প্রথম কণ্ঠ বলল, যাঁই কঁন্যা, যাঁই বাঁলকরা। আঁসসালামাইকুম।
টিনের চাল বেড়ায় আবার সেই শব্দ। ঘরের ভৌতিক পরিবেশ পলকে কেটে গেল।
বানেছা বলল, নাদের ম্যাচটা তর কাছে না?
হ মা।
কুপি আঙ্গা।
নাদের কুপি জ্বালাল। কুপির আলোয় আড়মোড় ভাঙল সবাই, নড়েচড়ে উঠল। নাজুকে চৌকির ওপর শোয়াইয়া দিয়া নেমে এল বানেছা। তার দেখাদেখি পরি আর জরিও নামল। হামেদ বাদলা সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। শুধু ফকির সেজদার ভঙ্গিতে অজ্ঞান হয়ে আছে। আসনের সামনে।
বাদলা এগিয়ে গিয়ে আসন থেকে পানির গ্লাস নিয়ে কয়েক ছিটা পানি দিল ফকিরের গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে জিনদের মতন ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল ফকির, সোজা হয়ে বসল। যেন গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠল। তারপর পকেট থেকে বগলা সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে সিগ্রেট ধরাল। সিগ্রেটে বড় করে টান দিয়ে আসনের টাকাটা যত্ন করে বুকপকেটে রাখল।
দুই মেয়েকে নিয়ে বানেছা তখন বাইরে গেছে কাজ সারতে। বেগ আছে নাদের হামেদ বাদলারও। উঠানের কোণেই কাজ সেরে ফেলল তারা।
কিন্তু হামেদের মন পড়ে আছে বাতাসার দিকে। কখন বাতাসা বিলি হবে, কখন চুষে চুষে বাতাসা খাবে।
কথাটা নাদেরকে সে বললও। ওই দাদা, ঘুম আইতাছে তো! বাতাসা দে।
নাদের বাতাসা নিয়ে সবাইকে দিল। নিজেও মুখে পুরল দুইখান।
ফকির বলল, আসনের ফুল বিয়ানবেলা পুকঐরে হালাইয়া দিয়ো। আর দুধ গরম কইরা খাইয়া হালাইয়ো।
তারপর বানেছার দিকে তাকাল। মাহাজনগো কথাবার্তা আপনে বোজছেন তো ভাবিছাব?
বানেছা গদগদ গলায় বলল, বুজছি। আইজ বড় মাহাজনেও আইছিলো। নাদেরের বাপের কথা হুইন্না যহনঐ আমার মোখে জট ছোঁয়াইছে তহনঐ বুজছি হেয় বাইচ্চা আছে। বরকির দুদ জোড়াফুল আর যেই অষইদ দিছে হেই অষইদ খাইলে হেয় বাইত্তে আইয়া পড়বো।
হ। তয় কাইলঐ খাইয়া হালাইয়েন।
আইচ্ছা।
নাদেরের দিকে তাকাল ফকির। একহান বালিশ দেরে ছেমড়া। ঘুমাই।
চৌকির উপর থেকে পরিষ্কার একখান বালিশ ফকিরকে দিল নাদের।
.
দুপুরের ভাত খেয়ে চৌকিতে একটু কাত হয়েছে মরনি, পাটাতন ঘরের দরজা আবজানো, সেই দরজার বাইরে, উঠানের দিক থেকে কে ডাকল, বইন আছোনি? বইন!
গলাটা চিনতে পারল না মরনি। ধড়ফড় করে উঠে বসল। কাপড়চোপড় গুছাতে গুছাতে বলল, কেডা?
আমি আদিলউদ্দিন।
মানুষটাকে চিনতে পারল মরনি। এই বাড়িতেই তাকে একদিন, বেশ কিছুদিন আগে আশ্রয় দিয়েছে সে। এই বাড়িরই দক্ষিণের ভিটির ঘরটায় থাকে। কখন এসে ঢোকে ঘরে, কখন বেরিয়ে যায়, মরনি টের পায় না। কাজ করে মাটিয়ালের, গোড়াটাও মরনিই দিয়েছে, তবু কয়েকমাস আগের সেই প্রথম দিনের পর মানুষটির সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি।
আজ কী মনে করে এল সে?
