হ।
এমুন সমায় ফকিরে হাঁটতে হাঁটতে আইয়া পড়ছে গোরস্তান বায়ে রাইখা তাগো খেত বরাবইর। আইয়া দেহে একজন যাইতাছে।
হামেদ অবাক হল, কেডা যাইতাছে?
নাদের তাকে একটা ধমক দিল। আগে হোনঐ।
আইচ্ছা ক।
একজন যাইতাছে, ফকিরে তারে পিছে থিকা দেকতাছে। তয় তার পাও দেহা যায় না। দেহা যায় খালি চুল। সাত-আষ্টহাত লম্বা অইবো চুল। হেয় য্যান চুলের উপরে ভর দিয়াঐ হাঁটতাছে।
কয় কী?
হ। এমুন দেইক্কা সেজাল খাঁ ফকিরের মনে অইলো হেয় লিশ্চই বড় কোনও কামেল দরবেশ অইবো। এই দরবেশরে ধরতে পারলে কাম অইবো। বসন্ত ভাল অইয়া যাইবো বাড়ির মাইনষের। আর কেঐ মরবো না। এই চিন্তা কইরা দিকপাশ আর চাইলো না সেজাল খাঁ ফকিরে। পিছ থিকা দৌড়াইয়া গিয়া প্যাচাইয়া ধরলো তারে। লগে লগে এমুন একহান ঝাড়া হেয় দিলো, ফকির তিন-চাইর কানি জমিনের হেই পারে গিয়া পড়লো। তয় দুকু পাইলো না ইট্টুও। উইট্টা দৌড়াইয়া গিয়া আবার আগের লাহান প্যাচাইয়া ধরলো। এইবারও ঝাড়া খাইলো, এইবারও গিয়া পড়লো তিন-চাইর কানি জমিনের হেইপারে। এইভাবে তিনবার।
একটু থামল নাদের।
হামেদ বলল, তারবাদে?
শেষবারের বার ঝাড়া হেয় আর মারলো না। ফকিরের মিহি মুখ ফিরাইলো। ওরে নাদান, কী চাচ?
ফকির সাবে কথা কইবো কী, তার চেহারা দেইক্কা টাস্কি লাইগ্যা গেল। এমুন নূরানি চেহারা, য্যান পুন্নিমার চান। হেয় আবার কইলো, ক কী চাচ? ফকির সাবে কাইন্দা। দিলো। বাবা, আমার বেবাক গেছে। বাইত্তে বসন্ত। আপনে দয়া না করলে বেবাকতে মরবো। হেয় কইলো, ঘর দুয়ার সাফ সুতরা কইরা রাখিস। কাইল হাজের বেলায় তগো বাইত্তে যামু।
ফকির সাবে বাইত্তে আইয়া এইকথা কেঐরে কইলো না। তয় নিজের ঘরহান সাফ সুতরা কইরা রাকলো। হাজের পর হেরা আইলো। সাতজন। চোকে দেহা যায় না কেঐরে, খালি উদিস পাওয়া যায়, কথা হুনা যায়। কইলো, তর ঘরে আসন দিচ। আমরা তর কাছে আমু। তয় এই বাইত থিকা বসন্তে আরেকজন যাইবো, তারবাদে সব ভাল অইয়া। যাইবো। ফকির সাবে জিগাইলো, বাবা আপনেরা কারা? কইলো, জিন। ডাকিনী যুগিনী। হুইন্না ফকির সাবে ডরাইয়া গেল। হেরা কইলো, ডরাইচ না। এমতে এমতে ডাক দিবি, আমরা আমু। আইয়া নিদান থিকা উদ্দার করুম। এইভাবে জিনডিরে পাইছিলোে সেজাল। খ ফকিরে।
হামেদ বলল, আর ওই যে কইছিলো আরেকজন যাইবো, হেইডার অর্থ কী? বসন্তে আরেকজন মরছিলো?
হ। ফকিরের ছোডভাই মরলো দুইদিন পর। তারবাদে বেবাকতে সাইরা উটলো।
অহনও কি সাতজন জিনঐ আছে?
না। আছে চাইরজন।
অন্য তিনজন কো?
