আবার কান্না বাড়ে বানেছার। ফিরত আইবো কেমতে? বাইচ্চা থাকলে তো আইবো? বাইচ্চা হেয় নাই। হেরে ডাকাইতেঐ খাইছে। টেকাপয়সা মালছামান রাইক্কা হেরে মাইরা এমুন হানে হালাই দিছে দুইন্নাইর কেঐ বিচড়াইয়া পাইবো না।
বানেছাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে রাবি। অলইক্কা কথা কইয়েন না ভাবিছাব, অলইক্কা কথা কইয়েন না। কিছু অয় নাই হের। হেয় বাইচ্চা আছে।
বাইচ্চা থাকলে বাইত্তে আহে না ক্যা? কই গিয়া পলাই রইছে? কোনওদিন তো এমুন করে নাই হেয়। হায় হায় রে, কোন গজব নাজিল অইলো আমার সংসারে! মাইয়াডারে দাফোন না করনের পাপে ধরল? হেই পাপে শেষ অইলো নাদেরের বাপে! হায় হায় এইডা কী অইলো! কী অইলো!
জরির পাশে দাঁড়ানো বদু কাঁদতে কাঁদতে বলল, মায় এমুন করে ক্যা? মা’রে এমুন করতে দেইক্কা আমারও তো কান্দন আহে।
জরি চোখ মুছতে মুছতে বলল, মায় কান্দে বাবার লেইগা। আমরা বেবাকতেঐ কানতাছি বাবার লেইগা।
বাবারে মাইরা হালাইছে কারা?
মায় তো কয় ডাকাইতে।
দাদারা কী কয়?
অরা কিছু কয় না।
পরির কোলে তখন নাজু শব্দ করে কাঁদতে শুরু করেছে। বাড়ির সবার কান্নাকাটির অর্থ বুঝতে পারছে না। সে কাঁদছে সবাইকে কাঁদতে দেখে।
অন্য সময় হলে ভাইকে থামাবার চেষ্টা করত পরি। এখন করছে না। এখন তার চোখেও পানি। বুকটা কেমন করছে বাবার জন্য। জন্মের পর থেকে দেখে আসা মানুষটা হঠাৎ কোথায় চলে গেল! যদি সত্যি সত্যি ডাকাতে তাকে মেরে ফেলে থাকে তা হলে আর কোনওদিনও ফিরে আসবে না। জীবনে কোনওদিনও বাবার সঙ্গে পরির আর দেখা হবে না।
এসব ভেবে পরির কান্না আরও গম্ভীর হচ্ছিল। মনে পড়ল খুকি মারা যাওয়ার পর নূরজাহানদের বাড়ি গিয়ে বাবাকে নিয়ে অনেক কথা নূরজাহানকে সে বলেছিল। খুকির দাফন কাফন করেনি দেখে বাবার ওপর রাগ করেছিল। সেসব কথাই নূরজাহানকে বলেছিল।
এখন ওসব কথা ভেবে মন কেমন করতে লাগল। যদিও বাবা কোনওদিন জানতে পারবে না, তবু তো পরি তাকে ছোট করেছে নূরজাহানের কাছে। নিজের বাপের বদনাম করেছে অন্যের কাছে। এটা কি ঠিক হয়েছে?
