ক্যা?
রাইত্রের ভাত আমরা বেবাকতে একলগে খাই। আইজ বাবায় নাই দেইক্কা খাইতে ইচ্ছা করতাছে না মা’র।
বানেছার দিকে তাকাল পরি। না মা?
বানেছা কথা বলল না। মেয়ের বুদ্ধি দেখে অবাক হল। ঠিক কথাই বলছে পরি। স্বামীর কারণেই খেতে ইচ্ছা করছে না তার। ক্ষুধাই লাগছে না। আজিজের জন্য যে তার মনে ভালরকম টান, বহুদিন পর আজ সেই টান গভীর ভাবে উপলব্ধি করছে।
কিন্তু পরি ওইটুকু মেয়ে, সে এতকিছু বুঝছে কী করে! মায়ের মনের ভিতরটা যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মেয়ে। খানিক আগে বলল রাত যে হয়ে গেছে, বাবায় ফেরিনি বলে মা তা টের পাচ্ছে না। এখন বলল, বাবার জন্য খেতে ইচ্ছা করছে না মায়ের। কী করে এসব বুঝতে পারছে?
নাকি মেয়েমানুষ হয়ে জন্মালে এমনই হয়! শিশুবয়সেই মেয়েরা জেনে যায় সংসারের অনেক কিছু। ছেলেরা যতটা না জানে বোঝে মেয়েরা জানে তার চেয়ে অনেক বেশি। কেউ শিখিয়েও হয়তো দেয় না তবু কেমন কেমন করে যেন জেনে যায়, টের পেয়ে যায়।
নাদের বলল, বাবারে ছাড়া কোনওদিন রাইত্রের ভাত খাই নাই। আইজ পয়লা।
হামেদ বলল, তয় বাবায় কোনওদিন এমুনও করে না। আইজ করল ক্যা? কই গেলো গা?
জরি ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে চাবাতে চাবাতে জড়ানো গলায় বলল, ভাঙ্গারির দোকান থিকা বাইর অইয়া মনে হয় দূরে কোনওহানে গেছে।
পরি বলল, অইতে পারে।
বদু ছেলেটা এখনও ঠিকঠাক মতো ভাত মাখতে পারে না, ঠিকঠাক মতো লোকমা দিতে পারে না। থালের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ভাত। এখনও পড়ছিল। দেখে পরি বলল, একহান কাম করো মা। বদুরে খাওয়াইয়া দেও।
ক্যা?
ও তো ঠিক লাহান খাইতে পারে না। আর তুমিও তো আজাইরা আছো।
বানেছা বিরক্ত হল। আমারে আজাইরা থাকতে দেখলে তর ভাল্লাগে না? আমি পারুম না। যেমতে খাইতাছে খাউক।
সালুন দিয়ে ভাত খাওয়া শেষ করে ডাল নিয়েছে হামেদ। পরিমাণে একটু বেশিই নিয়েছে। ভাত পড়ে গেছে ডালের তলায়। পাঁচ আঙুলে চেঁছে চেঁছে ডালের তলা থেকে ভাত উদ্ধার করে কয়েকবার খেল সে তারপর থাল তুলে ডালে চুমুক দিল। সুরুৎ করে বড় রকমের একখান টান দিয়ে শেষ করল ডাল। হাসিমুখে পরির দিকে তাকাল। বাবায় আহে নাই দেইক্কা মা’র মন মিজাজ ভাল না পরি। মা’র লগে বেশি কথা কইচ না। কথা কইলে মাইর গুতা খাবি।
পরি কথা বলল না। ভাত খেতে লাগল।
নাদের তার খাওয়া শেষ করে এনেছে। ডাল দিয়েই শেষ ভাতটা খায় সে। তবে হামেদের মতো অতখানি ডাল নিয়ে, ভাত ডুবিয়ে খাওয়ার অভ্যেস নাই। অল্প ডাল নিয়ে শুকনা শুকনা মাখা ভাত খেতে তার ভাল লাগে। সেভাবেই খাওয়া শেষ করল। থালায় হাত ধুতে ধুতে বলল, আমরা ভাত খাওনও শেষ করলাম তাও দেহি বাবায় আহে না। গেলো গা কই?
