নাদের বলল, কীয়ের কিচ্ছা কমু?
হামেদ বলল, উই যে মা’র যেদিন আহুজ পড়লো হেদিন সড়কপারের ইজলতলায় বইয়া যেই হগল কিচ্ছা কইছিলি ওই পদের কিচ্ছা ক।
ওইডি তো কিচ্ছা না, সত্যকথা।
তয় সত্যকথাঐ ক।
ভূত প্রেতের গল্প করতে বেজায় উৎসাহ নাদেরের। সত্য অসত্য মিলিয়ে এসব গল্প সে ভালই বলে।
এখন রাত, দরজা খোলা, বাইরে গা ছমছমা অন্ধকার। এই অবস্থায় ওসব গল্প বলা কি ঠিক হবে।
কথাটা সে বলল।
শুনে হামেদ আর পরি জরি সবাই বলল, না আমরা ডরামু না। এতডি মানুষ ঘরে, ডরামু। ক্যা? মায় আছে না?
বানেছা তখনও একই জায়গায় বসে আছে। পোলাপানের কথা শুনেও শুনছে না।
নাদের একবার মায়ের দিকে তাকাল তারপর বলল, তয় কউপটাহারের ঘটনাডা কই।
হামেদ বলল, ক।
মেদিনমণ্ডল থিকা বিলের উপরে দিয়া যে হালটখান গেছে হেই হালট দিয়া কান্দিপাড়া মিহি গেলে মাঝবরাবইর হাতের ডাইনমিহি অইলো কউপটাহার। কউপটাহার অইলো একহান ডেঙ্গা। অহন তো হুগাইয়া ধানখেত অইয়া গেছে। আগিলা দিনে আছিলো বিরাট ডেঙ্গা। ডেঙ্গার খাই (গভীরতা) কত কেঐ কইতে পারতো না, এক্কেরে পাত্তালে গিয়া ঠেকছে।
নাজুর পাশে শোয়া বদু আধো গলায় বলল, পাত্তাল কোনহানে দাদা?
পরি তাকে একটা ধমক দিল। তুই চিনবি না। চুপ কর।
হামেদ বলল, হ দাদায় কিচ্ছা কওনের সমায় কেঐ কোনও কথা কবি না।
তারপর নাদেরের দিকে তাকাল। ক দাদা, ক।
নাদের বলল, কউপটাহারে আছিলো তামা পিতলের থাল বাসন জগ গেলাস ভোল বাডি হাতা চামিচ, তামার বিরাট বিরাট ডেগ, ডেগের ঢাকনা, লাম্বা লম্বা হাতা।
শুনে জরি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বলল, ডেঙ্গার মইদ্যে এই হগল আছিলো কোনহানে। কোনবাড়ির জিনিস? কেডা রাকছিলো?
নাদের রাগ করল না। হাসিমুখে বলল, আরে বলদি (বলদের স্ত্রীলিঙ্গ) কোনও বাড়ির জিনিস না। কেঐ রাখে নাই। ঐডি অইলো গাইবি (গায়েবি) জিনিস। ডেঙ্গার পানির তলে থাকতো।
মাইনষে তাঐলে দেকতো কেমতে?
হোন, হেইডাঐত্তো কইতাছি।
আইচ্ছা ক।
নাদের একবার অন্ধকার উঠানের দিকে তাকাল। তারপর বলল, উপটাহারের চাইরমিহির যে-কোনও বাইত্তে বিয়াশাদি মোসলমানি জিয়াফত মেজবানি অইলে বাড়ির মাইনষে গিয়া কউপটাহারের সামনে খাড়ইতো, খাড়ইয়া কইতো, এতডি থাল, এতডি কলসি জগ গেলাস, এতডি ডেগ, অর্থাৎ মেজবানির বাইত্তে শয়ে শয়ে মাইনষেরে একলগে বহাইয়া খাওয়ানের লেইগা যা যা লাগে কউপটাহারের পানির মিহি চাইয়া কইয়াইতো, পরদিন বিয়ানে গিয়া দেখতে যা যা কইছে ঠিক অতডি জিনিসঐ কউপটাহারের পারে। মাইনষে মাথায় কইরা, কান্দে কইরা জিনিসটি বাইত্তে লইয়াইতো। কামকাইজ শেষ অওনের পর আবার রাইক্কাইতো কউপটাহারের পারে। জিনিসটি আপনা আপনি পাইনতে নাইম্যা যাইতো।
বদু বলল, কেমতে উটতো আর কেমতে নামতো দাদা? ঘড়ি বাড়ির আত পাও আছে নি?