ফকিরে বাইচ্চা থাকতে আসামের আরেক ফকিররে তিনহান জিন দিয়া দিছিলো। হেই তিনডা আছিলো সাই পাজি। ইট্টু এদিক ওদিক অইলেঐ ফকিররে বেদম মাইর দিতো। একবার বাড়ির তেতইল গাছ থিকা হালাই দিছিলো।
আর আসামের হেই ফকির সেজাল খাঁ-রে কী দিছিলো?
বাওন্ন জোড়া বান হিগাইছিলো, বানের ফিরানি হিগাইছিলো।
ওই হগলও কি আক্কাস ফকিররে দিয়া গেছে সেজাল খাঁ ফকিরে?
কইতে পারি না।
ততক্ষণে আক্কাস ফকিরের বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে ওরা। রোদ নেই। চোত মাসের শেষ বিকালে কোনও কোনওদিন একটা হাওয়া বইতে শুরু করে চকেমাঠে। সেই হাওয়াটা আজ বইছে। ফকির বাড়ির উঠানে উঠতে উঠতে সেই হাওয়ার পরশে নাদেরের। কী হল কে জানে, হামেদের মন ফুরফুরা হয়ে গেল। মনে হল ফকির সাবকে অবশ্যই বাড়িতে পাওয়া যাবে। আজ রাতেই জিনেরা তাদের ঘরে এসে বলে যাবে, ডাকাতে মারেনি। আজিজ গাওয়ালকে। সে বেঁচেই আছে। যে কোনওদিন মালছামান কাঁধে বাড়ি ফিরে আসবে।
আক্কাস ফকিরের উঠানে ফকিরের পোলাপানরা বউয়াছি খেলছিল, বড়ঘরের দরজায় বসে হারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করছে বকুলি, নাদের-হামেদের দিকে ফিরেও তাকাল না কেউ।
নাদের গলা খাকারি দিল। বকুলি তাকাল তাদের দিকে।
নাদের বিনীত গলায় বলল, ফকির সাবে আছে?
আছে। আসনে বাত্তি দেয়।
ইট্টু ডাক দিবেন।
দিতাছি।
বকুলি ডাকল। হোনছেন, আপনের কাছে মানুষ আইছে।
বেরিয়ে এল আক্কাস। পরনে লুঙ্গি আর গেরুয়া পাঞ্জাবি। মুখে দাড়ি মোচ, মাথায় বাবরি চুল। চুল দাড়ি সবই তেল চকচকা।
নাদের-হামেদের দিকে তাকিয়ে বলল, কই থিকা আইছো?
নাদের বলল, মেদিনমণ্ডল থিকা। আমার বাপের নাম আজিজ গাওয়াল।
নামটা শুনে উৎফুল হল আক্কাস। বুজছি, বুজছি। গাওয়ালের তো বলে পাঁচ-সাতদিন ধইরা খবর নাই। আসন দিবা?
হ। এর লেইগাঐ আইছি।
আইজঐ দিবা?
হ।
বেক ঠিকঠাক আছে?
হ ব্যবস্থা কইরাঐ আপনের কাছে আইছি।
তয় লও। অহনঐ মেলা দেই।
লন।
আক্কাস বকুলির দিকে তাকাল। আমার চাইদ্দইরহান দেও।
হারিকেনের চিমনি মোছা রেখে ঘরে ঢুকে স্বামীর চাদর নিয়ে এল বকুলি। চাদর যত্ন করে কাঁধে ফেলে আক্কাস বলল, লও মেলা দেই।
.
আমার এই আসরে আইসো দয়ালচান
আমার এই আসরে আইসো মুর্শিদচান!
আক্কাস ফকিরের লগে গলা মিলাচ্ছে নাদের হামেদ বাদলা। চৌকির ওপর পরি জরি বদু নাজুকে নিয়ে বসে আছে বানেছা। নাজু ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলে। বদু পরির কোল ঘেঁষে বসে আছে। জরি বসে আছে মা-বোনের গা ঘেঁষে।
মেঝেতে হোগলার উপর বোয়া সাদা চাদর বিছানো হয়েছে। তার উপর পশ্চিমমুখী হয়ে বসেছে আক্কাস ফকির। তার পিছনে দূরত্ব রেখে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে নাদের হামেদ বাদলা। তাদের পিছনে বন্ধ দরজা।
