শেষদিকে গলা ধরে এল আজিজের।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বুঝেছি বাবা, আমি সব বুঝেছি। মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে এল। যান বাড়ি যান। আপনার মনে যে অনুশোচনা হয়েছে এই অনুশোচনাই আপনাকে পথ দেখাবে। তওবা করুন, পবিত্র মনে নামাজ পড়তে শুরু করুন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তিনি নিশ্চয় ক্ষমা করবেন।
তখন নিঃশব্দে আজিজ গাওয়ালের চোখ বেয়ে নেমেছে কান্নাধারা। চারদিকের চকমাঠ থেকে উধাও হতে থাকা দিনের শেষ আলোয় মানুষটিকে পৃথিবীর সবচাইতে অসহায় মানুষ মনে হচ্ছিল।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব এগিয়ে এসে তার মাথায় মায়াবী একখানা হাত রাখলেন। গভীর মমত্বের গলায় বললেন, এই কান্নাটা আল্লাহর কাছে কাঁদবেন। আপনার মনের সব কালিমা মুছে দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহপাক। তিনিই রহমানুর রাহিম। তিনিই পথ দেখাবেন।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের হাতখান ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগল আজিজ।
.
হামেদ বলল, ওমা, রাইত অইয়া গেল, বাবায় দেহি অহনতরি আহে না।
সাতদিনের মেয়েটা মারা যাওয়ার পর বছরখানেক বয়সের ছেলেটাকে আবার কোলে ফিরিয়ে এনেছে বানেছা। সন্ধ্যা বসে যাওয়ার পর সেই ছেলেটাকে আজ বুকের দুধ দিচ্ছিল। গলায় বুকে পিঠে পেটে বেশ ঘামাচি হয়েছে ছেলের। কুপির আলোয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘামাচি মারছিল। পিঠের দিককার ঘামাচি মারতে পারছিল না, গলা বুক আর পেটের দিককারগুলি মারছিল।
সন্ধ্যার পর পোলাপানরা সব ঘরে ঢুকে গেছে। মায়ের চারপাশ ঘিরে বসে আছে সবাই। আজিজ এখনও গাওয়াল সেরে ফিরেনি বলে দরজাটা খোলা। বাইরের উঠান অন্ধকারে থইথই করছে।
ছেলের কথা শুনে চোখ তুলে বানেছা একবার উঠানের দিকে তাকাল। হ বুজতাছি না ক্যান আহে না অহনতরি।
নাদের বলল, গেছে কই?
বানেছা কথা বলবার আগেই পরি বলল, তুই জান না গাওয়ালে গেছে?
জানুম না ক্যা?
তয়?
তয় কোনমিহি গেছে হেইডা জিগাইছি।
হামেদ বলল, বাবায় কি মারে কইয়া যায় আইজ কোনমিহি যাইবো?
বানেছা বলল, হ কইয়া যায়।
নাদের বলল, আইজ কোনমিহি গেছে?
দিগলি যাওনের কথা। গাওয়াল করতে করতে ভাঙ্গারির দোকানে যাইবো, গিয়া পুরানা মালছামান বেচবো, বেইচ্চা নতুন মালছামান লইবো তারবাদে গাওয়াল করতে করতে বাইত্তে আইবো।
জরি বলল, তয় অহনতরি আহে না ক্যা? বাবায় তো কোনওদিন রাইত করে না, হাজের আগে আগে বাইত্তে আইয়া পড়ে।
জরির ছোট একটা ছেলে বানেছার। নাম বদরুল, বাড়ির সবাই বদু বলে ডাকে। কথায় কথায় নাকিকান্না কাঁদবার স্বভাব। সেই ছেলে সন্ধ্যার পর থেকেই ঘ্যানঘ্যান করছে। তার দিকে তাকিয়ে বানেছা বলল, এই গোলামের পোয় এমুন করতাছে ক্যা?
পরি বলল, অর মনে অয় খিদা লাগছে।
মাত্র হাজ অইছে অহনঐ খিদা!
