নিশ্চয় শেয়াল খাটাসেই খেয়েছে সেই মেয়ে। পৃথিবীর কোথাও তার এখন আর কোনও চিহ্ন নাই।
একদিকে স্বামীর না ফিরা আরেকদিকে মেয়ের শোক উথলে ওঠা, বানেছার চোখ ফেটে যেতে চাইল। পোলাপানদের সামনে কাঁদতেও চাইল না সে, হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়াল। নাদেরকে বলল, রাইত অনেক অইছে। দুয়ারডা লাগাই দে। দিয়া তরা বড় চাইর ভাইবইন। চকিতে হো। বদু নাজুর লগে আমি হুইতাছি মাইত্তে। তয় আমি জাইগ্নাঐ থাকুম নে। তর বাপে আইলে দুয়ার খুইল্লা দিমুনে।
মায়ের কথা মতোই কাজ করল নাদের। দরজা বন্ধ করে চৌকিতে উঠে গেল।
ছোট দুই ছেলের পাশে হোগলার বিছানায় শোয়ার আগে ম্যাচটা বালিশের তলায় রাখল। বানেছা, তারপর কুপি নিভাল। স্বামী ফিরলে চট করেই যেন ম্যাচ বের করতে পারে কুপি জ্বালাতে পারে।
কিন্তু আজিজ ফিরল না।
.
দুপুরের রান্না শেষ করে হাড়ি পাতিল বড়ঘরের বারান্দায়, জায়গামতো রেখে, দরজা আবজাইয়া পুকুরঘাটে গোসল করতে গিয়েছিল কুট্টি। গোসল সেরে শুকনা শাড়ি ছায়া ব্লাউজ পরে, ভিজা কাপড়চোপড় চিপড়ে হাতে নিয়েছে, নিয়ে দ্রুত পায়ে উঠানের দিকে ফিরছিল, চালতাতলার থেকে পা টিপে টিপে এসে পিছন থেকে দুইহাতে তাকে জড়িয়ে ধরল আলফু।
প্রথমে কুট্টি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল তারপর ছটফট করে উঠল। হায় হায় করেন কী! ছাড়েন, ছাড়েন।
কুট্টির পিঠের উপরদিকটায় মুখটা একটুখানি ঘষে দিয়ে আলফু বলল, না ছাড়ুম না।
আলফুর মুখের ঘষায় কুট্টির সারা শরীর তখন কাঁটা দিয়ে উঠছে। অদ্ভুত ধরনের অবশ করা ভাব ছড়িয়ে গেছে শরীরে। ইচ্ছা করছিল এভাবে যতক্ষণ ইচ্ছা আলফু তাকে জড়িয়ে ধরে রাখুক। শুধু পিঠে না শরীরের যেখানে যেখানে ইচ্ছা হাত বুলিয়ে মুখ ঘষে বা অন্যকিছু করে আদর করে দিক। কিন্তু মুখে মেয়েদের চিরকালীন ঢংটুকুও সে করল। জোর করে আলফুকে ছাড়াতে চাইল। বলল, ছাড়েন, কেঐ দেইক্কা হালাইবো।
দুরন্ত প্রেমিকের গলায় আলফু বলল, কে দেখবো? কেঐ নাই দেহনের। এই বাইত্তে খালি তুমি আর আমি।
বড়বুজানেও আছে।
হেয় বিছনায় থাকা মানুষ। হেয় দেখবো কেমতে। যহন দেহনের তহনঐ দেহে না, দেহন তো দূরের কথা উদিস পায় না যে তার পালঙ্কের সামনের পাটাতনে শোয়া যুবতী মাইয়াডা যে রাইত দোফরে উইট্টা দুয়ার খোলে। মনের মাইনষের কাছে গিয়া তার লগে হুইয়া থাকে। বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা আবার ফিরা যায় নিজের বিছনায়।
মুখ ঘুরিয়ে আলফুর ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াল কুট্টি। চুপ করেন। ইস লজ্জাশরম নাই।
কীয়ের লজ্জাশরম? তোমার কাছে আমার আর লজ্জাশরম কী! আমার কাছেই বা তোমার লজ্জাশরম কী! আমরা দুইজন মানুষ মিলা অহন একজন।
তাও আমার শরম করে।
কুট্টির ঠোঁটে গভীর করে একটা চুমু খেল আলফু। কীয়ের শরম? এহেনে তোমারে কে দেখতাছে!
