অনুমানে! আপনার কথা শুনে এতক্ষণ ধরে আপনাকে যতটা বুঝেছি তাতে অনুমান করা যায় এই ধরনের ক্ষেত্রে কী মনে হতে পারে আপনার।
ইট্টু কন তো হুজুর, ইট্টু মিলাইয়া দেহি আমার মনে যা আছিলো হেইডা আপনে কইতে পারেননি!
আজিজের চোখের দিকে তাকিয়ে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, আপনার মনে হয়েছিল, মা মরেছে ভাল হয়েছে। একটা যন্ত্রণা শেষ হল কিন্তু আমার মেটে তেলটা কেন নষ্ট করে মরল!
হুজুরের কথা শুনে কেঁপে উঠল আজিজের। হতভম্বের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, কী, আমার অনুমান কিছুটা কি ঠিক? কিছুটা কি মিলেছে আপনার চিন্তাভাবনার সঙ্গে?
আজিজ কোনওরকমে বলল, কিছু না হুজুর, পুরাডাঐ মিলছে। একদোম মিলা গেছে। আপনে যে হুজুর বহুত কামেলদার মানুষ এইডা আমি আইজকা পুরাপুরি বোজলাম।
না না এভাবে বলবেন না। আমি খুবই সামান্য একজন মানুষ। অতি নগণ্য একজন। মানুষ।
নিজেরে আপনে যা মনে হয় কন হুজুর, আপনে কী মানুষ হেইডা আমি বুজছি। তয় মাইট্টাতেল ছাড়া মা’রে লইয়া আরেকহান কথাও আমার মনে অইছিল হুজুর। হেইডা আরও বড় অন্যাই। হেইডা কমু হুজুর?
না বলতে হবে না। সেটাও আমি অনুমান করতে পারি।
আমি বুজছি, আপনে সত্যঐ পারেন। কন হুজুর, কন। আমার মনের ভিতরে বইসা থাকা পাপের কথাডা কন।
আপনি নিশ্চয় আপনার মায়ের দাফন কাফনের খরচা ইত্যাদি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন।
এবারও আগের মতোই হতভম্ব হল আজিজ। ঠিক হুজুর, একদোম ঠিক। ওইডা আমি চিন্তা করছিলাম।
তারপর হুজুরের পায়ের দিকে এগিয়ে এসে বলল, আমি আপনের পাও দুইহান ইট্টু ধরি হুজুর? ইট্টু ছেলাম করি আপনেরে?
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তটস্থ হলেন। পা টেনে নিয়ে বললেন, আরে না না, কেন? ওসব করবেন না। একদম না।
আজিজ আবার সরে গেল। তয় ঠিক আছে।
একটু থেমে বলল, এইবার আপনে বোজেন হুজুর, কেমুন বেইমান পোলা আমি। যেই মায় দশমাস দশদিন গরভে রাইক্কা জন্ম দিল, বুকের দুদ খাওয়াইয়া ডাঙ্গর করলো, সামর্থ্য থাকনের পরও হেই মায়ের পোলায় মা’র কাফোনের কাঁপোড় কিনতে চায় না। মনে মনে চায় মান্নান মাওলানায় যেই ফতোয়া দিছিলো হেই ফতোয়া হোননঐ ভাল আছিলো। মা’র লাচ সড়কখোলায় হালাইয়া দেওনঐ ভাল আছিলো।
অথচ আল্লাহপাক পবিত্র কোরান মজিদে বলেছেন আমি মানুষকে তাহার মাতাপিতার। সহিত ভাল ব্যবহারের নির্দেশ দিয়াছি। কষ্ট করিয়া তাহার জননী তাহাকে গর্ভে ধারণ। করিয়াছে, কষ্ট করিয়া তাহাকে প্রসব করিয়াছে আর ত্রিশ মাস কষ্ট করিয়া তাহাকে বহিয়াছে তাহার দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত, ক্রমে সে সমর্থ হয় আর চল্লিশ বৎসরে পৌঁছাইবার পর বলে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে শক্তি দাও যাহাতে আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পারি, আমাকে ও আমার পিতামাতাকে তুমি যে অনুগ্রহ করিয়াছ তাহার জন্য, আর যাহাতে আমি সকাজ করিতে পারি যাহা তুমি পছন্দ করো, আমার সন্তান সন্ততিদের সৎকর্ম পরায়ণ করো, আমি তোমারই দিকে মুখ ফিরাইলাম ও আত্মসমর্পণ করিলাম।’
আজিজ চুপ করে বসে রইল। কথা বলল না।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, আজ আপনি যেভাবে মায়ের কথা অনুভব করছেন, তিনি বেঁচে থাকতে যদি এই অনুভবটা আপনার হত তা হলে তিনি কিছুটা হলেও মনে শান্তি নিয়ে যেতে পারতেন।
আজিজ হতাশ গলায় বলল, কী জানি! মায় বাঁইচ্চা থাকলে মা’রে লইয়া এইরকম চিন্তা আমার মনে আইতো কি না কে কইবো। তয় মা’র দাফোন কাফোনের খরচাড়া আমি কইলাম অন্য আরেক মিহি দিয়া পোষাইয়া হালাইছি হুজুর।
সেই ঘটনাও আমি জানি। শুনেছি।
কে কইছে আপনেরে?
