দেলোয়ারার কথা শুনে কেউ আর কোনও কথা বলল না।
ওদিকে কলাপাতায় জড়িয়ে বাদলার শরীরের সেই অংশটুকু পায়খানা ঘরের ওদিককার ঝোঁপ জঙ্গলে তখন ফেলে দিচ্ছিল আবদুল। আর মনে মনে কাজটি ভালভাবে শেষ করবার জন্য আল্লাহপাকের দরবারে শোকরগুজার করছিল।
.
তুমি খাইবা না?
চোখ তুলে আলফুর দিকে একবার তাকাল কুট্টি। তারপর মাথা নিচু করে বলল, পরে খামুনে।
মুখের ভাত গিলে আলফু বলল, পরে কুনসুম?
আপনে খাইয়া গেলে।
ক্যা?
এমতেঐ।
আগে তো আমার লগে বইয়াঐ খাইতা। কয়দিন ধইরা দেকতাছি লগে বইয়া খাও না। আমারে খাওয়াইয়াদাওয়াইয়া তারবাদে খাও।
হ।
কীর লেইগা?
অমতে খাইতে ভাল্লাগে।
আলফু কুট্টির দিকে তাকাল। কুপির আলোয় কুট্টির মুখোন পাকা ডালিমের মতন লজ্জারাঙা দেখাচ্ছে। দেখে ভাল লাগল আলফুর। বলল, আমি বুজছি।
কী বোজছেন কন তো!
স্বামীর খাওনের পর বউরা যেমতে খায় তুমি কয়দিন ধইরা ওমতে খাও।
লগে লগে আলফুকে সাবধান করল কুট্টি। ঠোঁটে আঙুল তুলে ফিসফিস করে বলল, আস্তে কথা কন। বুজানে কইলাম জাগনা।
আমার মনে হয় না জাগনা। জাগনা থাকলে আওজ পাইতাম না?
আওজ নাও করতে পারে। বুড়ি বহুত ট্যাটনা। এই বসেও কানে ভাল হোনে। আপনেরে খাইতে দিয়া কী কথা কই আমি, চুপ কইরা হেই কথা হোনে। মাঝে মাঝে আমারে আবার জিগায় আলফুর লগে কীয়ের এত কথা কচ।
তহন তুমি কী কও?
আমি চেইত্তা যাই। কী কমু? আলফু আমার ভাতার নি যে হের লগে আমি রঙ্গরসের কথা কমু! আমারে চেততে দেকলে ডরায় যায় বড়বুজানে। মনে করে চেইত্তা থাকলে আমি হের কামকাইজ করুম না। হাইগা মুইত্তা বিচনা নাশ করবো, ধুমু পাকলামু না।
থালে ভাত তরকারি মাখতে মাখতে হাসল আলফু। অহন যে তুমি এত জোরে কথা কইতাছো এইডা হোনতাছে না বড়বুজানে?
আলফুকে হাসতে দেখে কুট্টিও হাসল। তারপর গলা নিচু করে বলল, আমারও মনে অয়। জাগনা নাই বুজানে। ঘুমাইয়া পড়ছে। কোনও কোনওদিন খাওনের লগে লগেঐ ঘুমাইয়া যায়।
আইজ ঘুমাইছে নি দেখবা?
ক্যা?
হেয় ঘুমাইয়া পড়লে নিশ্চিন্ত মনে তোমার লগে কথা কইতাম।
কী কথা?
অনেক কথা আছে। হেদিনের পর থিকা কইতে চাই, কওয়াই হয় না।
একথা শুনে কুট্টির মন উত্তেজনায় ভরে গেল। শরীরের পরতে পরতে আচমকাই লাগল আশ্চর্য এক শিহরন। মনে মনে সে বলল, হেদিন না, আমি তো তার অনেকদিন আগে থিকাঐ অনেক কথা আপনেরে কইতে চাই। কইতে পারি না। শরম করে।
মনের শরম এখন কুট্টির চোখেমুখেও ছিল। তবু আলফুর কথা মতো উঠল সে। পাটাতনে যেন শব্দ না হয় এমন পা টিপে টিপে খাটালের পালঙ্কের কাছে গিয়েই ফিরে এল। নিজের পিঁড়িতে বসতে বসতে হাসিমুখে বলল, বুজান ঘুমাইয়া গেছে। ব্যাপোর (বেঘোর) ঘুমে অহন।
আলফু হাঁপ ছাড়ল। তয় নিশ্চিন্ত মনে কই।
কন।
আমি যে দ্যাশে গেলাম না এইডা লইয়া দিহি তুমি আর কোনও কথা কইলা না?
