মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আবার স্নিগ্ধমুখে হাসলেন। মায়ের মৃত্যুর দিন আপনাকে যেমন দেখেছি, সেই আপনি আর আজকের আপনি যেন এক নন বাবা। আপনি মনে হয় অনেক বদলেছেন।
কেমুন বদলাইছি কইতে পারবেন হুজুর?
কিছুটা বোধহয় পারবো।
কন তো।
আগে আপনি কথা খুব কম বলতেন, চুপচাপ ধরনের ছিলেন। আজ একেবারেই অন্যরকম। বেশ কথা বলছেন, বেশ চটপটে হয়েছেন।
ঠিকই ধরছেন হুজুর। আসলেই আমি অনেক বদলাইছি। তয় আরও বদলাইতে চাই, একদোম বদলাইতে চাই। ছুলুম (খোলস) বদলাইয়া সাপে যেমুন নতুন সাপ অইয়া যায়, হেমুন নিজের সবাব চালচলন কথাবার্তা বদলাইয়া আমি একজন নতুন মানুষ অইয়া যাইতে চাই হুজুর। একদোম নতুন মানুষ।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তীক্ষ্ণচোখে আজিজের মুখের দিকে তাকালেন। আপনি কি খুব বড় কোনও গুণাহ করেছেন?
আজিজ অকপটে বলল, হ হুজুর করছি। একটা তো বহুত বড় গুণা করছি। হেইডা মাইনষেরে দেহাইয়াঐ করছি। আর মনে মনে করছি অনেক গুণা, হেইডি খালি আমিঐ জানি, কেঐরে কই নাই, কে জানে না।
একটু থেমে চিন্তিত গলায় বলল, তয় আপনে বোজলেন কেমতে? কেমতে আমারে। জিগাইলেন আমি কোনও বড় গুণা করছি নি?
ওই যে আপনি বদলে যাওয়ার কথা বললেন, ওকথা শুনে। বড় ধরনের গুণাহ করা কোনও কোনও মানুষ এইভাবে বদলায় কিংবা বদলে যাওয়ার কথা ভাবে। এই ধরনের চিন্তা থেকেই একশো একটা খুন করার পরও পির আউলিয়া হয়ে যায় কোনও কোনও মানুষ। তবে এই সবই হয় আল্লাহপাকের ইশারায়।
হ আল্লার ইশারা ছাড়া গাছের পাতাও লড়ে না।
একটু চুপ করে থেকে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, এবার বলুন বাবা, কী বলতে চান।
কোনডা আগে কমু? মা’র কথা না মাইয়ার কথা?
আপনার মন কোনটা আগে বলতে চায়?
মা’র কথা কইতে চাই আগে।
আপনার মা সম্পর্কে কিছু কিছু কথা আমি জানি। ওসব বলবেন না। মৃত মানুষ সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে হয় না। অন্যকিছু বলতে চাইলে বলুন।
আপনে যা জানেন, আমার মা ছনুবুড়ির ওই হগল কথা গেরামের বেবাকতেঐ জানে। আমার মায় কূটনি আছিলো, চুন্নি আছিলো। পেডের ভাত জোগানের লেইগা ঠাইট না ঠাইট মিছাকথা কইতো, এইত্তো আছিলো আমার মা’র দোষ। তয় মা’র এই হগল দোষের লেইগা মা’য় দায়ী আছিলো না। দায়ী আমি। উপযুক্ত পোলা অইয়া বউর ডরে মা’রে আমি। তিনওক্ত খাওন দেই নাই। নিজের বউ পোলাপানরে লইয়া পেড ভইরা ভাত খাইছি, মা’র কথা চিন্তাও করি নাই। মা’র মিহি ফিরাও চাই নাই। মা’য় খাইলো কি খাইলো না, বাইত্তে আছে না কোনওহানে গেছে, মা’র শইলডা ভাল না মন্দ, মা’র ফিন্দনের কাপড় আছে না নাই, বাপ না থাকলে উপযুক্ত পোলার কাম অইলো এই হগল দেহন, আমি হুজুর কোনও দেহি নাই।