হামেদ বলল, তুই চুপ কর। তুই এই হগল বুজবি না। দাদা, তুই ক।
নাদের একটু নড়েচড়ে বসল। একবার কান্দিপাড়ার এক বাইত্তে মেজবানি। কউপটাহার থিকা ডেগ থাল বাসন যা যা লাগে বেক লইয়া গেছে। কামকাইজ সাইরা আবার ফিরতও দিয়া গেছে। তয় জিনিস তো আর পাইনতে নামে না। কী বিষয়? কেঐ কিছু বোজতে পারে না।
একদিন যায়।
দুইদিন যায়।
তিনদিন যায়।
না জিনিস তো পাইনতে নামে না। বাড়ির এক মুরব্বি বুইজ্জা গেল লিশ্চই কোনও গন্ডগোল অইছে। বাড়ির বেবাকতেরে হেয় জিগাইতে লাগলো, কউপটাহারের জিনিস কেঐ কিছু হামলাইয়া রাখছেনি। রাকলে স্বীকার করো, বাইর কইরা দেও। নাইলে আমগো বংশ নিরবংশ অইয়া যাইবো।
বাড়ির ছোডপোলার বউয়ের আহুজ পড়বো। মুরব্বির কথা হুইন্না হেয় কইলো, হ আমি একহান চামিচ হামলাইয়া রাকছি।
মুরব্বি কইলো, সব্বনাশ করছচ। তাড়াতাড়ি বাইর কইরা দে। অহনঐ থুইয়াহি কউপটাহারের পারে।
চামিচটা বাইর কইরা দিল বউ। মুরব্বি গিয়া রাখল কউপটাহারের পারে। তহন আস্তে আস্তে বেবাক জিনিস নাইম্মা গেল পাইনতে। তারপর থিকা কোনওদিন কেঐ গিয়া চাইলে জিনিস আর উটতো না।
হামেদ বলল, আর ওই বউডার কোনও শাস্তি অয় নাই?
অইছে। পোলাপান অইয়া সাতদিন পর মইরা গেছে। বাঁচে নাই।
একথা শুনে স্বামীর জন্য উৎকণ্ঠায় বসে থাকা বানেছার বুকটা কেমন তোলপাড় করে উঠল। পলকের জন্য স্বামীর কথা ভুলে গেল সে, মনে পড়ল সাতদিন বয়সে চলে যাওয়া মেয়েটির কথা। এতগুলি দিন গর্ভের অন্ধকারে কত না যত্নে মায়া মমতায় বানেছা তাকে আগলে রেখেছিল। কত না কষ্টে বেদনায় নাড়ি ছিঁড়ে তাকে বের করল পৃথিবীর আলো হাওয়ায়। তারপরও থাকল না মেয়েটি। নাভিতে পচন ধরল। দেড়দিন ধরে শুধুই ওঁয়াও ওঁয়াও করল ব্যথা বেদনায়, তারপর খিচুনি উঠতে উঠতে মরল।
ওইটুকু মেয়ের মরণে কিছুই যেন হল না সংসারে। কেউ একটু কাঁদল না, কেউ ফিরে তাকাল না। আজিজ যেন খুশিই হল। যাক একটা যন্ত্রণা গেছে। দাফন কাফন পর্যন্ত করল না। কথা কাপড়ে প্যাচিয়ে কোথাকার কোন জঙ্গলে ফেলে দিয়ে এল।
নয় মাস দশদিন গর্ভের আড়ালে এত যত্নে মায়ায় রাখা মানুষটিকে এত অবহেলায় কেমন করে ফেলে দিতে পারল মেয়ের বাপ? মা হয়ে বানেছাই বা কেন তাকে বলল না, জঙ্গলে হালাইয়ো না আমার মাইয়াডারে। দাফোন কাফোন করো। জঙ্গলে হালাইলে আমার বুকের ধন শিয়াল খাডাসে খাইবো।