জরি বলল, আইজ রাইত্রে যুদি না আহে?
মেয়েকে ধমক দিল বানেছা। চুপ কর মাগি। খালি অলইক্কা কথা। বাইত্তে আইবো না। যাইবো কই তর বাপে? বাইত ছাড়া হেয় কোনওদিন কোনওহানে থাকছে?
মায়ের ধমকে সবাই চুপসে গেল। আর কোনও কথা না বলে যে যার মতো খাওয়া শেষ করল, তারপর বিছানায় গিয়ে বসল কেউ, কেউ শুয়ে পড়ল।
দরজাটা তখনও খোলা।
নাদেরকে হামেদ বলল, ওই দাদা, দুয়ার খোলা থাকবো?
নাদের কথা বলবার আগেই বানেছা বলল, হ তর বাপে না আহনতরি খোলা থাকবো।
তারপর দ্রুত হাতে পোলাপানের জুডা থালবাসন গুছাতে লাগল।
কোলের ছেলেটির নাম নাজিম। এই নামে কেউ তাকে ডাকে না। ডাকে নাজু। মায়ের বুকের দুধ খেয়ে অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। বদুকে তার পাশে শোয়াইয়া দিল পরি। তারপর বড় চার ভাইবোন তারা মেঝেতে পাতা হোগলার বিছানায় বসে খোলা দরজা দিয়ে অন্ধকার উঠানের দিকে তাকিয়ে রইল।
হাতের কাজ সারতে সারতে বানেছা তখন কান পেতে রেখেছে বাইরের উঠানের দিকে। এই বুঝি পুবদিককার ভাঙন ঠেলে ভার কাঁধে উঠানে এল মানুষটা! এই বুঝি তার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল! এই বুঝি পাওয়া গেল তার দূরপথ অতিক্রম করে আসার ক্লান্তিকর শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ।
না কিছুই পাওয়া যায় না। মানুষটা ফিরে না। বাইরে ঝিঁঝির শব্দ।
হামেদ বলল, ওই দাদা, এমতে বইয়া থাকবিনি?
নাদের বলল, তয় কী করুম?
এমতে বইয়া থাকলে আমার ঘুম আইবো।
পরি বলল, ঘুম আইলেও জাইগ্না থাকবি।
ক্যা?
মায় যে কইল বাবায় না আহনতরি দুয়ার আটকান যাইবো না।
জরি বোকার মতো বলল, বাবায় যুদি হারারাইত না আহে তয় হারারাইত দুয়ার খোলা থাকবো? হারারাইত আমরা জাইগ্যা বইয়া থাকুম? হারারাইত ঘুমামু না?
জরির কথা শুনেও না শোনার ভান করল বানেছা।
বোনকে ধমক দিল পরি। চুপ কর। মায় না তরে কইলো অলইক্কা কথা কবি না।
বোনের ধমকে ভয়ে ভয়ে একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাল জরি। কুপির আলোয় উদাস চিন্তিত হয়ে আছে মায়ের মুখ। কিছুদিন আগে বিশাল পেট ছিল তার, শরীর ছিল ভারী। বোনটা হওয়ার পরই চেহারা ঘুরে গেছে। পাতলা পোতলা দেখায় আজকাল। বোনটা মরে যাওয়ার পর যেন চেহারাও সুন্দর হয়ে গেছে। শরীর চেহারায় স্বস্তির ছাপ। বোনটা মরে যেন রেহাই দিয়ে গেছে তাকে।
বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হামেদ বলল, ওই দাদা, কিচ্ছা ক। বইয়া বইয়া কিচ্ছা হুনি। তয় আর ঘুম আইবো না। বাবায় যহন ইচ্ছা আহুক, জাইগ্না থাকুম নে।
পরি জরিও বলল। হ দাদা, ক। কিচ্ছা ক।
