কী?
হ।
কেডা মারবো বাবারে? ক্যান মারবো?
টেকাপয়সার লেইগা।
কীয়ের টেকাপয়সা?
ওই যে ভাঙ্গারিকাকায় কইলো, মাল বেচইন্না টেকা আর নতুন মালছামান লইয়া হের দোকান থিকা ওইদিন বাইর অইছে বাবায়।
এমুন তো সব সমায়ঐ বাইর অয়!
হ অয়। তয় বিপদটা মনে অয় ঐদিনঐ অইছে।
কেমতে?
মনে কর এমুন জঙ্গইল্লা কোনও নিটাল জাগা দিয়া ভার কান্দে লইয়া হাইট্টা যাইতাছিল বাবায়, জঙ্গলে পলাইয়া আছিলো চাইর-পাঁচজন ডাকাইত। বাবারে একলা পাইয়া রামদাও লইয়া সামনে আইয়া খাড়ইছে। বাবায় তো কিরপিন মানুষ। মনে অয় টেকাপয়সা আর মালছামান দিতে চায় নাই। এর লেইগা ডাকাইতরা হের কল্লাডা এক কোবে নামাইয়া। দিছে। দিয়া কল্লাডা আর শইলডা গুইজ্জা রাকছে কচুরি পেনাআলা কোনও পুকঐরের কেদার তলে। তারবাদে টেকাপয়সা মালছামান লইয়া গেছে গা।
শুনে ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল হামেদের। ঘট করে একটা টোক গিলল। হায় হায় কচ কী?
নাদেরের গলা তখন ধরে আসছে। ভাঙা গলায় বলল, হ। আমার মনে অয় এমুনঐ অইছে। নাইলে বাবায় যাইবো গা কই?
যুদি এমুন অইয়া থাকে তয় তো বাবায় আর ফিরত আইবো না, না?
কেমতে আইবো? মইরা গেলে মানুষ আর ফিরত আহে?
তয় বাবার লগে আমগো আর দেহা অইবো না?
বাইচ্চা থাকলে সেন্না অইবো!
হামেদ কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, বাবায় না থাকলে গাওয়াল করবো কেডা? খেতে ধান বোনবো কেডা? রুজি করবো কেডা? আমরা খামু কী?
অনেকক্ষণ ধরেই চোখ ভরেছিল নাদেরের। এবার গাল বেয়ে কান্না নামল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, কইতে পারি না। আমি কিছু কইতে পারি না। আমার অহন বাবা গো বাবা গো কইরা চিইক্কর পাইড়া কানতে ইচ্ছা করতাছে।
ভাইকে কাঁদতে দেখে হামেদও কেঁদে ফেলল। তয় অহন বাইত্তে গিয়া কী কবি মা’রে? ডাকাইতে যে বাবার কল্লা কাইট্টা হালাইছে এইডা কবি?
নাদের চোখ মুছে বলল, আরে না।
তয়?
আমরা তো জানি না যে এমুন অইছে। আমি আন্তা করছি।
হামেদ নাক টেনে বলল, তয় মা’রে গিয়া কবি কী?
ভাঙ্গারিকাকায় যা যা কইছে হেইডাঐ কমু।
এই হগল হুইন্না কি মায় বুজবো? মায় তো চিইক্কর পাইড়া কানবো নে।
কানলে অহন কী করুম ক?
দুই ভাই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। রাস্তার ওপাশের খোলা মাঠে চৈতালি ঘূর্ণি ওঠে। সেদিকে তাকিয়ে হামেদ বলল, ওই দেক বানাডুলি আইতাছে দাদা। এমুন নিটাল জাগায় বইয়া থাকনের কাম নাই। ল জাইগা।
হ, ল।
নাদের উঠল।
হাঁটতে হাঁটতে হামেদ বলল, ওই দাদা, আমার অহন খালি একহান কথা মনে অয়।
কী কথা?
মনে অয় আমরা এত ছোড অইয়া রইলাম ক্যা? আমরা আরও ডাঙ্গর, জুয়ানমর্দ অইলাম না ক্যা?
অইলে কী হইতো?
