মতলা বলল, না আমার যাওনের কাম নাই। আমি আপনের লগে থাকুম নে।
ক্যা?
আপনে একলা তো পাও দুইহান ফাঁক কইরা ধরবেন। আমি পিছে থিকা চকু ধইরা রাখুম নে।
ডর করবো না তর?
না, কীয়ের ডর? আর যুদি ডর করে তয় চকু বুইজ্জা থাকুম।
মতলার কাঁধে চাপড় দিল মোতালেব। এমতে ম্যারা অইলে কী অইবো, তর তো বেড়া সাহস আছে। ল।
বাদলাকে নিয়ে তিনজন মানুষ ঘর থেকে বেরুল। বাদলাকে বেরুতে দেখে রাবি দ্রুত পায়ে চলে গেল বারবাড়ির দিকে।
পালানে এসে বাদলাকে কোলে নিয়ে আবদুলের জলচৌকিতে বসল মোতালেব। বাদলার। লুঙ্গি তুলে দুই ঠ্যাঙের ফাঁক দিয়ে দুইহাত ঢুকিয়ে এত শক্ত করে ধরল বাদলাকে, ছেলের নড়াচড়ার শক্তি রইল না।
মতলা দাঁড়িয়ে ছিল পিছনে। আবদুল জেনে গেছে ছেলের চোখ ধরবে বাপ। সে মতলাকে ইশারা করল চোখ ধরতে। মোতালেবের ঘাড়ের দুইপাশ দিয়ে দুইহাত এনে বাদলার চোখ চেপে ধরল সে।
মোতালেব তখন ছেলে ভুলানো কথা বলছে বাদলার সঙ্গে। ওই বাদলা, তর মনে আছে। হেদিন গোরস্থানের পুকঐরে কী মাছ পাইছিলাম আমরা?
বাদলা বলল, হ মনে আছে।
ক তো।
কই পাইছিলাম আষ্টহান, দুইহান গজার টাকি, আর…
কথা শেষ করবার আগে বাদলা টের পেল তার পেচ্ছাবের জায়গার মাথার দিককার চামড়া টেনে ধরেছে আবদুল। কিন্তু সে কোনও ব্যথা পাচ্ছে না। এজন্য ব্যাপারটা সে পাত্তা দিল না। মোতালেবের কথার রেশ ধরে বলল, বিরাট বিরাট রয়না পাইছিলাম ছয়হান….
ঠিক তখনই বাঁশের চেঁাচ দিয়ে ঘঁাচ করে আবদুলের কাজটা আবদুল সেরে ফেলল। বাদলা উঃ করে সামান্য একটু শব্দ করল।
মোতালেব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল ব্যাপারটা। তার পিছনে দাঁড়ানো মতলাও দেখছে।
কাটাকাটির কাজ সেরে কাপড় পোড় ছাই জায়গা মতো লাগাতেই বাদলা মোচড় দিয়ে উঠল। উঁহু রে উঁহু রে। জ্বলতাছে, জ্বলতাছে।
মোতালেব বলল, কাম অইয়া গেছে। অহন ইট্টু জ্বলবোঐ।
ছাইটা জায়গা মতন লাগাবার পর আবদুল তখন যে পাতলা কাপড়ের টুকরা রেখে দিয়েছিল সেটা দিয়ে জায়গাটা বেঁধে দিচ্ছে বাদলার। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, কাজ শেষ হয়ে গেল। আবদুল হাসিমুখে বলল, যান, অহন ঘরে লইয়া যান।
ওই অবস্থায়ই বাদলাকে ঘরে নিয়ে এল মোতালেব। এনে বারান্দার চৌকিতে শোয়াইয়া দিল। বাদলার সামনে তখন অনেক লোক। দেলোয়ারা মতলা মোতালেবের বউ। বারবাড়ির দিক থেকে পাগলের মতো ছুটে এল রাবি। এসে ছেলের উপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুক্কু পাইছো বাজান? অ্য, দুকু পাইছো?