নাদের বলল, আমরা তো এই সমায়েঐ ভাত খাই।
হামেদ পরি সবাই বলল কথাটা।
বানেছা লজ্জা পেল। আসলেই তো সন্ধ্যা হওয়ার লগে লগেই পোলাপান নিয়া রাতের ভাত খেয়ে শুয়ে পড়ে তারা। আজ কেন সেটা বানেছার মনে নাই?
ব্যাপারটা বুঝল পরি। নাদেরের দিকে তাকিয়ে বলল, বিয়ালের মইদ্যেই তো বাইত্তে আইয়া পড়ে বাবায়। আইয়া সন্দার পর আমগো লগে বইয়া ভাতপানি খায়। আইজ বাবায় অহনতরি আহে নাই দেইক্কা মা’র মনে অয় মনে নাই যে সন্দা অইয়া গেছে। সন্দা না রাইতঐ অইয়া গেছে।
মেয়ের কথা শুনে হাসল বানেছা। হ ঠিক কথা কইছচ! এর লেইগা আমি উদিস পাই নাই যে রাইত হইয়া গেছে, তগো খিদা লাইগ্যা গেছে।
জরি বলল, তয় ভাত দিয়া দেও। বদু কানতাছে।
হামেদ বলল, বাবায় আহনের আগেঐ খাইয়া হালামু!
নাদের বলল, বাবায় কুনসুম না কুনসুম আহে হের লেইগা বইয়া থাকুমনি!
বানেছা বুঝল পোলাপানের ভালই ক্ষুধা লেগেছে। স্বামীর জন্য আর অপেক্ষা না করে ভাত বাড়তে বসে যাওয়া উচিত। তারা খেতে খেতে যদি এসে পড়ে তো ভাল না হলে যখন। আসবে তখন তার ভাতটা বেড়ে দিবে বানেছা।
কিন্তু এত দেরি আজ সে করছে কেন?
সঙ্গে নতুন মালসামানের ভার, লুঙ্গির ভিতরে মাজার কাইতানের সঙ্গে বাঁধা টাকার তহবিল এসব নিয়ে রাত বিরাত করে ফিরছে, পথে যদি চোর ডাকাতে ধরে! অনেকদিন জেল খেটে মুকসেইদ্দা চোরাও তো ফিরেছে গ্রামে। মানুষটা কি এসব জানে না? সে তো খুব সাবধানি লোক, টাকাপয়সার ব্যাপারে খুবই হিসাবি। সে তা হলে আজ এমন বেহিসাবির মতো আচরণ করছে কেন? কোথায় আটকা পড়ল? কতদূর চলে গিয়েছিল, কতদূর থেকে ফিরছে! দিঘলি বাজারে তো সপ্তাহ দশদিনে একবার করে যাচ্ছে, বহুদিন ধরে যাচ্ছে, কই কোনওদিন তো রাত করে ফিরে নাই! আজ কী হল?
এসব ভাবতে ভাবতে কোলের ছেলেটিকে মেঝেতে পেতে রাখা হোগলায় শুইয়ে ভাতের হাঁড়িপাতিলা রাখার দিকটায় চলে গেল বানেছা, ভাত বাড়তে বসল। পোলাপানরা যে যার মতো থাল নিয়ে বসল, পানির জগ গেলাস নিয়ে বসল।
পোলাপান আর স্বামীর ভাত বেড়ে দিয়ে নিজের ভাতটাও নেয় বানেছা। একসঙ্গেই খায় সবাই। আজ নিজের ভাত বানেছা নিল না। পোলাপানেরটা বেড়ে দিয়ে উদাস হয়ে বসে রইল। দেখে হামেদ বলল, তুমি খাইবা না মা?
হামেদের কথা শুনে নাদের পরি আর জরি তাকাল বানেছার দিকে। বানেছা খেতে বসেনি দেখে অবাকই হল।
বানেছা বলল, না আমি অহন খামু না।
নাদের বলল, তয় কুনসুম খাইবা?
পরি বলল, বাবায় আইলে।
