পরির আচরণে কান্না ভুলে হতভম্ব হল বানেছা। অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল মেয়ের মুখের দিকে। তাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকা রাবির অবস্থাও একই রকম। সেও তাকিয়ে আছে পরির দিকে। ঢেঁকিঘরের ওটায় বসা নাদের-হামেদ কান্না ভুলে তাকিয়েছে পরির দিকে, বাদলাও তাকিয়েছে, জরি-বদু এমনকী অবুঝ নাজুও।
পরি কোনও কিছুই খেয়াল করল না, কোনও দিকেই তাকাল না। নাক ফুলিয়ে তেজালো গলায় চিৎকার করে বলল, আমার বাপে কিরপিন অইছিলো তোমার লেইগা। খুকির দাফোন কাফোন অয় নাই তোমার লেইগা। সংসারে বেডারা যা কয় তা অয়, আমগো সংসারে। বাবার কথার কোনও দাম আছিলো না। তুমি যা কইছো তাঐ অইছে। বাবার কথায় সংসার। চললে এই দশা আইজ অয় না। তুমি চাইলে এতডি ভাইবইনও আমগো অইতো না। তুমি। মনে করো আমি ছোড় মানুষ, আমি এই হগল কই ক্যা? ছোড অইলেও আমি সব জানি। নূরজাহান বুজি বেক কিছু আমারে হিগায় দিছে।
দাঁতে দাঁত চেপে পরি বলল, তুমি একটা বদ মাইয়াছেইলা। তোমার লেইগা বাবায় মরছে। এতডি ভাইবইন যুদি আমরা না অইতাম তয় গাওয়াল করন লাগতো না বাবার। খেতখোলা চুইয়া, গিরস্তালি কইরাঐ সংসার ভাল চলতো। গাওয়াল না করতে অইলে, গেরামে গেরামে ভার কান্দে লইয়া দৌড়াইতে অইলে ডাকাইতে বাবারে পাইতো কই? মারতো কেমতে? বাবায় মরছে তোমার লেইগা। তুমি একটা বদ মাইয়াছেইলা, শয়তান। মাইয়াছেইলা। তুমি মানুষ না, তুমি পেতনি।
বানেছাকে ছেড়ে রাবি তখন হাছড় পাছড় করে উঠেছে। উঠে দুইহাতে জড়িয়ে ধরেছে পরিকে। হায় হায় তুই আতকা এমুন শুরু করলি ক্যা মা? এই অবস্থায় মা’র লগে কেঐ এমুন করে? চুপ কর মা, চুপ কর।
রাগে ক্রোধে পরি তখন ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে। কোন ফাঁকে নতুন করে কান্নাও আসছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল তার। তবু বলল, বাবায় মরছে এই মাগির লেইগা। আমরা এতিম অইছি এই মাগির লেইগা। আমগো এতিম কইরা অহন ঢংগের কান্দন কান্দে মাগি।
পরির মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে থামাবার চেষ্টা করল রাবি। এমুন করিচ না মা, এমুন কথা কইচ না। মা’র লগে কে এমুন করে না। বিপদের দিনে ধৈর্য ধরতে অয়। আল্লার নাম ল।
বানেছা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, না কউক। কইতে দে অরে। যা মনে লয় কউক। সত্য কথাই তো কয়। আমিঐত্তো বেবাক সব্বনাশের মূল। পোলাপানের কথা নি, কয়দিন পর যহন ভাত দিতে না পারুম পোলাপানরে তহন অগো আতের মাইরও খাওন লাগবো। গুণার শাস্তি জনমভর এইভাবেঐ আল্লায় আমারে দিব।
এতক্ষণ ধরে এই বাড়িতে আছে, একটা কথাও বাদলা বলেনি। এখন পরিবেশ ঠান্ডা হওয়ার পর বলল, আইজ্জা কাকারে ডাকাইতেঐ মারছে না হেয় অহনও বাইচ্চা রইছে, না কী অইছে তার এইডা তো কেঐ কইতে পারে না। আগে তো জানন উচিত আসলে কী অইছে।
নাদের বলল, হেইডা আমরা কেমতে জানুম?
