ফকির করেছেনও তাই।
মরণ ঘনিয়ে আসার আগে আগেই আক্কাসকে দিয়ে গেছেন জিন। এখন আক্কাসই ডাকাডাকির কাজটা করে। সেজাল খাঁ ফকিরের রোজগারটা তারই হয়।
মরণের কয়েক বছর আগে অবশ্য আরেকটা কাজ আক্কাসের জন্য করেছিলেন ফকির। পাশের বাড়িটা সেজাল খাঁ ফকিরের এক জ্ঞাতির। সেই জ্ঞাতিবাড়ির তিন শরিকের মাজারো শরিকের এতিম এক মেয়ে ছিল, নাম বকুলি, বকুলির লগে আক্কাসের বিয়া দিয়া দিলেন। আক্কাস হয়ে গেল সেই বাড়ির ঘরজামাই। ফলে সারাক্ষণ সেজাল খাঁ ফকিরের বাড়িতে আর পড়ে থাকতে হয় না তাঁর। বকুলির আদরে সোহাগে শ্বশুরবাড়িতেই থাকে। দরকার হলে বারবাড়ির দিকে গিয়ে ফকির তাকে গলা ছেড়ে ডাক দেয়, পলকে আক্কাস এসে হাজির। ফকির মারা যাওয়ার পর তার ঘরের জিনের আসন তুলে নিজের ঘরে নিয়া আসছে। আক্কাস। সকাল সন্ধ্যা আগরবাতি মোমবাতি জ্বালায় সেখানে। জবা ফুল বাতাসা আর আধা গেলাস কাঁচা দুধ রাখে আসনে। যখন ইচ্ছা জিন তিনটা এখন আক্কাসের ঘরেই আসা।–যাওয়া করে। দুধ বাতাসা খেয়ে যায়। কাঠের তৈরি বড় জলচৌকি সাইজের আসনে যখন তখন এসে বসে থাকে, আক্কাস ছাড়া কেউ তাদের দেখতে পায় না বুঝতেও পারে না, তারা আছে, না নাই।
সেজাল খা ফকির মারা যাওয়ার পর চুল দাড়িমোচ আর পোশাক একেবারেই ফকিরের মতো করে ফেলেছে আক্কাস। গেরুয়া রঙের ফতুয়া আর লুঙ্গি, গরমকাল নাই, শীতকাল নাই কাঁধে খয়েরি রঙের পুরানা চাদর। ফকিরের মতন ঘনঘন বিড়ি খাওয়াটাও রপ্ত করেছে। অর্থাৎ সবকিছু মিলিয়ে আক্কাসই এখন সেজাল খাঁ ফকির। মরে গিয়েও সেজাল খা যেন এখনও বেঁচে আছে আক্কাসের মধ্যে।
আক্কাসকে লোকে ডাকে ফকির সাব’। সেজাল খাঁ ফকির বেঁচে থাকতে জিন ডাকার আসরে দিতে হত পাঁচ টাকা। এখন পঁচিশ টাকা। বেশি দিলে আপত্তি নাই। কম দিলে হাজার ডাকলেও জিন আসবে না। কাজ হবে না। গান গাইতে গাইতে গলা ছিঁড়ে ফেললে ঘরের চালায় এসে বসে থাকবে জিন, কম টাকার আসরে নামবে না। শব্দও করবে চালায়, জানান দিবে, আমরা আছি কিন্তু নামব না।
এসব কথা দেশগ্রামের সব মানুষই জানে।
হাঁটতে হাঁটতে বেশ খানিকটা পিছনে পড়েছিল হামেদ। দৌড় দিয়ে এসে ভাইকে ধরল। ক্লান্ত গলায় বলল, ওই দাদা, এতো জোরে আডচ ক্যা? আমি তর লগে আইট্টা পারি না! আউজকার দিনে কী আডাডা আটছি, দিগলি গেছি আইছি, আবার অহন যাইতাছি দোকাছি, আমার পাও দুইহান ভাইঙ্গা আহে দাদা। আস্তে হাঁট।
ভাইয়ের কথা শুনে মায়া লাগল নাদেরের। দাঁড়াল। তুই তো একলা দিগলি যাচ নাই, আমিও তো গেছি।
হামেদ হাসল। তুই বড়। আমি কি তর লাহান নি?