এসব কথা যতই মনে পড়ছিল ততই ভিতর থেকে কান্নার স্রোত ঠেলে উঠছিল পরির চোখে। মুখ নিচু করে রাখার ফলে চোখের টপটপ করে ঝরছিল উঠানের মাটিতে।
বানেছার চোখের পানি ফুরায়া আসছে, বিলাপ করতে করতে ক্লান্ত হয়েছে সে। এখন ঘনঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। পাশে বসে দুই হাতে খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে তাকে জড়িয়ে রেখেছে রাবি।
বানেছা কান্নাকাতর অসহায় গলায় বলল, আসলে তার কোনও দোষ নাই। হেয় বড় ভাল মানুষ। বেবাক দোষ আমার। এই সংসারে অলক্কি লাগনের মূলে অইলাম আমি। এতডি পোলাপান অইছে আমার লেইগাঐ। হেয় বহুত চেষ্টা করছে, আমি হের কথা হুনি নাই। আর হেয় যেই ডরান ডরায় আমারে! আমি যা কই হেইডাঐ হোনে। আমার উপরে দিয়া কোনও কথা কোনওদিনও কয় নাই। তার কথা হোনলে আমার ভাল অইতো। আমি মানুষ ভাল না। আমি বহুত বজ্জাত মানুষ। আমিঐ নষ্টের নারদ। আমার লেইগা আইজ এই দশা অইলো সংসারের। আমার লেইগাঐ মানুষটার আইজ এই দশা। আমার লেইগা। মরছে হেয়।
বানেছা আবার কাঁদতে লাগল। অন্নাই কি খালি আমি হের লগে করছি, সবথিকা বড় অন্নাই তো করছি আমার হরির লগে। হরি অইলো মা’র লাহান, হেই মা’রে আমি একওক্ত খাওন। দেই নাই। একদিন, খুকি তহন পেড়ে, বিয়ানবেলা পোলাপান লইয়া বউয়া খাইতাছিলাম, কত নিয়ারা (অনুনয়) হরি আমারে করলো, আমার পোলাপানরে করলো, আমি হেরে একমুঠ বউয়া খাইতে দেই নাই। উলটা মাগিমুগি কইয়া কত বকলাম। আমার হরি কুটনি। অইছিলো আমার লেইগা। চুন্নি অইছিলো পেডের দায়ে। হেইডাও আমার লেইগাঐ। আমার ডরে নাদেরের বাপে এই হগল লইয়া কথা কয় নাই। দুই-চাইরদিন হরিরে আমি মারছিও। দেইক্কাও হেই মাইর দেহে নাই নাদেরের বাপে। ছেমায় বইয়া অন্যমিহি চাইয়া। চাইয়া বিড়ি টানছে। কোনও কোনও সমায় দুক্কে চক্ক পুচছে, আমি দেকছি। তাও আমারে কিছু কয় নাই। অহন আমার মনে অয়, আমিও তো একদিন হরি অমু। নাদের হামেদ বদু নাজুর বউ আইবো সংসারে। আমি আমার হরির লগে যা করছি, আমার পোলার বউরা যুদি আমার লগে অমুন করে? যুদি আমারে তারা মারে আর আমার পোলারা চাইয়া চাইয়া দেহে, আমার মনডা তহন কেমুন লাগবো?
বানেছা আবার বুক চাপড়ায়, আবার বিলাপ করে। হায় হায় রে, কী কাম আমি আমার হরির লগে করছি। এত অন্নাই করছি তার লগে, আমার মাইর খাইয়া কানতে কানতে বাইত থিকা বাইর অইয়া গেছে, তয় কোনওদিন আমারে আর তার পোলারে, নাতিনাতকুড়রে কোনও অদিশাপ দেয় নাই। সাত আছমানের উপরে বইয়া আল্লায় এই হগল কাম দেকছে, তহন কোনও গজব আমার উপরে নাজিল করে নাই। বহুদিন পর অহন করলো। হেই গজবে নাদেরের বাপে গেলো। আল্লাগো আল্লা, আমার পাপের শাস্তি তুমি আমারে এমতে দিলা? এতডি এন্দাগেন্দা লইয়া আমি অহন কী করুম? খাওয়ামু কী অগো? বাঁচাইয়া রাখুম কেমতে? অন্নাই আমি করছিলাম শাস্তি তুমি আমারে দিতা। আমারে উড়াইয়া নিতা? নাদেরের বাপরে নিলা ক্যা? হেয় তো কোনও অন্নাই করে নাই। হেয় বহুত ভাল মানুষ আছিলো। হেরে তুমি এই শাস্তিডা ক্যান দিলা আল্লা, ক্যান দিলা?
মায়ের কথা শুনে পরির এলোমেলো হয়ে গেল। নিজেকে যেন সে আর চিনতে পারল না। নাজুকে কোল থেকে নামিয়ে দুইহাতে চোখ মুছে খুবই মারমুখী ভঙ্গিতে উঠানের মাটিতে ছেড়ে পেছড়ে বসে থাকা বানেছার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল, কীর লেইগা এমুন করছো তুমি? দাদি তোমার কাছে কী অন্নাই করছিলো যে দাদির লগে তুমি এমুন করছো? দাদি কি তোমারডা খাইতো না তার পোলারডা খাইতো? হরির কাছে বউ তো মাইয়ার লাহান। তুমি তারে যহন তহন মারছো। অহন যুদি আমি তোমারে মারি তোমার কেমুন লাগবো? আঁ, কেমুন লাগবো তোমার?