একহান কাম করলেঐ জানোন যাইবো। জিন ডাক দেওন লাগবো। জিনে আইয়া বেবাক কিছু কইয়া দিবো।
শুনে এই অবস্থায়ও বানেছা উৎসাহী হয়ে উঠল। নাদের-হামেদের দিকে তাকিয়ে বলল, তয় অহনঐ ফকির বাইত্তে যা বাজানরা। আমি বাদলারে দিয়া এইমিহি সব জোগাড় করি। তরা গিয়া ফকিরকে ডাইক্কা লইয়ায়। আইজঐ জিন ডাক দেই।
জিন ডাকার কথায় হঠাৎ করেই আশার সঞ্চার হল মানুষগুলির মধ্যে। সাড়া পড়ল। নাদের-হামেদ খুবই উৎসাহের সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। সকালবেলা দিঘলি গেছে, এতদূর হেঁটে গিয়ে এতদূর থেকে ফিরা আসছে, তার ওপর বাবাকে নিয়ে কান্নাকাটি, সব ভুলে গেল তারা। দুইজন একত্রে বলল, আইচ্ছা যাইতাছি।
তারপর দৌড়ে নেমে গেল ভাঙনের দিকে।
বাদলা তখন রাবিকে বলছে, ওমা, আমি আইজ রাইত্রে এই বাইত্তে থাকুম। জিন ডাক দেওন দেহুম।
রাবি নরম গলায় বলল, আইচ্ছা থাকিচ।
.
এখন নাদের হাঁটছে তার স্বভাব মতন।
হামেদ কিছুতেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না ভাইর সঙ্গে। নাদের হাঁটছে, তার সঙ্গে তাল রাখার জন্য হামেদ ছুটছে।
রোদ নরম হতে শুরু করেছে। দিন ফুরিয়ে এল। চারদিককার চকমাঠ গ্রাম গাছপালা মানুষের ঘরবাড়ি আর ঢাকা থেকে উঁচু হয়ে আসা ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সবখানেই দিনশেষের রোদ ফুরাতে বসেছে।
নাদেরের পিছন পিছন চকপাথালে হামেদ ছুটছিল দোগাছি বরাবর। দোগাছি গ্রামে ঢোকার মুখে সেজাল খাঁ ফকিরের বাড়ি। তিনি গত হয়েছেন কয়েক বছর হল। তার উপর ছিল জিনের আছড়। তিনটা জিন সারাক্ষণ থাকত তাঁর সঙ্গে। নিদানে পড়া মানুষ সেজাল। খা ফকিরকে ডেকে রাতের আঁধারে নিজঘরে জিন ডাকিয়ে মুশকিলের আছান চাইত। জিনেরা পথ বাতলে দিয়ে যেত।
সেজাল খাঁ ফকির গত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মেয়ে স্ত্রী কেউ পায়নি জিন, পেয়েছে পাশের বাড়ির আক্কাস মাঝি। আক্কাস এই গ্রামের লোক না, কালিরখিলের ওদিককার বেলদার বাড়ির লোক। খরালিকালে ঘোড়া বাইতো। নিজেদের রোগা ঘোড়াগুলির পিঠে চাপিয়ে হাটবাজারে মাল বইত, আর বর্ষাকালে বাইতো কেরায়া নৌকা। লঞ্চঘাট থেকে, হাটবাজার থেকে লোকজন পৌঁছাত যার যার বাড়িতে। কখনও কখনও নাইওরি আনা নেওয়ার কাজও করত।
এই আক্কাস একসময় সেজাল খাঁ-র মুরিদ হয়ে গেল। যুবক বয়স। বিয়াশাদি করে নাই। সংসার মা বাপ ভাই বোন ঘোড়া আর নৌকা বাওয়া বাদ দিয়ে সারাক্ষণ ফকিরের সঙ্গে। ফকির যেখানেই জিন ডাক দিতে যায়, ছায়ার মতো তার লগে আছে আক্কাস। গানের গলাটা ভাল। জিন ডাক দেবার সময়কার গানগুলি খুবই ভাল গায়। অতি নরম বিনয়ী ভালমানুষ। জিন ডাক দেওয়ার কাজ না থাকলেও ফকিরের লগে লগেই থাকে। বাড়ির কাজকাম সব করে দেয়। সেজাল খ ফকির তো তাকে পছন্দ করতই, লগের তিনটা জিনও খুবই পছন্দ করত আক্কাসকে। এই কারণেই ফকির বলেছিলেন, আমি মইরা যাওনের পর বাবারা তো আর অন্য কেঐর কাছে যাইতে চাইবে না, তরেঐ দিয়া যামু তাগো। ডাক দেওনের নিয়ম কানুন মন্ত্র বেবাক হিগাইয়া দিয়া যামু।