অনেকেই বলেছে যে আপনি আপনার সাতদিন বয়সি মেয়ের দাফন করেননি। কথা কাপড়ে প্যাচিয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছেন।
হ হুজুর, এইডাও আমার একহান বড় গুণা। এই হগল কইতেঐ আইজ আমি আপনের কাছে আইছি।
অথচ নিয়ম হচ্ছে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অথবা কিছুক্ষণ পর নবজাতকের মৃত্যু হলে তাকেও যথারীতি গোসল, কাফন, নামাজে জানাজা ও দাফন করতে হবে। তার নামও রাখতে হবে। আপনার মেয়েটি তো সাতদিন জীবিত ছিল। তার নিশ্চয় নামও রাখেননি?
না, তয় খুকি বইলা ডাকতো অর মায়।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব একটু চুপ করে রইলেন তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাবা, কাজগুলো খুবই খারাপ করেছেন আপনি। এখন শুধু একটাই কাজ করতে হবে আপনাকে। তওবা করে মন সাফ করতে হবে আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে মাপ চাইতে হবে। পবিত্র কোরান মজিদে পাকপরোয়ারদিগার বলেছেন ‘আর যাহারা অসৎকাজ। করে তাহারা পরে তওবা করিলে ও বিশ্বাস করিলে তোমার প্রতিপালক তো ক্ষমা করেন, দয়া করেন। তিনি তাঁহার দাসদের অনুশোচনা গ্রহণ করেন ও পাপ মোচন করেন; আর তোমরা যা করো তিনি তা জানেন। যাহারা অজ্ঞতাবশত খারাপ কাজ করে তাহারা পরে তওবা করিলে ও নিজেদের সংশোধন করিলে তাহাদের জন্য তোমার প্রতিপালক অবশ্যই। ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
আজিজ দূরাগত উদাস গলায় বলল, মা কী জিনিস এইডার একহান প্রমাণ আছে দামলার ঐদিককার মাইজপাড়া গেরামে। বাপ-মা মইরা যাওনের পর এক হিন্দুবাবু বাপ-মা’র নামে একহান মন্দির বানাইলো। বানানের সময় মিস্তিরিগো উঁচার দিকে একহান মাপ দেহাইয়া কইলো ওইতরি অইলো আমার বাপের নামে, বাপের ঋণ শোধ করনের লেইগা, তারপর থিকা যত উঁচা সম্ভব করবা মন্দির, শেষতরি যত উঁচা অইবো মন্দির ওইডা অইলো আমার মা’র নামে, মা’র ঋণ শোধ করনের লেইগা। কিন্তু বাপের সীমানা পইর্যন্ত উঁচা হওনের পর যেই মা’র নামে আরেকটু উঁচা অইলো মন্দির অমতেঐ ভাইঙ্গা পড়লো। যতবার উডায় মিস্তিরিরা ততবারই ভাইঙ্গা পড়ে। পরে বাবু বুঝলো ভগবানের ইশারায় এইটা হইতাছে। সে বোকা। সে জানে না যে মায়ের ঋণ কোনওদিন শোধ অয় না। সে আর ওই মন্দির ধরলো না। বাপের নামে যতনি উঁচা অইছিলো মন্দির ওহেনেঐ থাইম্মা থাকলো। বহুত বছর আগের ঘটনা। মন্দিরহান অহনও আছে। উপরের দিকটা ভাঙ্গা।
