ডানহাতের বুড়া আঙুল মান্নান মাওলানার দিকে উঁচিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নূরজাহান বলল, আপনে আমার এইডা করবেন। পচা মলবি, কিচ্ছু জানে না খালি বড় বড় কথা! জানলে তো খাইগোরা (খানেরা) আপনেরেঐ ইমাম বানাইতো, অন্যদেশ থিকা ইমাম আনেনি! মাওলানা কারে কয়, ইমাম কারে কয় খাইগো বাড়ি মজজিদের হুজুররে দেখলে বোজবেন। দেখলেঐ ছেলাম করতে ইচ্ছা করে। ফেরেশতার লাহান মানুষ। আর আপনে, আপনেরে দেখলে মনে অয় খাডাস (খাটাস), রাজাকার।
রাজাকার কথাটা আথকা মুখে এসে গেল নূরজাহানের। কথাটা সে কোথায়, কার কাছে শুনেছে মনে নাই, অর্থ কী তাও জানে না, তবু বলল। বলে আরাম পেল।
তারপর মান্নান মাওলানার সামনে আর দাঁড়াল না নূরজাহান। হালদার বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে মনে হল বাপকে দউবরা বলার শোধটা ভালই নিয়েছে। ময়মুরব্বির মুখে মুখে কথা বলা, তাঁদের সঙ্গে বেয়াদবি করার পর মনের ভিতর এক ধরনের অপরাধবোধ হয়, হয়তো মা বাবার কাছ বিচার যাবে, হয়তো মারধোর করবে মা বাবা সেই ভয়ে ধুগযুগ ধুগযুগ করে বুক, কিন্তু নূরজাহানের তেমন কিছুই হল না। উৎফুল্ল মনে ছুটতে লাগল সে।
.
১.১৭
নিমতলার চুলায় ভাত চড়িয়েছে রাবি। নাড়ার আগুনে তেজ বেশি বলে চুলায় হাঁড়ি বসাতে না বসাতেই বলক ওঠে ভাতে। রাবির হাঁড়িতেও উঠেছে। সেদিকে খেয়াল নাই রাবির। সারাদিন বাড়া বানছে বেপারিবাড়িতে, খানিক আগে বাড়ি ফিরেই নিমতলায় বসেছে, একহাতে ভাত চড়িয়েছে চুলায় অন্যহাতে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেছে দশ বছরের ছেলে বাদলাকে। এখন ভাতের দিকে মন নাই, মন বাদলার দিকে। এতবড় হয়েছে ছেলে তবু বুকের দুধ ছাড়তে পারেনি। মাকে দেখলেই নেশাটা বাদলার চেপে বসে। দুইতিন বছর বয়সী শিশুর মতো ভঙ্গি করে মায়ের কোলে প্রথমে মুখ গোঁজে তারপর নিজ হাতে কাপড় সরিয়ে বুকে মুখ দেয়। রাবি একটুও বিরক্ত হয় না। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। মেদিনীমণ্ডল, কুমারভোগ, মাওয়া, দোগাছি যে গ্রামের যে বাড়িতে ডাক পড়ে, বিয়াইন্না রাইত্রে (ভোর রাতে) উঠে কাজ করতে চলে যায়। ধান বানে, ধান সিদ্দ করে। যে বাড়িতে কাজ করে সকাল দুপুর দুইবেলা খাবার পায় সেই বাড়িতে, ফিরার সময় পায় দেড় দুইসের চাউল। সেই চাউল টোপরে করে বাড়ি ফিরার পরই অন্যমানুষ হয়ে যায় সে। তখন আর রাবি কাজের মানুষ না, তখন রাবি মা। বাদলাকে বুকে চেপে উদাস হয়ে বসে থাকে। বাদলা দুধ খায়, রাবি নির্বিকার।
আজ বিকালে নির্বিকার ছিল না রাবি। রাগে ক্রোধে রোদে পোড়া পরিশ্রমী মুখ তার ফেটে পড়ছে। রাবির স্বভাব হচ্ছে নিচু স্বরে কথা বলা, রাগ করুক আর যাই করুক গলা রাবির কখনও চড়ে না।
এখনও চড়েনি। বুকে মুখ দেওয়া বাদলার মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে চাপা রাগি স্বরে বলল, কুনসুম মারছে?
