এখন তেমন হচ্ছে না।
দিঘলি বাজারের ভাঙ্গারির দোকান থেকে বের হয়ে আগের হাঁটাটা যেন ভুলেই গেছে নাদের। অথচ সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটছিল তুফানের মতো। সারাটা পথই ভাইয়ের পিছন পিছন দৌড়ে আসতে হয়েছে হামেদকে। আর এখন হাঁটছে ভাইয়ের পাশাপাশি।
নাদেরের এইসব ব্যাপার নিয়ে যেন কোনও আগ্রহই নেই হামেদের। সে মুগ্ধ হয়ে আছে ভাঙ্গারি কাকার ব্যবহারে, বড় বড় দুইখান রসোগোল্লার স্বাদে। হাঁটতে হাঁটতে বলল, আমরা তো রসোগোল্লা আমিত্তি বালুসা এই হগল খাই বচ্ছরে একদিন। গলুইয়ার দিন। গলুইয়ার দিন বাবায় আমগো বেবাকতেরে লইয়া কালিরখিলের মাডে যায়, মাডির দুয়েকহান ঘোড়ামেড়া কিন্না দেয়। তারবাদে গান্দির দোকান থিকা রসোগোল্লা আমিত্তি আর বালুসা কিন্না নতুন একহান মাডির হাড়িতে কইরা বাইত্তে লইয়াহে। হাড়ির মোকহান গান্দির দোকানের মাইনষে বাঁশকাগজ আর চিকন রসি দিয়া এমতে বাইন্দা দেয়, হাতে ঝুলাইয়াঐ হাড়িডা বাইত্তে লইয়াহে বাবায়। তারবাদে মা’র হাতে দেয়। তয় মায় কইলাম রাইত্রে হেদিন ভাতপানি রান্দে না। জের থিকা মুড়ি ঢাইল্লা দেয় বেবাকতের থালে তারবাদে একহান কইরা আমিত্তি একহান বালুসা আর একহান কইরা রসোগোল্লা। ইস হেই রাইতটা যে আমার কী আমোদে কাডে রে দাদা! বহুত আরাম লাগে মিষ্টি খাইয়া।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা তখন ঘোড়দৌড়ের খালের কাছে চলে এসেছে। খালের উপর কাঠের পুরনা পুল। পুলে উঠতে উঠতে নাদের বলল, এই হগল আমি জানি। এই হগল। প্যাচাইল আমার লগে অহন পারি না।
ক্যা রে দাদা? তর মন খারাপ?
পুল পেরুতে পেরুতে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল নাদের। তর খারাপ না?
দুপুর ঢলে গেছে কিছুক্ষণ আগে। চারদিকে চৈত্রমাসের ঘোরতর রোদ। একটুখানি হাওয়া নাই গাছপালায়। খালের পানি মাটি গাছপালা শস্যের চকমাঠ খা খা করছে। গরমে ঘামে দুই ভাইই অতিষ্ঠ। কিন্তু এতবড় দুইখান রসোগোল্লার স্বাদ মুখে লেগে থাকার ফলে এইসব রোদঘাম গায়েই লাগছিল না হামেদের। অন্যকোনও কিছু আর মনেই ছিল না। কী কাজে মেদিনীমণ্ডল থেকে পাঁচ-ছয় মাইলের দূর দিঘলির বাজারে এসেছিল তারা, কতক্ষণ থেকে আবার ফিরে যাচ্ছে, কিছুই যেন মনে নাই। বোধহয় এজন্যই বলল, ক্যা, মন খারাপ অইবো ক্যা?
বাবার লেইগা?
