আসনে জ্বলা মোমের আলো চৌকি তরি পৌঁছায়নি। এদিকটা আবছায়া হয়ে আছে। কেউ কারও মুখ দেখতে পায় না। এই অবস্থায় স্বামীর কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে গাল বেয়ে নেমেছে কান্না, বানেছা টের পায়নি।
রাত তখন অনেকটাই গভীর। বাইরে ঝিঁঝিপোকারা ডেকেই যাচ্ছে। চেঁকিঘরের পিছন দিককার গাছে একটা কাক একবার একটু শব্দ করেছে। ঠাকুরবাড়ির দেবদারু গাছে খানিক আগে বাগ দিয়েছে কোড়ল পাখিটা। পরির কোলের কাছে শুয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছে বদু।
আক্কাস ফকির আবার ধরেছে গান,
তোমায় কোন বনে যাইয়া লাগুর পাবো
দয়াল রে আমার।
কোন বনে যাইয়া লাগুর পাবো!
নাদের হামেদ বাদলাও আগের মতনই গলা মিলাচ্ছে।
গান গাইতে গাইতে একসময় পর পর তিনবার জলচৌকির আসনে পাঁচটা করে টোকা দিল আক্কাস ফকির। ফুঁ দিয়ে মোমবাতিগুলি নিভিয়ে দিল। ঘর ভরে গেল অন্ধকারে। ঘরের মানুষগুলির রক্ত চলাচল দ্রুত হল। ফকির টের পেয়ে গেছে মহাজনরা বাড়ির কাছাকাছি চলে আসছেন। আলোর সামান্য রেখা দেখলেও বাড়িমুখী হবেন না। তাঁরা চান গভীর অন্ধকার। অন্ধকারে প্রথমে ঘরের চালায় এসে বসবেন। তারপর হাওয়ার মতন করে ঢুকবেন ঘরে। সেই সময় ঘরের চালে বেড়ায় ধামধুম শব্দ হবে। ঘরে ঢুকে তাঁরা বসবেন জলচৌকির আসনে আর নয়তো ফকিরের পিঠে। তারা ঘরে ঢোকার লগে লগে পিঠ পেতে দিবে ফকির, একজন দুইজন তার পিঠে বসার লগে লগেই সেই ওজনে। জ্ঞান হারাবে ফকির। কিন্তু শরীর কিছুতেই নুইয়ে পড়বে না মেঝেতে। ওই অবস্থায়ই থাকবে। মহাজনরা চলে যাওয়ার পর, আলো জ্বালাবার পর দেখা যাবে সেজদার ভঙ্গিতে উপুড় হয়ে আছে ফকির তবে অজ্ঞান। তখন আসনে রাখা গ্লাসের পানিটার কয়েক ছিটা দিতে হবে তার গায়ে। তাতে জ্ঞান ফিরে পাবে সে। উঠে বসবে।
এসব নিয়ম দেশগ্রামের সবাই জানে।
এই কারণেই মোমবাতি নিভাবার লগে লগে নাদেরের এখন অন্য কিছু মনে না পড়ে পড়ছিল মহাজনরা চলে যাওয়ার পরের অবস্থাটা। ফকিরের সেজদার ভঙ্গিতে পড়ে থাকা দেহটা যেন সে দেখতে পাচ্ছিল।
ফকির তখন গাইছে,
নিদানকালে একবার দেখা দিয়ো
দয়াল রে আমার।
টিনের চালে ধামধুম শব্দ হল। ভূমিকম্পের মতন কেঁপে উঠল ঘর। বিশাল শক্তিশালী, অতিকায় কোনও প্রাণী যেন আজিজ গাওয়ালের পৈতৃকসূত্রে পাওয়া বহুকালের পুরানা চৌচালা ঘরের ঢেউটিনের বেড়া ভেঙে হুড়মুড় করে ঢুকে গেল ঘরের ভিতর। সেই শব্দ আর অন্ধকার মিলেমিশে এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর, ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি হল, প্রতিটি মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। চৌকির উপর বসা জরি একহাতে চেপে ধরল পরির হাত। পরি বসল মায়ের গা ঘেঁষে। আর নাদের হামেদ বাদলা আরও ঘন হল।
তখন অলৌকিক স্বরে সালাম দিল জিনেরা। পরপর তিনবার, তিন রকম স্বরে। বোঝা। গেল তারা তিনজন আসছেন। আর সেই সালামের শব্দে তাদের মুখ থেকে আসছিল। দারচিনি লং আর এলাচের গন্ধ। ঘরের পরিবেশ পবিত্র হয়ে যাচ্ছিল।
একজন খুনখুনা নাকিস্বরে বলল, কঁন্যা, ও কঁন্যা, কী চাঁও মা? চাঁও কী?