মায়ের বুক থেকে মুখ সরাল না বাদলা, ঠোঁট আলগা করে জড়ানো গলায় বলল, দুইফরে।
কীর লেইগা মারলো?
এমতেঐ।
এমতেঐ কেঐ কাঐরে মারে না। তুই কী করছস ক!
কিছু করি নাই।
তরে হেয় পাইলো কই?
আমি তাগ ঐমিহি গেছিলাম।
কীর লেইগা গেছিলি?
কইতর (কবুতর) দেকতে।
কইতর কোনওদিন দেহচ নাই! আইজ নতুন কইরা দেহনের কী অইলো?
একথায় মায়ের বুক থেকে মুখ আলগা করে ফেলল বাদলা। তবে কোল থেকে মুখ সরাল না। যেন এখান থেকে মুখ সরালেই তার সম্পদ ছিনিয়ে নিবে অন্য কেউ, তার খাদ্যে ভাগ বসাবে অন্য কেউ। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বাদলা বলল, এই কইতর দেহি নাই মা। তুমিও দেহো নাই। আইজ গোয়ালিমান্দ্রার হাট থিকা কিন্না আনছে। লোটন (নোটন) কইতর। দুধের লাহান ফকফইক্কা। পাখ (পাখনা) দুইডা আর ঠ্যাং দুইডা এক হাতদা ধইরা, ঠোঁট দুইডা ইট্টু টান দিয়া কতক্ষুণ ঝাইক্কা (ঝাঁকুনি দিয়ে) মাডিতে ছাইড়া দিলে জব (জবাই) করা মুরগির লাহান দাপড়াইতে থাকে। খুব সোন্দর লাগে দেকতে।
রাবি বলল, কী দিয়া মারছে।
বাদলা কথা বলল না। খানিক থেমে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে এখন সেই সময় আর এই সময়ের খাদ্যটা একবারে উসিল (উসুল) করে নিচ্ছে।
রাবি বলল, ঐ ছেমড়া কথা কচ না ক্যা?
পলকের জন্য ঠোঁট আলগা করল বাদলা। খাড়ও কইতাছি।
তাড়াতাড়ি ক।
ক্যা?
আমার কাম আছে।
কী কাম?
বুজিরে কমু না?
কী কইবা?
মোতালেইব্বা যে তরে মারছে।
কইয়া কাম অইবো না। মোতালেব কাকায় কইছে আমি কেরে ডরাই না। এই বাড়ি আমার। আমার উপরেদা কেঐ কথা কইলে তারা এই বাইত্তে থাকতে পারবো না। দেলরা বুজিরেই থাকতে দিমু না, আর তরা তো চউরা, দেলরা বুজির ঘরে থাকচ।
একথা শোনার লগে লগে বাদলাকে ঠেলা দিয়ে কোল থেকে তুলে দিল রাবি। ওট, ম্যালা খাইছস। লাগলে ইট্টু পরে আবার খাইচ। অহন ল আমার লগে।
বাদলা হরতরাইস্যা (হকচকানো) ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। কই যামু?
বুজির কাছে।
বাদলা হি হি করে হাসল। বুজির কাছে যাইবা কী, ঐ যে বুজি।
বাড়ির দক্ষিণ দিককার পালানে (বাগানে) আনমনা ভঙ্গিতে পায়চারি করছেন দেলোয়ারা। কোনও কোনও বিকালে কী যেন কী কারণে উদাস হয়ে যান তিনি। বিশাল পালানে নরম পায়ে পায়চারি করেন, আকাশের দিকে তাকান আর ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। দেখে যে কেউ ভাববে গভীর কোনও দুঃখ বেদনায় যেন ডুবে আছেন মানুষটা।
