দেলোয়ারা সব সময় সাদা থান পরেন। মাথার চুলও বেশিরভাগই পরনের থানের মতো। মোটাগাটা শরীর, গোলগাল ধপধপা মুখ, চোখে চশমা, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, সব মিলিয়ে দেলোয়ারা যে দীর্ঘকাল ধরে বিধবা এটা বোঝা যায়। কোনও কোনও বিকালের বিষণ্ণ আলোয় পালানে পায়চারি করা মানুষটাকে দেখে বুকের ভিতর অব্যক্ত এক কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে রাবির। দেলোয়ারা তার কেউ না, তারা এই অঞ্চলের মানুষই না, পদ্মাচরের মানুষ। চরে কাজকাম নাই, দুইবেলার ভাত জোটে না। এজন্য চরের অন্যান্য মানুষের মতো রাবিও স্বামী সন্তান নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে এপারে এসেছে। এপারে বিক্রমপুর, যুগ যুগ ধরে ধনী অঞ্চল। পদ্মা চরের মানুষেরা, চউরারা চিরকাল এপারেরটা খেয়ে পরে বাঁচে। রাবিও বাঁচছে। স্বামী সন্তান নিয়ে বাঁচছে।
এই অঞ্চলের পয়সাঅলা লোক বেশিরভাগই থাকে ঢাকায়। গ্রামে বড় বড় বাড়ি খালি পড়ে থাকে। ছোট সংসারের চউরা পরিবার পেলে বাড়িতে আশ্রয় দেয়। কাজ কাম দিয়ে সাহায্য করে, টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করে। দিনে দিনে অদ্ভুত এক আত্মীয়তা গড়ে ওঠে।
রাবিরও তেমন এক আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে দেলোয়ারার সঙ্গে। বোধহয় দেলোয়ারার উদাসীনতা দেখে বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে এজন্যই।
এই বাড়ির হদিস রাবিদেরকে দিয়েছিল মিয়াবাড়ির বাঁধা কামলা আলফু। একই চরের মানুষ তারা। দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে যাতায়াত আলফুর। এলাকার প্রায় সবাইকে চিনে, সবাই তাকে চিনে। আলফুর কথায় এই বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছে তারা।
বাড়িটা তিন শরিকের। দেলোয়ারা বড় শরিকের মেয়ে। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন বলে শ্বশুরবাড়ি আর যাননি। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছিলেন। মা বাবা গত হয়েছেন বহুকাল আগে। কোনও ভাই নাই, দুইটি মাত্র বোন তাঁরা। বড়বোনের বড় অবস্থা। ঢাকায় বাড়ি গাড়ি সবই আছে। ছেলেরা ব্যবসাবাণিজ্য করে কেউ, কেউ বিদেশে থাকে। দেলোয়ারার মেয়েটাও ছিল ঢাকায়, খালার কাছে। পড়াশুনা শিখিয়ে, ম্যালা টাকা পয়সা খরচা করে সেই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে দেলোয়ারার বোনপোরা। জামাই কাপড়ের ব্যবসা করে। অবস্থা ভাল। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার।