আবজানো দরজা পুরাপুরি খুলে মরনি বলল, কই থিকা আইলেন?
আদিলউদ্দিনের পরনে ধোয়া পুরানা লুঙ্গি, গায়ে গামছা চাদরের মতো জড়ানো, মাথায় টুপি। এই কয়েকমাসে বয়স যেন কয়েক বছর বেড়ে গেছে। কাঁচাপাকা দাড়িমোচের মুখ ভাঙাচোরা। চোখের কোলে গাঢ় হয়ে পড়েছে কালি। শরীরও রোগা। মনে হয় সামান্য ধাক্কাতেই মাত্র হাঁটতে শিখা শিশুর মতো টালমাটাল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।
মরনিকে দেখে ক্লিষ্টমুখে হাসল আদিলউদ্দিন। কেমুন আছো বইন?
আমি তো ভাল আছি। আপনে আছেন কেমুন?
আছি। আল্লায় রাকছে এক রকম।
কী মনে কইরা আইছেন?
ইট্টু কথার কাম আছে। মাস দেড়-দুই আগে একরাইতে বাইত্তে আইয়া মনে করছিলাম তোমারে ডাক দিমু, তোমার লগে কথা কমু, তোমার ঘরের দুয়ারের সামনে আইয়া খাড়ইছি, খালি ডাকহান দিমু, হুনি তোমার ঘরে কে জানি কান্দে। কারা জানি কথা কয়। এর লেইগা। তোমারে আর ডাক দিলাম না।
মরনি চিন্তিত হল। কবের কথা?
ওই যে যেদিন নূরজাহান মাওলানা সাবরে…
আদিলউদ্দিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই মরনি বলল, বুজছি বুজছি। আর কওন লাগবো না। নূরজাহানঐ কানতাছিল। অরে আমি জাগা দিছিলাম। অর মা-বাপে আইছিলো অরে নিতে।
আদিলউদ্দিন মুগ্ধ গলায় বলল, বহুত ভালকাম করছো বইন, বহুত ভালকাম করছো। বিপদে পড়া মাইনষেরে আশ্রয় দিলে হাসরের দিন আল্লায়ও তোমারে বেহেশতে আশ্রয় দিবো।
একটু থেমে বলল, বিপদে পড়া তিনজন মাইনষেরে তুমি এই তরি আশ্রয় দিছো। মা মরা পোলাডারে যেই বাপে হালায় দিল, হেই পোলাডারে বুকে তুইল্লা আনলা। লাইল্লা পাইল্লা ডাঙ্গর করলা। খলিফা কামে ঢাকা পাডাইলা। এর থিকা বড় আশ্রয় আর কী অয় মানুষের! তারবাদে পেডের পোলার থিকা তারে বেশি মহব্বত করো, এই মহব্বতও তো বড় একহান আশ্রয়।
মজনুর কথা ওঠায় মরনি আনমনা হয়ে গেল। উদাস চোখে দক্ষিণের ঘরের চালের উপর দিয়ে চোতমাসের রোদভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
আদিলউদ্দিন বলল, যেই বাপে পোলারে হালাই দিছিলো, একদিন আবার হেই বাপরেও তুমি আশ্রয় দিলা। এই যে আমি অহন মাইট্টালের কাম কইরা বাইচ্চা রইছি, এইডাও তোমার লেইগাঐ।
এবার কথা বলল মরনি। এমতে কইয়েন না। আপনে আমার মজনুর বাপ। আমার বইনজামাই। একদিন বহুত অন্নাই আপনে আমার মজনুর লগে করছেন। আপনের উপরে আমার বহুত রাগ। তারপরও রাগটা আমি ধইরা রাখি নাই।
তুমি মানুষটা বড় ভাল বইন। এর লেইগাঐ রাগহান ধইরা রাখো নাই। রাখলে আমারে দেহনের লগে লগে পিছাদা পিডাইয়া খেদাইয়া দিতা।