কী কমু?
তুমি ব্যাজার অইছো না খুশি?
আপনের কী মনে অয়?
মনে অয় খুশি অইছো।
হ। বহুত খুশি অইছি।
আলফুর পাতে একটু ভাত তুলে দিল কুট্টি, গজার মাছের সালুন তুলে দিল।
আলফু হাত তুলে বলল, আর দিয়ো না। খাইতে পারুম না।
পারবেন। এতবড় জ্বর থিকা উটছেন, কয়দিন ঠিক লাহান না খাইলে শইল ভাল অইবো না।
শইল ভাল অইয়া গেছে। পুরাপুরি ভাল। তুমি যেমতে আদরযত্ন করছে, অত আদর যত্নের পর শইল ভাল না অইয়া পারে!
তারবাদেও তো দ্যাশে যাইতে চাইলেন। কইলেন মাসেকহানি জিরাইয়া আইবেন।
আলফু আচমকা বলল, কোন জিরান জিরাইতে চাইছিলাম তুমি বোজো নাই?
শুনে লজ্জায় মরে গেল কুট্টি। শরীরের ভিতর কেমন করতে লাগল তার। সে কোনও কথা বলল না।
আলফু বলল, আমি জানি তুমি আমার কথা বোজছে। বোজবা না ক্যা? তুমি তো ডাঙ্গর মাইয়া। বিয়াও অইছিলো। না বোজনের কথা না। তয় বুইজ্জা থাকলেও যে এই হগল কথার জব তুমি দিবা না হেইডা আমি বুজি। বিয়াতো অউক আর আবিয়াতো, মাইয়া মাইনষের বুক ফাডে তো মুখ ফোড়ে না।
কুট্টি মনে মনে বলল, ঠিক কথা, একদম ঠিক কথা।
মুখে কিছু বলল না। মাথা নিচু করে বসে রইল।
আলফু বলল, তুমি আমারে লইয়া মনে মনে যা চিন্তা করছো, আমিও অহন হেইডাঐ চিন্তা করি। আমগো দুইজনের মন কী চায় আমরা দুইজনেঐ হেইডা জানি। তয় কেমতে কী করুম হেইডা বোজতাছি না।
মাথা নিচু করেই কুট্টি বলল, কী করতে চান?
চাই তো সবঐ করতে। তয় তোমার নাইলে সংসার নাই আমার যে আছে।
বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বিড়ালটা ঘুরঘুর করছিল আলফুর পাতের কাছে। খেতে খেতে দুই একটা মাছের কাঁটা, একটুখানি মাখা ভাত বিড়ালটাকে দিচ্ছিল আলফু। মাথা নিচু করেই দৃশ্যটা দেখছিল কুট্টি। কিন্তু আলফুর সংসারের কথা শুনে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল তারপর আবার মাথা নিচু করল। আমি তো আপনের সংসার ভাঙতে কই নাই। আমি তো আপনেরে কই নাই আমারে আপনে বিয়া করেন।
আলফু বলল, না তুমি কও নাই কিছু। কইতাছি আমি। আমি তোমার মনডা বুজছি। তুমিও আমার মনডা বুজার চেষ্টা কইরো। যেই চিন্তা কইরা আমার দ্যাশে যাওনের কথা হুইন্না তুমি মন খারাপ করছিলা হেই চিন্তা কইরাঐ দ্যাশে আমি যাই নাই। তয় সাফ কথা তোমারে আমি কই, এমতে থাকতে আমি আর পারছি না। আমার ভাল্লাগে না।
কুট্টি মনে মনে বলল, আমিও থাকতে পারতাছি না। আমারও ভাল্লাগে না।
ভাত খাওয়া শেষ করে থালে হাত ধুতে ধুতে আলফু অস্থির গলায় বলল, রাইত্রে আমার একদোম ঘুম আহে না। খালি ছটফট ছটফট করি। ঘরের ওইমিহি তুমি হুইয়া থাকো, এইমিহি আমি, মদ্যিহানে বন্ধদুয়ার। আমার মনে অয় দুয়ার আমি ভাইঙ্গা হালাই। তোমার কাছে যাইগা, আর নাইলে তোমারে লইয়াহি আমার কাছে।
