আক্কাস ফকিরের সামনে জলচৌকির উপর আসন। আসনে কয়েকটা লাল রঙের জবাফুল, তার পাশে অ্যালুমিনিয়ামে বাটিতে আখিগুড়ের ছোট সাইজের বাতাসা, কাঁচের গ্লাসে গলা তরি ভরা কাঁচাদুধ আর এক গ্লাস পানি। তার পাশে টিনের চাউল ভরা মগে একথোকা আগরবাতি জ্বলছে। চারটা চিকন চিকন মোমবাতি জ্বলছে জলচৌকির চারপাশে। এসবের মাঝমধ্যিখানে দুইখান দশ আর একখান পাঁচটাকার নোট ভাঁজ করে রাখা।
আসরে বসার আগেই ঘরের কুপিবাতি সব নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু মোমের আলো। সেই আলোয় গভীর রাতের ঘরখানি গা ছমছমা হয়ে আছে।
নাদের হামেদকে ফকিরবাড়ি পাঠিয়ে বাদলাকে বানেছা পাঠিয়েছিল মাওয়ার বাজারে। আগরবাতি মোমবাতি বাতাসা আর দুধ আনতে গিয়ে মালেক দরবেশের বাড়ি থেকে জবাফুলগুলিও জোগাড় করে এনেছিল বাদলা। খুবই কাজের ছেলে। চট করেই আসন গুছাবার কাজগুলি করে ফেলেছিল। বানেছার শরীর মন কোনওটাই চলছিল না বলে ফকির সাহেবের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাটা করে দিয়ে গিয়েছিল রাবি। ঘোপায় দুইখান কইমাছ জিয়ানো ছিল। পিয়াজ মশলা দিয়ে সুন্দর করে রান্না করে দিয়ে গেছে সেই মাছ। ঢেঁকিছাটা আলা চাউলের (আতপচালের) ভাত রান্না করে দিয়ে গেছে। মাছ তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়ার পর দুধভাত খাওয়ার স্বভাব ফকির সাবের। ঘন দুধের লগে একদলা খাজুরা মিঠাই আর সামান্য ভাত এই না হলে তার খাওয়া শেষ হয় না। সেই ব্যবস্থাও রাবিই করে গিয়েছিল। প্রথমেই পোলাপানদের খাওয়াইয়া নিজে কোনওরকমে কয়েক লোকমা মুখে দিয়ে ফকির সাহেবকে খেতে দিয়েছিল বানেছা। তারপর দরোজা বন্ধ করে গুছগাছ করে বসেছে।
বাইরে তখন বেশ রাত। অন্ধকারে থইথই করছে চারদিক। নিজেদের নিয়মে ডেকে যাচ্ছে ঝিঁঝিপোকারা। গাছের পাতায় কখনও কখনও একটুখানি হাওয়ার শব্দ। ডানায় মৃদুশব্দ তুলে আকাশ পাথালে উড়ে যাচ্ছিল দুই-একটি বাদুড়।
ফকির তখন ধ্যানীভঙ্গিতে বসেছে আসনের সামনে। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছে। ঘরের ভিতর শব্দ নাই। এমন চুপচাপ, সবাই যেন শ্বাসও ফেলছে শব্দ বাঁচিয়ে।
অনেকক্ষণ পর মন্ত্রপড়া শেষ করল ফকির। নিয়মমতো সাবধান করল সবাইকে। জানো ঐত্তো মাহাজনরা হাকিকি হুনতে পারে না, হাসাহাসি হুনলে একমিনিটও থাকব না। আর যুদি কেঐ পাদপোদ দেয় তয় কইলাম আর রক্ষা নাই। কামের কাম তো অইবোঐ না, আমার উপরে দিয়া আজাব যাইবো।
শুনে সবাই সাবধান হল কিন্তু কেউ কোনও কথা বলল না।
ফকির তখন প্রথমে গুনগুনাইয়া তারপর ভোলা গলায় দরুদ পড়তে লাগল। তার লগে গলা মিলাল নাদের হামেদ বাদলা। চৌকিতে বসা বানেছাও নিচু গলায় গুনগুন করছিল। মোমের আলোয় ঘরের ভিতর তৈরি হয়েছে ভৌতিক অবস্থা।
দরুদ পড়া শেষ করে বিড়বিড় করে আবার মন্ত্র পড়ে ফকির। টুকটুক করে পাঁচখান টোকা দেয় জলচৌকির আসনে। তারপর ধরে মুর্শিদি।
সেই মুর্শিদিই চলছে এখন।
মুর্শিদি শেষ হওয়ার পর আবার সব চুপচাপ। বিড়বিড় করে আবার মন্ত্র পড়ে ফকির, আবার পাঁচখান টোকা দেয় আসনে। মুখ ঘুরিয়ে হামেদের দিকে তাকায়। ওই ছেমড়া তুই বলে বহুত ভাল গান করছ?