তয় তাড়াতাড়ি না গেলে ফকির সাবরে যুদি না পাই!
আমার মনে অয় পামু। আইজ আমার যা যা মনে অইছে সবঐ অইছে।
কেমুন? দিগলি যাওনের সমায় তুই একবার কইলি গিয়া যুদি ভাঙ্গারিকাকারে না পাই তয় এতাহানি জাগা আইট্টা আইয়া লাভ কী অইলো? আমি কইলাম, তুই চিন্তা করি না। দেকবি ভাঙ্গারিকাকায় দোকানে আছে।
হ।
অহনও দেকবি ফকির সাবে বাইত্তে আছে।
তয় তো ভালঐ।
নাদেরের লগে পা চালিয়ে খানিকদূর হাঁটল হামেদ। ওই দাদা, সেজাল খাঁ ফকিরে জিন পাইছিলো কেমতে হেই ঘডনাডা তুই জানচ?
হ জানুম না ক্যা?
তয় ইট্টু ক। কথা হোনতে হোনতে আড়নের কষ্ট উদিস পামু না।
নাদের একবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। এই হগল বহুতদিন আগের কথা। সেজাল খাঁ ফকির তহন পোলাপান। আমার থিকা পাঁচ-ছয় বচ্ছরের বড় অইবো। বিয়াশাদি করে নাই। বাপ চাচা ভাই বেরাদরগো লগে গিরস্তালি করে। ওই যে বিলের বাড়িডা আর গোরস্তান দেহচ ওই মিহি ম্যালা জমিন আছিলো তাগো।
বুজছি। তারবাদে?
হেই বচ্ছর এমুন ফাল্গুন চইত মাস, সেজাল খা ফকিরগো বাইত্তে বসন্ত উটছে। বসন্তে দুইজন মইরাও গেছে। খালি সেজাল খাঁ-রঐ ওডে নাই। আবার বিলের জমিনে হেই বচ্ছর বাঙ্গি বুনছে ফকিররা। বেদম বাঙ্গি অইছে খেতে। বেইনের (বেতফল) লাহান। পদ্মার হেইপার থিকা ছিপনাও লইয়া বাঙ্গি চোররা আহে। গাঙ্গের পারে নাও থুইয়া বিলে আইয়া ছালায় ভইরা বাঙ্গি চুরি কইরা, নৌকা ভইরা লইয়া যায়। রাইত্রে বিলে গিয়া খেত পাহারা না দিলে রক্ষা নাই। তয় ফকির বাড়ির বেবাকতের তো বসন্ত উটছে, কে যাইবো খেত পাহারা দিতে। আর একজনে তো রাইত ভইরা বিলে গিয়া বইয়া থাকতে পারবো না। যাইতে হয় তিন-চাইরজনে মিলা। সবমিহিঐ ঝামেলা।
একটু থামল নাদের। তারপর বলল, এক রাইতে ম্যাটম্যাইট্টা জোছনা উটছে। বাড়ির উডানে বাইর অইয়া সেজাল খাঁ ফকিরের মনে অইলো বিয়ান অইয়া গেছে। কয়দিন ধইরা কেঐ বাঙ্গি খেত পাহারা দিতে যায় না। খেতে কি বাঙ্গি আছে না বেবাকঐ চোরে লইয়া গেছে ইট্ট দেইক্কাহি। হেয় গেছে বিলে।
হামেদ বলল, আমার মনে অয় তহন বিয়ান অয় নাই। তহন রাইত দোফর।
নাদের অবাক হল। কেমতে বুজলি?
ওই যে জোছনা রাইত্রের কথা কইলি! ম্যাটম্যাইট্টা জোছনা আছিলো।
হ ঠিকঐ কইছচ। তহন রাইত দোফর।
আইচ্ছা ক। তারবাদে?
সেজাল খাঁ একলা একলা গেছে বিলে। গিয়া অবাক। চাইরমিহি এমুন নিটাল, একজন মানুষও নাই কোনওহানে। থাকবো কেমতে, তহন তো রাইত দোফর। তয় মনের মইধ্যে কেন জানি ডর ভয়ও নাই ফকিরের। বাইত্তে এমুন বসন্ত উটছে বেবাকতের, দুইজন মরছে। এই অবস্থায় মাইনষের কি আর উসজ্ঞান থাকে?
