আলফুর কথা শুনে মনের ভিতরকার লজ্জাশরম কোথায় যে কেমন করে উধাও হয়ে গেল। কুট্টির। চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল সে। অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে ধীর শান্ত গলায় বলল, আমারও এমুন হয়। আমারও রাইত্রে ঘুম আহে না। আমিও ছটফট ছটফট করি। আমার খালি মনে অয় দুয়ার খুইল্লা আমি আপনের কাছে আইয়া পড়ি। আপনের মাথায় বুকে হাত দোয়াইয়া (বুলিয়ে দেয়া অর্থে) দেই। আপনেরে ঘুম পাড়াইয়া, আপনের বুকের সামনে মুখ দিয়া আমিও ঘুমাইয়া পড়ি।
তয় তুমি তা কর নাই ক্যান! ক্যান আহো নাই আমার কাছে! দুয়ারের ওইপাশে হুইয়া রাইত ভইরা মনে মনে আমি যে তোমারে খালি ডাক পাড়ি, তুমি হোনো নাই ক্যান? তোমার অন্তরের ভিতর থিকা আমার ডাক তুমি হোনো নাই ক্যান?
হুনছি। আপনের ডাক আমি হুনছি। আপনের মনের বেবাক কথা আমি হুনছি। আপনে যেমতে হোনছেন আমারডা, যেমতে বোজছেন, ঠিক অমতেঐ আপনেরডাও হুনছি আমি, আপনেরডাও বুজছি।
তয় ক্যান আহো নাই আমার কাছে? ক্যান আমার মাথায় বুকে হাত দোয়াইয়া আমারে ঘুম পাড়াইয়া দেও নাই! ক্যান নিজে হুইয়া থাকো নাই আমার বুকের কাছে?
গভীর মায়াবী গলায় কুট্টি বলল, আইজ থিকা থাকুম। আইজ থিকা আমার নিজের বইলা আর কিছু রইলো না। আইজ থিকা আমার নিজের বেবাক কিছু আমি আপনেরে দিয়া দিলাম। এই ধরেন আমার হাত।
কুট্টি তার ডানহাতটা আলফুর দিকে বাড়িয়ে দিল।
কুট্টির চোখের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতন তার হাতটা দুইহাতে ধরল আলফু।
কুপির আলোয় মানুষ দুইটিকে তখন দেবদেবীর মতন লাগছিল।
.
আপনি যেন কে?
কাঁধের ভার মসজিদের বারান্দার কোণে নামিয়ে আজিজ গাওয়াল হাসিমুখে বলল, আপনে আমারে চিনেন নাই হুজুর?
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তখনও তাকিয়ে আছেন আজিজের দিকে। বয়সি চোখে মানুষকে চিনতে না পারার দৃষ্টি। আমতা গলায় বললেন, চেনা চেনা লাগছে, ঠিক মনে করতে পারছি না। বয়স হয়ে গেলে মানুষের দৃষ্টি এবং স্মৃতি দুটোই দুর্বল হয়ে যায়। আজ তো দেখছি কথাও একটু এলোমেলো হচ্ছে। বলা উচিত ছিল চেনা চেনা লাগছে ঠিক চিনে উঠতে পারছি না, বললাম ঠিক মনে করতে পারছি না।
আজিজ বিগলিত গলায় বলল, তাতে কোনও অসুবিদা নাই হুজুর। আমার লাহান। মানুষরে চিননের লেইগা চিন্তাভাবনা কইরা সময় নষ্ট করনের কাম নাই আপনের। আমি নিজেই নিজের পরিচয় দিতাছি। আমি আজিজ, আজিজ গাওয়াল।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব স্নিগ্ধ মুখে হাসলেন। এবার চিনেছি বাবা। মান্নান মাওলানা সাহেব আপনার মায়ের জানাজা পড়াতে চাননি, আমি গিয়ে পড়িয়েছিলাম। সেই আজিজ না আপনি?
