মরনি লজ্জা পেল। থাউক এই হগল কথা কইয়েন না।
আদিলউদ্দিন বলল, নূরজাহানরে আশ্রয় দিয়াও বহুত বড় কাম তুমি করছিলা বইন। নাইলে সব্বনাশ অইয়া যাইতো মাইয়াডার। এই কামের ফল তুমি হাসরের দিন পাইবা।
এতক্ষণে মরনির মনে হল সে দাঁড়িয়ে আছে পাটাতনের উপর আর মানুষটা তার মুখামুখি উঠানে। ভাগ্যের ফেরে আজ সে মাটিয়াল কিন্তু মরনির বোনজামাই তো! মজনুর বাপ তো! যত রাগই তার ওপর থাক মরনির, অসম্মান তো তাকে সে করতে পারে না।
মরনি ব্যস্ত হল। আহেন ঘরে আহেন, বাইরে খাড়ই রইলেন ক্যা?
আদিলউদ্দিন একটু দ্বিধা করল, বিব্রত হল। তোমার ঘরে আহুম?
হ আইবেন না ক্যা?
এমন আন্তরিক গলায় কথাটা মরনি বলল, আদিলউদ্দিনের চোখ ছলছল করে উঠল। বিনয়ী ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল সে।
মরনি বলল, বহেন বহেন। কন দিহি কী কথার কাম আছে আমার লগে।
পানিতে চোখ ভরে গেছে আদিলউদ্দিনের। গামছার খুঁটে চোখ মুছতে লাগল সে।
মরনি বলল, কী অইলো? কান্দেন ক্যা?
আদিলউদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোকে পানি আইলো বইন। এই যে তুমি আমারে ঘরে ডাইক্কা বহাইলা, এতে আমি বোজলাম, আমার উপরে রাগটা তোমার আর নাই। এর লেইগা চোক্কে পানি আইলো।
থাউক কাইন্দেন না। দুফইরা ভাত খাইছেন?
হ বইন খাইছি।
কই খান, কেমতে খান?
পবনদের সঙ্গে রান্না করে খাওয়ার কথা বলল আদিলউদ্দিন। আজ যে মাটিয়ালের কাজ সে করেনি, আজ যে তার রান্নার কাজ ছিল সব গুছিয়ে বলল মরনিকে।
শুনে মরনি বলল। কী মানুষের জীবন কী অইয়া গেছে।
এইডা আমার কপালের দোষ। পাপের শাস্তি। যেই অন্নাই আমি আমার পোলাডার লগে করছিলাম হেই অন্নাইয়ের শাস্তি আল্লায় আমারে দিতাছে। তয় আমি অহন আর দুঃখু করি না। পাঁচওক্ত নমজ পইড়া আল্লারে কই, দরকার অইলে আমারে তুমি আরও শাস্তি দেও, শাস্তি দিয়া মাইরা হালাও, তাও আমার মজনুরে ভাল রাইখো৷ সুখে রাইখো আল্লাহ মাবুদ।
পরের ঘরের পোলাপানগো লেইগা দোয়া করেন না?
না।
ক্যা? অরাও তো আপনের ঘরে জন্মাইছে!