কুট্টির শরীরে তখন আগুন জ্বলছে। তবু কোনওরকমে সে বলল, মাইনষে না দেহুক অন্য জিনিসে তো দেখতাছে আমগো।
কথাটা বুঝল না আলফু। বলল, অন্য জিনিস আবার কী?
কুট্টি হাসল। বাড়ির কাউয়া শালিক, গাছ, গাছের পাতা, চৈতালি বাতাস বইতাছে, হেই বাতাস। মাথার উপরের আশমান, এই হগল জিনিসে দেখতাছে না আপনে আমারে প্যাচাইয়া ধইরা রাখছেন!
ও এই হগল জিনিসে দেখতাছে! আইচ্ছা দেহুক।
তয় দোফরবেলা পিরিতি এমুন উথাল দিয়া উটলো ক্যা?
তোমারে দেইক্কা।
আমারে কই থিকা দেকলেন?
চাউলতাতলা থিকা।
চাউলতাতলায় আইলেন কুনসুম?
অনেকক্ষুন আগে আইছি।
কন কী? আমি দিহি উদিস পাইলাম না।
গেছিলাম আজিজ গাওয়ালের বাইত্তে। ওই বাইত্তে একহান কাম অইছে।
কী কাম?
হেইডা পরে কমুনে। আগে নিজের কথাহান কইয়া লই।
আইচ্ছা কন।
বাইত্তে আইয়া তোমারে বিচড়াইলাম। বড়ঘরের দুয়ার আবজাইন্না দেইখা বুজলাম তুমি নাইতে গেছ। তোমার নাওন দেহনের লেইগা চুল্পে চুপ্পে আইয়া চাউলতাতলায় খাড়ই রইছি।
কুট্টি মজার মুখ ভঙ্গি করে বলল, ইস।
কুট্টির গালে দুইবার মুখ ঘষল আলফু। হ। বিশ্বাস করো।
আলফুর শ্বাসের সঙ্গে আসছিল বিড়ির গন্ধ সেই গন্ধ আর মুখের ধারালো দাড়িমোচের ঘষায় শরীর কাঁটা দিচ্ছিল কুট্টির। অস্থিরতা বাড়ছিল। তবু গলার জোর কমাল না সে। বলল, আমারে আবার নতুন কইরা দেহনের কী অইলো? হেদিন থিকা তো রোজ রাইত্রেঐ দেকতাছেন।
না রাইত্রে দেহা যায় না। বারিন্দায় ঘুটঘুইট্টা আন্ধার। তোমার শইল্লের কিছু দেহা যায় না।
বুজা তো যায়?
তা যায়। ওই মজা এক, দেহনের মজা আরেক।
অইছে। অহন ছাড়েন। আমি গিয়া ভাত বাড়ি আপনে নাইয়া ধুইয়া আহেন।
আলফু শিশুর মতো জেদি গলায় বলল, না।
তয় কী করবেন? এমতে পাচাই ধইরা খাড়ঐ থাকবেন?
না।
তয়?
তোমারে পাতালি কুলে কইরা চাউলতাতলায় লইয়া যামু।
তারবাদে?
তারবাদে যা অওনের অইবো।
এবার কুট্টি ছটফট করে উঠল। এই না, না। দিনদোফরে এই হগল অইবো না।
আমার ইচ্ছা করতাছে।
না। আমি নাইয়াইছি।
তাতে কী অইছে। আমার লেইগা নাইলে আরেকবার নাইবা।
একবার না, আপনের লেইগা আমি দশবারও নাইতে পারি, তয় দিনদোফরে গাছতলায় এইডা ঠিক অইবো না।
ক্যা?
কওন যায় না, কে কোন হানদা এই বাইত্তে আইবো। কার চোক্কে পইড়া যামু। একবার যুদি কেঐ বুইজ্জা যায় তয় কইলাম বেবাকঐ গেলো।
তারপর কুট্টিও চট করে আলফুর গালে একটা চুমু খেল। একবার আপনেরে যহন আমি পাইছি, এই জীবনে আপনেরে আর হারাইতে চাই না। আমার সবকিছু আপনের। যহন যেমতে ইচ্ছা চাইবেন আমি আপনেরে বেক কিছু দিয়া দিমু। তয় সবঐ করতে হইবো সাবধানে। রাইতে তো আমি আপনের কাছে থাকি। অসুবিদা কী?