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, এটা আপনি সত্যি বড় অন্যায় করেছেন। গহিত অন্যায় করেছেন। এটা ঠিক শেষ জীবনে আপনার মায়ের যে পরিণতি সেজন্য আপনি দায়ী। পবিত্র কোরান মজিদে বলা হয়েছে তাহাকে ছাড়া অন্য কাহারও উপাসনা করিতে ও মাতাপিতার সহিত সদ্ব্যবহার করিতে তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়াছেন। তোমার জীবদ্দশায় উহাদের একজন বা দুইজনই বার্ধক্যে পৌঁছাইলেও তাহাদেরকে ‘উহ্ আহ্’ বলিয়ো না, আর উহাদের অবজ্ঞা করিয়ো না, উহাদের সহিত সম্মান করিয়া নরমভাবে কথা বলিবে। দরদের সহিত বিনয়ের ডানা নামাইবে, আর বলিবে, হে আমার প্রতিপালক! উহাদের ওপর দয়া করো যেইভাবে ছেলেবেলায় উহারা আমাকে লালন পালন করিয়াছিলেন।
আমি তো মানুষকে তাহার পিতামাতার সহিত ভাল ব্যবহারের নির্দেশ দিয়াছি। কষ্টের পর কষ্ট করিয়া জননী সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে, আর তাহার দুধ ছাড়াতে ছাড়াতে দুই বৎসর কাটে। তাই আমার ওপর ও তোমার পিতামাতার ওপর কৃতজ্ঞ হও। আমার কাছেই। তো প্রত্যাবর্তন।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের কথা শুনে বুকের ভিতর উথালপাথাল করে উঠল আজিজের। সেদিন দুপুরে মাঠপারের হিজলতলায় বসে তোতার সঙ্গে কথা বলতে বলতে একসময় যেমন বুক ঠেলে উঠেছিল গভীর কষ্টের কান্না তেমন কান্না এখনও চোখের দিকে ঠেলে উঠল। জোর করে কান্নাটা আজিজ আটকে রাখল। কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে বসে রইল, নিজেকে সামলাল। তারপর মুখ তুলে হুজুরের দিকে তাকাল। আমার মনডা পাপে ভরা হুজুর, লোভে ভরা। মা’র মিহি ফিরা না চাওনের কারণও লোভ। সংসারে এতডি পোলাপান, বউ। অবস্থা যে আমার বহুত খারাপ তা না, জাগা সম্পত্তি ধানপান গিরস্তালি আর গাওয়াল কইরা আল্লায় আমারে মন্দ রাখে নাই। তিনওক্ত খাওনডা ভালঐ জোড়ে। তারবাদেও মনের লোভে আমার মনে অইছে, মা’য় একজন বাড়তি মানুষ, হের মিহি চাইয়া আমার লাভ কী! হেয় খাইলো না, না খাইলো, ফিনলো না, না ফিনলো, মরলো না বাঁচলো, আমার কী!
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অন্যায়, বড় অন্যায়।
এইসবের থিকাও বড় অন্যাই মা’রে লইয়া আমি করছি হুজুর। মরণের সময় পানির তিয়াস লাগছিল মা’র। হাতের সামনে পানি না পাইয়া পাইছিলো মাইট্টা তেল। তেলডা আমি কিন্না আনছিলাম বড়ঘরের খামে দেওনের লেইগা। হেই তেল খাইয়া, মাইত্তে হালাইয়া বিনাশ করলো মায়, এইডা দেইক্কা আমার কী মনে অইলো জানেন হুজুর?
জানি।
আজিজ চমকাল। আপনে জানেন হুজুর? কেমতে জানলেন? আমি তো কেঐরে কই নাই। আমার মনের কথা আপনে কেমতে জানলেন?