এবার চট করেই ব্যাপারটা মনে পড়ল হামেদের। তাই তো, বাবার খোঁজেই তো তারা আজ দিঘলি বাজারে এসেছিল ভাঙ্গারিকাকার দোকানে। আজ পাঁচদিন গাওয়ালে বেরিয়ে বাড়ি ফিরছে না বাবা। কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না। গ্রামের কারও সঙ্গে কোথাও বাবার দেখাও হয়নি। দেশগ্রাম থেকে মানুষটা যেন একদমই উধাও হয়ে গেছে।
পাঁচদিন ধরে বাবার পথ চেয়ে চেয়ে মা আজ সকালে তাদের দুই ভাইকে পাঠিয়েছিল দিঘলি বাজারে। কিন্তু ভাঙ্গারিকাকাও বাবার কোনও হদিশ দিতে পারল না। বলল, পাঁচদিন আগে আইছিলো। পুরানা মাল দিয়া নতুন মাল নিল, কিছু টেকা পাইতো হেইডা নিল, তারবাদে দোফরের আগে আগেঐত্তো বাড়ি মিহি মেলা দিল। আর তো আমার এহেনে। আহে নাই।
শুনে নাদের-হামেদ যখন খুবই হতাশ তখনই দুইখান করে বড় সাইজের রসগোল্লা এনে খাওয়াল দুইজনকে। নানারকম বুঝ দিয়ে ফিরত পাঠাল। মনে হয় কোনও কামে। গিয়া আটকা পড়ছে। তোমার মা’রে কইয়ো চিন্তাভাবনা য্যান না করে। দুই-চাইর দিন পর। লিশ্চই ফিরত আইবো। ফিরত না আইয়া যাইবো কই, কও!
লোকটির নাম রতন পাল। বহুদিন ধরে ভাঙ্গারির ব্যাবসা করে বলে নাম পড়ে গেছে রতন ভাঙ্গারি। মুখে মধুমাখা রতন ভাঙ্গারির। কথা বলে এত সুন্দর করে, খারাপ কথাও শুনতে ভাল লাগে। বাচ্চা ছেলে দুইটার বাপ যে পাঁচদিন ধরে বাড়ি ফিরে না, লোক যে তার কাছ থেকেই মালছামান নিয়ে বহুবছর ধরে গাওয়াল করে, সব শুনেও তার চেহারায় বিন্দুমাত্র উৎকণ্ঠা দেখা গেল না। খুবই মধুর ভঙ্গিতে হাসিহাসি মুখ করে এমনভাবে সান্ত্বনা। দিল, যেন পাঁচদিন কেন পাঁচ বছরও কারও জন্য বাড়ি না ফিরা কোনও ব্যাপারই না। তার আচরণে মুগ্ধ হয়েই বোধহয় বাবার কথা ভুলে গিয়েছিল হামেদ। এখন নাদেরের কথায় মনে পড়ল।
তারপরও ভাঙ্গারিকাকার কথার রেশ ধরে রাখল হামেদ। বলল, বাবার লেইগা মনডা আমার খারাপ ঠিকই, তয় বেশি খারাপ না।
পুল থেকে নেমে খানিকদূর এগিয়েছে ওরা। এখানটায় রাস্তার দুইপাশে কিছু ঝোঁপজঙ্গল, গাছপালা। বেশ ছায়া আছে। যদিও হাওয়া বলতে গেলে নেইই তবু রোদের তেজ তেমন টের পাওয়া যাচ্ছে না। কাছাকাছি কোথাও থেকে থেকে ডাকছে একটা ঘুঘুপাখি। সেই ডাকে কীরকম এক নির্জনতা যেন নেমেছে চারদিকে।
হামেদের কথা শুনে দাঁড়াল নাদের। বলল, বেশি খারাপ না ক্যা?
ভাঙ্গারিকাকায় যে কইলো কোনও কামে আটকা পড়ছে। লিশ্চই আইয়া পড়বো।
যুদি না আহে?
শুনে ভয় পেয়ে গেল হামেদ। মুখ শুকিয়ে গেল। আইবো না তয় যাইবো কই?
বয়, ইট্ট জিরাই। জিরাইতে জিরাইতে কথা কই।
দুই ভাই পথের ধারের জামগাছতলায় বসল। গাছটার পিছনে আর দুইপাশে ঝোঁপজঙ্গল, সামনে সবুজ ঘাস। গাছের ছায়ায় আরামদায়ক হয়ে আছে ঘাসগুলি। বসার পর ভাল লাগল হামেদের। বলল, এইবার ক ভাই। বাইত্তে না আইয়া বাবায় যাইবো কই?
নাদের চিন্তিত গলায় বলল, বাবারে কেঐ মাইরাও হালাইতে পারে।