বাবার কামডি আমরা করতে পারতাম। তুই গাওয়াল করতি, বদু আর নাজুরে লইয়া আমি খেতখোলা চুইতাম (চাষ করা অর্থে)। পরি আর জরি করতে মা’র কামডি। রান বাড়ন বেবাক কিছু। তয় তো খাওনের আকাল অইতো না। অহন তো অইবো। অহন তো না খাইয়া মরণ লাগবো।
নাদের কথা বলল না। চুপচাপ হাঁটতে লাগল।
হামেদ বলল, ওই দাদা, আর যুদি এমুন না অইয়া থাকে?
কেমুন?
ধর ডাকাইতে বাবার কল্লাডা কাডে নাই। বাবায় বাইচ্চা আছে। কয়দিন বাদে ফিরত আইলো?
তয় তো কোনও কথা নাই। আমার কথা অইলো বাবায় এতদিন থাকবো কই?
মনে কর কোনও আত্মীয় বাইত্তে গিয়া বেড়াইতাছে।
কেঐরে কিছু না কইয়া বেড়াইতে হেয় যাইবো ক্যা? মাইনষে কি এমতে বেড়াইতে যায়?
হামেদ চিন্তিত গলায় বলল, হ এইডাও তো কথা। বাবায় তো কোনওদিন এমুন করে নাই।
নাদের হতাশ গলায় বলল, তুই যাঐ কচ, আমার মনে অয় বাইচ্চা নাই বাবায়। বাবারে ডাকাইতেঐ মারছে। আগে ডাকাইতের গেরাম আছিল ছিন্নগড়ের ঐমিহি বাজপুর, অহন অনেক গেরামে ডাকাইত আছে। কোন গেরামের উপরে দিয়া গাওয়াল কইরা বাড়ি মিহি যাইতাছিল বাবায়, কোন গেরামের ডাকাইতে তারে মারছে কে কইবো! আমরা কোনওদিন
জানতেও পারুম না কেমতে কী অইছিলো। আহা রে, আহা!
নাদেরের হাহাকারে বুকটা আবার তোলপাড় করতে লাগল হামেদের।
.
ছেলেদের মুখে রতন ভাঙ্গারির কথা শুনে উঠানে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল বানেছা। হায় হায় কয় কী? কয় কী রে? তয় তো হেয় আর বাইচ্চা নাই। ডাকাইতেঐ খাইছে হেরে। হায় হায় এইডা কেমুন সব্বনাশ অইলো আমার! এতডি পোলাপান লইয়া আমি অহন কেমুন করুম! পোলাপানগো খাওয়ামু কী! কেমতে বাঁচাইয়া রাখুম!
একবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বানেছা, একবার উঠে বসে। দুই হাতে পাগলের মতো বুক চাপড়ায়।
বানেছার আকুলিবিকুলি দেখে পোলাপানরাও কাঁদে। ছোটভাই নাজুকে কোন ফাঁকে কোলে নিয়েছে পরি। বদু দাঁড়িয়ে আছে জরির গা ঘেঁষে। নাদের আর হামেদ এতদূর পথ হেঁটে এসে ক্লান্ত। ঢেঁকিঘরের ওটার সামনে বসে আছে দুই ভাই। মাথা নিচু করে কাঁদছে তারা।
এসময় রাবি আর বাদলা এল ছুটতে ছুটতে।
বাদলার পরনে মুসলমানির দিনকার সেই লুঙ্গিটা। গায়ে আর কিছু নাই। মুসলমানির পর এই কয়েকদিনে সে যেন আরও বড় হয়ে গেছে। এই বাড়িতে এসেই চলে গেল নাদের-হামেদের কাছে আর রাবি এসে জড়িয়ে ধরল উঠানে আছাড়ি পিছাড়ি করে কাদা বানেছাকে। এমুন কইরেন না ভাবিছাব, এমুন কইরেন না। আল্লারে ডাক পারেন, আল্লায় রহম করব।
বানেছা বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, হেয় যেদিন থিকা আহে না হেদিন থিকা দিনরাইত চব্বিশ ঘণ্টা আমি খালি আল্লারে ডাক পাড়ি। পোলাপান ঘুমাইয়া থাকে, আমার ঘুম আহে না। আমি ঘুমাইতে পারি না। মনে মনে খালি আল্লারে ডাক পাড়ি, কই, আল্লা আমার মানুষটারে তুমি ফিরাইয়া আনো। আমি তোমার নামে একহান মুরগি সতকা (সদগা) দিমু। আল্লায় তো আমার কথা হোনে না রে বইন। হেয় তো ফিরত আহে না।
