একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কুট্টি। কইতে পারি না কপালে আমার কী আছে? কোন কান্দন হারাজীবন ধইরা আপনের লেইগা আমার কান্দন লাগে। কপালডা আমার ছোট্টকাল থিকাঐ খারাপ। গরিব মা-বাপের ঘরে জন্মাইছি, এমুন একহান দিনও যায় নাই যেদিন তিনওক্ত খাওন পাইছি। কোনও কোনও সমায় দুই-তিনদিনও না খাইয়া রইছি। সংসারের অভাব দেইক্কাঐ সতিন আছে জাইন্নাও আধা বইসা নয়নের বাপের কাছে বিয়া বইলাম। ওহেনেও টিকতে পারলাম না। আমার সব থিকা সুকের দিন অহন এই বাইত্তে। মাজারো বুজানে দুই-চাইর দিন বাইত্তে থাকলে ইট্টু ঝামেলা অয়, কামকাইজ বেশি করতে অয়, দৌড়ের উপরে থাকতে অয়, হেয় না থাকলে পুরা বাড়িঐ আমার। যহন যা মনে চায় খাই। ইচ্ছা অইলে কাম করি না অইলে করি না। অভাব ছিল খালি একহান জিনিসের। একজন মনের মানুষ, তার আদর সোহাগ। হেইডাও আমি পাইতাছি আপনের কাছ থিকা। অহন আমার কোনও দুকু নাই, কোনও কিছুর কোনও আকাল নাই। সুকে আমি এক্কেরে ডুইব্বাছি। এই সুক কতদিন সইবো এইডাঐ কথা।
কুট্টির কথা শুনতে শুনতে আবার সেই প্রথম দিককার আবেগটা ফিরে এল আলফুর। কিন্তু দুইহাতে কুট্টিকে সে জড়িয়ে ধরল না। একহাতে কাছে টেনে অন্যহাতে তার চিবুকটা তুলে ধরল। হৃদয়ের গভীর থেকে বলল, আমি তোমারে কোনওদিন ছাইড়া যামু না। যতদিন বাইচ্চা থাকি, যেহেনেঐ থাকি, তোমারে লইয়াঐ থাকুম। রাইতভর তোমারে প্যাচাইয়া ধইরা ঘুমামু, দিনভর কামকাইজ করুম আর ফাঁকে ফাঁকে দেহুম তোমার মুখ। এক লগে বইয়া ভাত খামু দুইজনে, সুক দুর্কের কথা কমু। এই জীবন তোমারে ছাড়া আমি কাটামু না।
আলফুর কথায় আবেগে বুক ভরে গেল কুট্টির। ইচ্ছা করল দুইহাতে আলফুর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, আপনে যেমতে চান আমিও অমতেঐ চাই সব। আমিও আপনেরে ছাড়া আমার এই জীবনডা আর কাটাইতে চাই না।
একথা না বলে কুট্টি বলল অন্যকথা। কেমতে আমারে লইয়া জীবনডা আপনে কাটাইবেন? চরে যে আপনের বউ পোলাপান আছে, সংসার আছে?
আলফু বলল, তাগো লইয়াও চিন্তা আমার আছে। তয় হেই চিন্তার কথা আইজ তোমারে কমু না। কমু আরেকদিন। তয় আইজ খালি এডু কই, তোমার লেইগা আমি সব ছাড়তে পারুম।
না না হেইডা আপনে করবেন না।
ক্যা?
তারা তো কোনও দোষ করে নাই! তাগো আপনে কীর লেইগা কষ্ট দিবেন! আপনে তাগো চিন্তা না করলে মানুষটি যাইবো কই? পোলাপানডির উপায় অইবো কী?