জে হুজুর, জে। এইত্তো চিনছেন।
আসলে আমার শরীরটা বোধহয় আজ খারাপ বাবা। অথবা বেশি ক্লান্ত হয়েছি। দুপুরবেলা একটু পড়াশুনা করেছিলাম। এই ধরুন ঘণ্টাখানেক। তাতেই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। বয়স হয়ে গেলে অল্পতেই মানুষ বড় ক্লান্ত হয়।
আপনের বয়েস কত অইলো হুজুর?
ষাট-বাষট্টি তো হবেই।
এইডা আর কী এমুন বয়েস।
মসজিদের বারান্দা ছাড়িয়ে পুবদিকে কয়েক কদম খোলা জায়গা। তারপর বাঁধানো ঘাটলার পুকুর। নামাজি মানুষদের জন্য ঘাটলা তৈরি করা হয়েছে মসজিদের বারান্দা বরাবর। পানির দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়িগুলি বেশ পরিষ্কার। পুকুরের পানিটাও খুবই স্বচ্ছ, টলটলা। বিকালবেলার রোদ পুকুরের অর্ধেক পানিতে পড়েছে, বাকি অর্ধেক ছায়াময়। ফলে একই পুকুরের পানি রোদ ছায়ায় দুইরকম দেখাচ্ছে। পদ্মা মেঘনার মতো। যেখানে এসে মিলিত হয়েছে এই দুই নদী সেখানটায় গেলে দেখা যায় পদ্মার পানি ঘোলা, রাগী ধরনের। মেঘনারটা কালচে, স্নিগ্ধ।
খানিক আগে আছরের নামাজ শেষ করেছেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। নামাজিরা চলে যাওয়ার পরও নিত্যদিনের মতো কিছুক্ষণ ছিল সোনামিয়া। সে চলে যাওয়ার পর পরই তিনি ভেবেছিলেন ঘাটলায় গিয়ে থাকবেন। তখনই ভার কাঁধে এল আজিজ গাওয়াল। আজিজকে নিয়ে ঘাটলায় গিয়ে বসতে পারেন তিনি। আজিজের যদি কোনও কথা থাকে বসে বসে শোনবেন।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আজিজের মুখের দিকে তাকালেন। কী মনে করে এলেন বাবা?
আগের মতনই বিগলিত গলায় আজিজ বলল, আপনেরে কিছু কথা কইতে চাই হুজুর। কিছু অন্যাই স্বীকার করতে চাই আপনের কাছে।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব চমকালেন। কী করেছেন আপনি?
অনেক কিছু করছি হুজুর। অনেক অন্যাই, অনেক গুণা করছি। হেই হগল কথা আপনের কাছে কইতে চাই। গাওয়াল করতে গেছিলাম কোলাপাড়া মিহি। বড় সড়ক ধইরা গেলে এতক্ষুনে বাইত্তে যাইতাম গা। ওই মিহি না গিয়া আইছি আপনের কাছে। আপনের হুজুর ইট্ট সমায় অইবো আমার কথা হোননের?
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব অমায়িক গলায় বললেন, নিশ্চয় হবে, নিশ্চয়। আসুন ঘাটলায় গিয়ে বসি। বসে বসে শুনি আপনার কথা।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের পিছন পিছন ঘাটলায় এল আজিজ। বেঞ্চে পিঠ ঠেকিয়ে বসলেন মহিউদ্দিন সাহেব। আজিজকে বললেন, বসুন বাবা, বসুন।
মুখামুখি বেঞ্চটায় বসল না আজিজ, বসল হুজুরের পায়ের কাছে।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বিব্রত হলেন। ওকী, ওখানে বসলেন কেন? উঠুন, ওই বেঞ্চটায় বসুন।
না হুজুর, আপনের সমান জাগায় বহুম না।
কেন, কী অসুবিধা?
আমার ভাল্লাগবো না হুজুর। আপনের পায়ের সামনেঐ ভাল্লাগতাছে।