জিন ডাক দিতে বসে আচমকা এইরকম প্রশ্ন, হামেদ থতমত খেল। কে কইছে আপনেরে?
হুনছি।
বাদলা বলল, ঠিকঐ হোনছেন। সত্যঐ ও বহুত ভাল গান গায়।
তয় অহন একহান গা। ভাল গান অইলে মাহাজনরা তাড়াতাড়ি আহে।
চৌকিতে বসা বানেছা বলল, গাও বাজান, গাও।
নাদের কনুই দিয়ে গুতা দিল। গাচ না ক্যা?
হামেদ আর দেরি করল না। গলা ছেড়ে গান ধরল,
আমারে সাজাইয়া দিয়ো নওসারও সাজন
হইলে পরে মাগো আমার বিয়ারও লগন
কাঁচা বাঁশের পালকি করে মাগো আমারে নিয়ো!
জিন ডাকার আসরের লগে গানটা মানানসই কিনা কেউ ভাবল না। তবে গান শেষ হওয়ার পর আক্কাস ফকির মুগ্ধ গলায় বলল, গলাহান খুব ভাল রে তর। এমুন কঠিন গানডা বহুত সোন্দর কইরা গাইলি। এইডা আব্দুল আলিমের নামকরা গান। গানের অর্থ জানচ?
হামেদ বলল, না।
তর জাননের কথাও না। অনেক বড় মাইনষেও জানে না।
বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, আপনে জানেন ফকির সাব?
নাদের বলল, কী কচ বেড়া? ফকির সাব জানে না এমুন কথা আছে নি?
তয় অর্থডা আমগো কন।
অর্থ অইলো মরণ। নওসা অর্থ অইলো জামাই। বিয়ার জামাই। আর এই গানের মইধ্যে বিয়া অইলো মরণ। পোলায় মারে কইতাছে মরণের সমায় অইলে নাওয়াইয়া ধোয়াইয়া কাফোন ফিন্দাইয়া, আতর গোলাপ মাখাইয়া সাজাইয়া দিয়ো আমারে। আর কাঁচা বাঁশের পালকি অইলো লাচ টাননের খাট। যেই খাটে কইরা লাচ লইয়া যায় গোরস্থানে।
ফকিরের কথা শুনে চৌকি বসা বানেছার বুক তোলপাড় করে উঠল। যদি ডাকাতে সত্যি সত্যি মেরে ফেলে থাকে মানুষটাকে, যদি কচুরিপানাআলা পুকুরে, কাদার তলায় খুঁজে রেখে থাকে তার দেহ, যদি সত্যি তেমন হয়ে থাকে তা হলে কী দুর্ভাগ্য তার, মরণের পর কবরটাও পেল না। কাফন জানাজা কিছু পেল না। দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে তার খাট গোরস্থানমুখী বয়ে নিল না কেউ।
কেন এমন হল মানুষটার!
চট করেই তারপর সাতদিন বয়সের মেয়েটার কথা মনে পড়ল বানেছার। সামর্থ্য থাকার পরও, বাপ হয়েও মেয়ের দাফনকাফন করেনি আজিজ খরচের ভয়ে। এই অন্যায়ের প্রতিশোধই কি আল্লাহ আজিজের উপর নিল? প্রতিশোধ নেয়ার সময় আল্লাহ কি মনে মনে বলল, দেখ যে টাকার মায়ায় মেয়ের দাফনকাফন করিস নাই তুই, তারচেয়ে অনেক অনেকগুণ বেশি টাকা তোর তহবিল থেকে নিয়ে নিচ্ছে ডাকাতরা, সঙ্গে নিচ্ছে অনেক অনেক টাকা দামের মালছামান। মরা মেয়ের দাফন করিস নাই তুই, আমিও ডাকাতের হাতে তোকে মারলাম, আমিও তোর নসিবে গোর রাখলাম না। পুকুরের পানির পচা কাদার তলায় তোর লাশ থাকবে। জঙ্গলে ফেলা তোর মেয়েকে যেমন খেয়েছে শেয়াল খাটাসে, কাদার তলায় তর লাশ খাবে কচ্ছপ আর শামুক ঝিনুকে। আমার প্রতিশোধের নিয়মই এমন।