যেন বিশাল একখান গর্বের কাজ শেষ করেছে বাদলা এমন গলায় হাসিমুখে বলল, আরে না। ইট্টুও দুকু পাই নাই। খালি একহান পিঁপড়ার কামড়ের লাহান। ইট্টুহানি জ্বলছে।
বড় একখান মুড়ির মোয়া বাদলার হাতে ধরিয়ে দিলেন দেলোয়ারা। ভাল অইছে। অহন মোয়া খা।
মোতালেব ততক্ষণে আয়েশ করে বসেছে বাদলার পাশে। মুখে পরিতৃপ্তির ভাব। রাবির দিকে তাকিয়ে খুবই আন্তরিক গলায় বলল, দে রে রাবি, ক্ষীর দে। ইট্টু বেশি কইরা দেইচ। কাম শেষ অইছে, অহন আরাম কইরা ক্ষীরডা খাই।
গাবদা গোবদা একটা রেকাবিতে মোতালেবকে বেশ খানিকটা ক্ষীর এনে দিল রাবি। রেকাবিটা হাতে ধরে খেতে শুরু করল মোতালেব। খেতে খেতে বাদলার দিকে তাকাল। তর মোসলমানি দেইক্কা আইজ অন্য একহান ঘটনার কথা মনে পড়ল।
মুড়ির মোয়ায় কামড় দিয়ে বাদলা বলল, কী?
আমগোবাড়ির একজন মানুষ কইলাম নিজের মোসলমানি নিজেঐ কইরালাইছিল।
শুনে বাদলা তো অবাক হলই, রাবি মতলা আর বাদলাকে দেখতে আসা বাড়ির অন্যান্য পোলাপানও অবাক। কেউ কোনও কথা বলবার আগেই খাটালের পালঙ্কে বসা দেলোয়ারা হাসলেন। হ হাবজা দাদায়।
বারান্দা থেকে মোতালেবও হাসল। আপনের তাইলে মনে আছে বুজি?
দেলোয়ারা বললেন, থাকবো না? এমুন একহান ঘটনা কেঐ ভেলতে পারে?
বাদলা বলল, ক্যা, এমুন কাম হেয় কীর লেইগা করছিল?
বাদলার আচরণে বোঝাই যাচ্ছে না খানিক আগে মুসলমানি হয়েছে তার। মুড়ির মোয়া খেতে খেতে কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে যেন কিছুই হয়নি। যেন নিত্যদিনের মতো স্বাভাবিক আছে সে, সেভাবেই কথা বলছে।
এক খাবলা ক্ষীর মুখে দিয়ে মোতালেব বলল, বাপ চাচাগো উপরে রাগ কইরা।
কন কী?
হ। বারো-চৌদ্দ বছর বস্ হইয়া গেছে তার কেঐ মোসলমানি করায় না। ওইদিকে। তার থিকা বসসে ছোড ফুবাতো ভাই মন্নাফদাদা দলিলদাদা তাগো বেবাকতের মোসলমানি অইয়া গেছে, এর লেইগা একদিন রাগ কইরা সন্ধ্যার পর পর তাগো পুবের ঘরের কেফিনে বইয়া বেলেড দিয়া নিজের মোসলমানি নিজে কইরালাইছে। আমার বাপ চাচাগো এক ফুবু থাকতো ওইঘরে, তারে বেবাকতে কইতো হাইজ্যা বুড়ি, হাবজাদাদায় নিজের মোসলমানি নিজে কইরা হাইজ্যাবুড়ির একহান কাপড় দিয়া জাগাড়া চাইপপা ধইরা রাখছিল। রক্তে হেই কাপড় ভিজ্জা গেছিলো।
বাদলা গভীর আগ্রহের গলায় বলল, তারবাদে?
ক্ষীর প্রায় শেষ করে মোতালেব বলল, তারবাদে আর কী? বাইত্তে চিকরাচিকরি পইড়া গেল। দুই-চাইর দিন পর আবার সব ঠিকঠাকও অইয়া গেল।
খাটাল থেকে দেলোয়ারা বললেন, আমগো বাড়ির পোলাপানের মইদ্যে হাবজাদাদায় অইলো সবার বড়। হের যহন যা মন চাইতো করতো। কেঐর কথা হোনতো না। হারাদিন খালি ঘুডুর ঘুডুর করতো। এইডা বানায়, ওইডা বানায়। এই করতে করতে মিস্তিরি অইয়া গেল। এমুন নামকরা বাপের বড়পোলা, অইলো কাঠ মিস্তিরি!