মেয়ে জামাই কিছুতেই চায় না গ্রামে পড়ে থাকেন দেলোয়ারা। তাদের কাছে গিয়ে থাকেন। যান দেলোয়ারা, তবে দুইচার দিনের জন্য। বেড়াতে। টাউনে বেশিদিন মন টিকে না বলে চলে আসেন। বাপের বাড়ির সম্পত্তি দেলোয়ারা না থাকলে গিলে খাবে লোকে। রাবিদের নিয়ে বাড়ি আলগান (আগলান) তিনি, ঘর দুয়ার জায়গা সম্পত্তি আলগান। এই করতে করতে অদ্ভুত এক মায়া পড়ে গেছে সবকিছুর ওপর। দুইচার দিনের জন্য ফেলে গেলেও মন খুঁত খুঁত করে।
বাড়ির অন্য দুই শরিকের ঘরে ম্যালা ছেলেমেয়ে। কর্তারা কেউ বেঁচে নাই, তাদের ছেলেমেয়েরা আছে। মেয়েদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেরা যে যার মতো সংসার করছে কেউ ঢাকায়, কেউ গ্রামে। কেউ আবার দুই জায়গায়ই। বউ ছেলেমেয়ে গ্রামে, নিজে থাকছে ঢাকায়। শুধু ছোট শরিকের চার নম্বর ছেলে মোতালেব থাকে বাড়িতে। গৃহস্থালী করে আর গ্রামে মাতাব্বরি সর্দারি করার চেষ্টা করে। দেশ গ্রামে তার দুই পয়সার দাম নাই। লোভী আর হ্যাঁচড়া ধরনের লোক বলে মোতালেবকে কেউ পাত্তা দেয় না। গ্রামের কোথাও তার কথা টিকে না বলে নিজের ক্ষমতা সে দেখায় বাড়িতে। বাড়িরও সবার সঙ্গে না, দেলোয়ারাদের ঘরে আশ্রিত রাবি, রাবির ছেলে বাদলা স্বামী মতলেব হচ্ছে তার ক্ষমতা দেখাবার জায়গা। সুযোগ পেলেই নানা রকমভাবে এদেরকে সে উৎপীড়ন করে। আজ যেমন মেরেছে বাদলাকে।
নিজে দুই চারটা খারাপ কথা শুনতে রাজি আছে রাবি, স্বামীকেও কেউ ছোটখাট অপমান করলে রাও করে না কিন্তু ছেলের গায়ে হাত দিলে তাকে রাবি কিছুতেই ছাড়বে না, সে যেই হোক।
মোতালেবকেও রাবি আজ ছাড়বে না। প্রথমে দেলোয়ারা বুজিকে সব বলবে, বুজি যদি বিচার না করে সে নিজে গিয়েই দাঁড়াবে মোতালেবের সামনে। মুখে যা আসে তাই বলে বকাবাজি করবে। বউ পোলাপানের সামনে যতদূর অপমান করার করবে। মোতালেব তো আর মারতে পারবে না তাকে! অন্যের বউঝির গায়ে হাত তোলা এত সোজা না। দেশ গ্রামে বিচার সালিস আছে।
ছেলের হাত ধরে দেলোয়ারার সামনে গিয়ে দাঁড়াল রাবি। বুজি, ও বুজি।
দেলোয়ারা তাকিয়েছিলেন আকাশের দিকে। রাবির ডাকে তার দিকে মুখ ফিরালেন। কী রে?
আপনের লগে কথার কাম আছে।
ক।
এই বিচার আপনের আইজঐ করন লাগবো, অহনঐ করন লাগব। না করলে এই বাইত্তে আমি থাকুম না। এই বাইত থিকা যামু গা।
চোখ থেকে মোটা কাঁচের চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে মুছতে লাগলেন দেলোয়ারা। শান্ত গলায় বললেন, কী অইছে ক।
আমার পোলারে মারছে।
কে?
আপনের ভাইয়ে।
কোন ভাইয়ে?
এই বাইত্তে আর কোন ভাই আছে আপনের! মোতালেব।
কীর লেইগা মারছে।
কইতর দেকতে গেছিলো।
বাদলার দিকে তাকাল রাবি। ঐ ছেমড়া কী দিয়া মারছে তরে, ক, বুজিরে ক।
বাদলা বলল, কিছু দিয়া মারে নাই। ঠাস কইরা পিডে একটা থাবর দিছে। তারবাদে গলা ধইরা ধাক্কা দিয়া খেদাইয়া দিছে।
কাঁচ মোছা শেষ করে চশমাটা আবার চোখে পরলেন দেলোয়ারা। নির্বিকার গলায় বললেন, আইচ্ছা, মোতালেবরে আমি কমুনে।
