ভরাট হয়ে আগাচ্ছে মহাসড়ক, কোনও কোনও উদাস দুপুর আর শেষ বিকালে বাড়ি থেকে নামার ওই মুখটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় নূরজাহান। বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে চকমাঠের দিকে। শস্যের মাঠ, মাঠের উপরকার আকাশ আর সড়কের দিকে তাকিয়ে নিজের জন্য দুঃখে মন কাঁদে। খোলা আকাশের তলায় পড়ে থাকা এই মাঠচক, সড়কপার, মেদিনীমণ্ডল গ্রামখানি, গ্রামের প্রতিটি বাড়িই একদিন তার ছিল। যখন যেখানে ইচ্ছা চলে যেত। মাঠচক আর সড়কপারে, গ্রামের মেঠোপথ এবাড়ি ওবাড়ি। জ্ঞাতি আত্মীয় না হয়েও কত আপন মানুষ গ্রাম জুড়ে। মানুষের কত আদর স্নেহ ভালবাসা, শাসন আর সোহাগ ছিল। একটিমাত্র ঘটনা এইসব থেকে সরিয়ে এনেছে নূরজাহানকে। এখন তার জীবন বন্দি মানুষের জীবন। বেদের খাঁচায় আটকে থাকা ডাহুক ঘুঘুপাখির জীবন।
আজ সন্ধ্যার পর চৌকিতে শুয়ে এসবই ভাবছিল নূরজাহান। তখনই কথাটা বলল হামিদা।
শুনে তামাক টানা বন্ধ করে দবির বলল, না। কোনও খবর পাওয়া যায় নাই। দেশ গেরামের বেবাকতেঐ হোনছে আজিজ গাওয়াল নিরুদ্দিশ অইয়া গেছে। চিনা জানা যে যেই মিহি যায় হেই মিহিঐ গাওয়ালের কথা জিগায়। কেঐ কোনও সমবাত দিতে পারে না। হাজামবাড়ির আবদুলের লগে আইজ বাজারে আমার দেহা অইছিলো। বহুত দুকু করলো গাওয়ালরে লইয়া। অগো বাড়ি আর গাওয়ালের বাড়ি তো একলগেঐ, মইদ্যে খালি একহান পুকঐর। এইবাড়ি থিকা কথা কইলে ওইবাড়ি থিকা হুনা যায়। অরা বলে হোনে, রাইত ভইরা বউডা বিলাপ কইরা কান্দে।
হামিদা বলল, কানবো না? এমুন জুয়ানমর্দ মানুষটা নিরুদ্দিশ অইয়া গেল, এতডি পোলাপান লইয়া বউডা বাঁচবো কেমতে?
হ।
আবার তামাক টানতে লাগল দবির।
নূরজাহান তখন চোখের ভিতর দেখতে পাচ্ছে আজিজ গাওয়ালকে, তার বাড়িঘর উঠান পালান। যেন বিকালের মুখে নূরজাহান গেছে সেই বাড়িতে। বাড়ির নামার দিকে গোল্লাছুট খেলছে নাদের-হামেদরা। বড়ঘরের ওটার একধাপ উপরে বসেছে বানেছা, তার বুক বরাবর একধাপ নীচে বসেছে পরি। খাটো ধরনের ঘনদাঁতের কালো কাকুই দিয়ে মেয়ের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে বানেছা। দুই-একটা উকুন আটকে যাচ্ছে কাকুইয়ের দাঁতে, ঝাড়ুর এক। টুকরা চিকন শলা রাখা আছে হাতের কাছে, সেই শলা দিয়ে উকুন বের করে একহাতের বুড়া আঙুলের নখে রেখে অন্যহাতের নখ দিয়ে পুটুস করে মারছে। কোলের ছেলেটা সেই ফাঁকে এসে মায়ের বুকের দুধের জন্য ঘেঙটি (ঘ্যানঘ্যান অর্থে) পাড়ছে। বানেছা ফিরেও তাকাচ্ছে না তার দিকে। দূরে, চেঁকিঘরের সামনে পিঁড়িতে বসে আপনমনে তামাক টানছে আজিজ গাওয়াল।