বানেছা বুঝল তাকে ডাকছেন মহাজনরা। জানতে চাইছেন কী চায় সে। কী জন্য ডেকেছে তাদেরকে!
বানেছা কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, কী কমু বাবারা, আপনেরা তো বেবাকঐ জানেন। নাদেরের বাপে গাওয়ালে গিয়া আর ফিরত আহে নাই। তার সম্বাত আমরা কিছু জানি না। বাইচ্চা আছে না মইরা গেছে কইতে পারি না।
অন্য একটি গলা ফ্যাসফ্যাসা স্বরে বলল, আল্লাহ বলো, আল্লাহ বলো।
অর্থাৎ আল্লার নাম নিতে বলছে। সঙ্গে শিসের মতন শব্দে দীর্ঘ একটা ফু। সেই ফুয়ের সঙ্গে ভেসে আসে দারচিনি আর লং এলাচের গন্ধ।
কিন্তু মহাজনরা কথা বলছেন না কেন? বলছেন না কেন আজিজ গাওয়াল বেঁচে আছে না ডাকাতরা সত্যি সত্যি তাকে মেরে ফেলেছে। কেন চুপ করে আছেন তারা!
তখনই বানেছার মুখে এসে পড়ে কার যেন এক গোছা চুলের পরশ! দুইবার, তিনবার। সেই পরশে কেঁপে ওঠে বানেছা। তা হলে বড় মহাজনও আজ আসছেন। তিনি হচ্ছেন জটাধারী। কোনও কথা বলেন না, শব্দ করেন না। ভাল সংবাদ থাকলে জটা বুলিয়ে দেন নিদানে পড়া মানুষের গায়ে।
বানেছাকে দিচ্ছেন।
তার মানে কী? সুসংবাদ আছে বানেছার? আজিজ গাওয়াল তা হলে মরে নাই? বেঁচে আছে। যখনই হোক ফিরে আসবে। এসব ভেবে প্রবল উত্তেজনায় বুক ফেটে যেতে চাইল বানেছার।
প্রথম কণ্ঠ তখন বলল, কঁন্যা, হাঁত পাঁতো। হাঁত পাঁতো।
অন্ধকারে নিজের ডানহাত সামনের দিকে মেলে দিল বানেছা। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে এসে পড়ল ছোট্ট সুগন্ধি গাছের শিকড়।
ফ্যাসফ্যাসা কণ্ঠ বলল, কাঁলো জীবের দুঁধ আর জোঁড়পুঁষ্প, বোঁঝলা, গৃঁহন কঁরবা, গৃঁহন। বুঁঝলা?
বানেছা বলল, বুঝছি বাবা, বুজছি। বরকির দুধের লগে জোড়াফুল আর এই অষইদ মিশাইয়া খামু।
প্রথম কণ্ঠ বলল, আল্লাহ বলো, আল্লাহ বলো।
অর্থাৎ বানেছা ঠিক বুঝেছে।
মহাজনরা আসার পর থেকেই নাদেরের মনে হচ্ছিল তাদের কথাবার্তা সে বুঝতে পারছে। বাবা বেঁচে আছে না মরে গেছে পরিষ্কার করে তারা কিছু বলছে না। সাহস করে সে। এখন জিজ্ঞাসা করে ফেলল, বাবায় বাইচ্চা আছে না মইরা গেছে বুজলাম না বাবারা? বাইচ্চা থাকলে বাইত্তে আইবো কবে?
বানেছা বলল, তর বোজনের কাম নাই। আমি বুজছি।
ফ্যাসফ্যাসা কণ্ঠ বলল, দুঁষ্ট বাঁলক। আল্লাহ বঁলো।