সবদিক চিন্তা কইরাঐ পথ আমি বাইর করুম। কেঐরে কষ্ট দিমু না। সোন্দরভাবে করুম কামড়া। তয় শেষ কথা অইলা তুমি। যেই আদর সোহাগ মায়া মমতা তোমার কাছ থিকা আমি পাইছি, এইডা আমি হারাইতে চাই না। এইডা আমার জীবনের সবথিকা বড় সম্পদ। এই সম্পদ আমি বুক দিয়া আলগাইয়া রাখুম।
আলফুর কথা শুনে মন ভরে গেল কুট্টির। শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল সেই প্রথমদিন চালতাতলার আধো অন্ধকারে বসা আলফুকে দেখে যেমন করে কাঁটা দিয়েছিল ঠিক তেমন করে। খানিক আগে আলফুর যা ইচ্ছা করেছিল, কুট্টি টের পেল এখন তার শরীর জুড়ে, মন জুড়ে সেই ইচ্ছা। এখন দিন না রাত্রি বুঝতেই চাইল না সে, আবার গোসল করতে হবে কি হবে না, বুঝতে চাইল না। আচমকা কেউ এসে পড়বে কি না, একবারও মনে হল না। একহাতে ধরা চিপড়ানো শাড়ি ছায়া ব্লাউজ আস্তে করে মাটিতে ছেড়ে দিয়ে দুইহাতে গভীর করে আলফুর গলা জড়িয়ে ধরে কুট্টি বলল, আমারে পাতালি কুলে লন।
আলফু অবাক হল কিন্তু করল কাজটা।
আলফুর কোলে উঠে দুইহাতে তার গলা জড়িয়ে মুখটা আদুরে ভঙ্গিতে তার মুখে ঘষতে ঘষতে কুট্টি বলল, চাউলতাতলায় লইয়া যান আমারে।
আলফু ততক্ষণে বুঝে গেছে কী চায় কুট্টি। তবু বলল, কীর লেইগা?
কুট্টি আধো গলায় বলল, আপনে যা চান আমিও তাই চাই।
শুনে আলফুর শরীরের ভিতর জেগে উঠল দুর্দান্ত এক কামার্ত পুরুষ। কুট্টিকে নিয়ে। চালতাতলায় এল সে। আলফু প্রায়ই এখানটায় বসে জিরায়, বিড়ি খায়। কিছু খড়নাড়া ফেলা আছে। সেই খড়নাড়ার উপর কুট্টিকে শোয়াইয়া দিয়া তার ভিতর একটু একটু করে ডুবে যেতে লাগল আলফু। গোঙাতে গোঙাতে কুট্টি শুধু কোনওরকমে বলল, আপনে আমারে ছাইড়া যাইয়েন না, কোনওদিনও ছাইড়া যাইয়েন না।
তখন ঠাকুরবাড়ির ওদিক দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কোনও বয়াতি ধরনের মাটিয়াল গলা ছেড়ে রূপবানের গান গাইছিল,
শোন তাজেল গো,
মন না জেনে প্রেমে মইজো না
মন না জেনে প্রেমে মইজো না
মন না জেনে
এ প্রেমে মইজো না।
এই গান শুনে ওই অবস্থায়ও কুট্টির বুকটা একটু কেঁপে উঠল।
.
ভাঙ্গারি কাকায় বহুত ভাল মানুষ, না রে দাদা?
নাদের কথা বলল না। ভাঙ্গারির দোকান থেকে বের হবার পর থেকেই কেমন গম্ভীর, কেমন চিন্তিত হয়ে আছে। হামেদের পাশাপাশি হাঁটছে ঠিকই, সঙ্গে যে হামেদ আছে সে-কথা যেন মনেই নাই।
এখন হামেদের কথা শুনেও তার দিকে তাকাল না নাদের। কথাও বলল না। হামেদ নিজের ভাল লাগায় ডুবে আছে। গদগদ গলায় বলল, এত্ত বড় বড় দুইহান কইরা রসোগোল্লা খাওয়াইলো। আর এত্ত সাদ রসোগোল্লার। এত্ত সাদের, এত্তবড় রসোগোল্লা। আমি কোনওদিন খাই নাই। দুইহান খাইয়া পেট একদোম ভইরা গেছে। রাইত্রের আগে। আর ভাত খাওন লাগবো না।
নাদের তবু কথা বলল না। দ্রুত হাঁটার স্বভাব তার। হামেদ কখনও ভাইয়ের লগে হেঁটে পারে না। নাদের হাঁটলে হামেদ সব সময়ই পিছনে পড়ে। পিছন থেকে সব সময় দৌড়ে এসে ধরতে হয় ভাইকে।