যেই পোলাপান বাপের শইল্লে হাত উডায়, বাড়িত থিকা পিডাইয়া বাইর কইরা দেয় বাপরে, হেই পোলাপানের লেইগা দোয়া আহে না বইন। অনেক সমায় চিন্তা করছি, পোলাপান মানুষ, না বুইজ্জা অন্নাই করছিল। আমি অগো মাফ কইরা দেই। মাফ আমি মনে মনে কইরাও দিছি, তাও অগো লেইগা আমার দোয়া আহে না। অগো কথা আমার মনেও আহে না। মনে আহে খালি মজনুর কথা, মজনুর মা’র কথা। তোমার কথাও মনে আহে বইন। তোমগো বেবাকতের লেইগা আমি দোয়া করি। যেই জীবন আমি একদিন ভুইল্লা গেছিলাম, আইজকাইল মনে অয় হেইডা আমার আসল জীবন আছিলো। হেই জীবনডার মইদ্যেই য্যান আমি আবার ফিরত গেছি।
একটু থেমে আদিলউদ্দিন বলল, মজনুর মায় মরণের পর, মজনুরে লইয়া তুমি আইয়া পড়নের পর যেই জীবনডা আমি পাইলাম হেই জীবনডার কথা ভুলেও আমার মনে পড়ে না। বইন। হেই জীবনডারে আমার নিজের জীবন মনে অয় না।
আদিলউদ্দিনের কথা শুনতে শুনতে মানুষটার জন্য অদ্ভুত এক মমতায় মন ভরে গেল মরনির। বহু বহুকাল পরে হলেও নিজের জীবনের ভুলটা বুঝতে পেরেছে সে। সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছে মজনু আর মজনুর মা’র জন্য দোয়া করে, মজনুকে কোলে পিঠে করে যে মানুষ করেছে তার জন্য দোয়া করে। ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হওয়া মানুষকে আল্লাহপাকও ক্ষমা করেন। আর মরনি আল্লাহর তৈরি সামান্য একজন মানুষ, সে কেন পারবে না সেই মানুষকে ক্ষমা করতে!
মরনি মায়াবী গলায় বলল, থাউক ওই হগল কথা আর চিন্তা কইরেন না। চিন্তা কইরা মনে কষ্ট পাইয়েন না। অহন কন কামকাইজ ঠিকঠাক লাহান করতে পারতাছেন নি, খাওন দাওন, নাওন ধোওন, ঘুম বেবাক ঠিকঠাক লাহান অয়নি?
অয় বইন, সবই ঠিকঠাক মতন অয়। তয় রাইত দোরে কোনও কোনও সমায় ঘুমড়া ভাইঙ্গা যায়। তহন যে কত কথা মনে অয়!
কী কথা?
মজনুর কথা মনে অয়, তোমার বইনের কথা মনে অয়। আর মনে অয় মরণের কথা!
বয়স অইলে মরণের কথা বেবাক মাইনষেরঐ মনে অয়।
কয়দিন ধইরা রোজ রাইত্রেঐ মনে অয়। আর তোমার বইনরে স্বপ্নে দেহি।
কন কী? এতদিন আগে মরছে বইনে, তারে স্বপ্নে দেহেন?
হ। একদোম পরিষ্কার দেহি।
কিছু কয় হেয়?
হ।
কী কয়?
কয় এতদিন ধইরা আমারে ছাইড়া আপনে আছেন কেমতে? আমার কথা আপনের মনে পড়ে না? আমার লেইগা মনডা আপনের কান্দে না? আমার তো কান্দে। আমার তো খালি আপনের লেইগা মনডা কান্দে।
শুনে মরনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার থিকাও নরম মনের মানুষ আছিলো আমার বইনে। বহুত টান আছিলো আপনের লেইগা। মরণের পর মতো বচ্ছরেও মনে অয় হেই টানডা যায় নাই। এর লেইগাঐ মতো ঘনঘন তারে আপনে স্বপ্নে দেহেন।
মনে অয়। আবার মনে অয়, আমার মউত বুঝি ঘনাইয়া আইছে। এর লেইগা তোমার বইনে আমারে ডাক পারে।
আরে না। আল্লায় আপনেরে আরও বহুতদিন হায়াত দরাজ করবো। অহন কন, কী কথার কাম আছে?
তার আগে কও তুমি আমার কথাডা রাকবা। তুমি আমার কথাডা হালাইবা না।
মরনি হাসিমুখে বলল, আগে কন। হুইন্না লই।
কোমরের কাছ থেকে নীল রঙের ময়লা মতন ছোট্ট একখান থুতি বের করল আদিলউদ্দিন। মুখটা চিকন রশি দিয়ে যত্ন করে বাঁধা। থুতির মুখ খুলে পঞ্চাশ একশো দশ বিশ আর পাঁচ টাকার একগাদা নোট বের করল। টাকাটা বাড়িয়ে দিল মরনির দিকে। টেকাডি ধরো বইন।
