মসজিদের দক্ষিণ দিককার আমগাছে বসে একটা কাক ক্লান্ত গলায় কা কা করছিল।
২.৫ কী রে আবদুল
কী রে আবদুল, কী চিন্তা করচ?
দেলোয়ারাদের পালানের এক কোণে বসে পাতলা সাদা একটুকরা কাপড় মোমের আগুনে পুড়ে ছাই করছে আবদুল। তার সামনে জলচৌকি আর পিড়ি। আবদুল বসে আছে পিঁড়িতে। জলচৌকি আর পিঁড়ির মাঝখানে তাজা এক টুকুরা কলাপাতা। একপাশে জ্বলছে। চারভাগের তিনভাগ পুড়ে শেষ হওয়া চিকন একখান মোম। মোমের আগুনে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে পাতলা কাপড়ের টুকরাটা ধরে রেখেছে আবদুল। পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে টুকুরা তবু খেয়াল করছে না। যদিও ছাইটাই সে কলাপাতায় জমিয়ে রাখবে, ছাইটাই তার দরকার। অবশ্য চিকন একটুকুরা পাতলা কাপড়ও দরকার। সেটা সে আগেই যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
কিন্তু মুসলমানির কাজে এসে আজ এমন অন্যমনস্ক হয়ে আছে কেন আবদুল?
অদূরে দাঁড়িয়ে আবদুলের কাজ দেখছিল মোতালেব। মোমের আগুনে কাপড়ের টুকরা পোড়ানো দেখতে দেখতে তার অন্যমনস্কতাও দেখে ফেলল। দেখেই প্রশ্নটা করল।
মোতালেবের কথায় আবদুল একটু চমকাল, তারপর ম্লান হাসল। না কী চিন্তা করুম!
হ কী জানি চিন্তা করচ। তোর মোক দেইক্কা বোজতাছি।
কিছু চিন্তা করি না।
করিচ না। এই হগল কামের সমায় অন্যচিন্তা করলে বিপদ ঘইটা যাইবো। বেশি কাইট্টা কুইট্টা হালাইলে পোলাড়া মরবো। তারবাদে যুদি পোলার মা-বাপে থানায় গিয়া কয় তর লেইগা তাগো পোলা মরছে, তর নামে কেস অইয়া যাইবো। থানার দারোগা পুলিশ আইয়া ধইরা লইয়া যাইবো তরে, জেল ফাঁসি অইয়া যাইবো। কারণ এইডাও এক রকমের খুন।
শুনে সেদিন মায়ের মুখে রুস্তম রিকশাআলার খুনের কথা শুনে প্রথমেই যেমন বুক হিম হয়েছিল আবদুলের এখনও তেমন হল। আসলে তছির কথা ভেবেই অন্যমনস্ক হয়েছিল সে। সেদিনের পর থেকে মনটা ভাল নাই। যখন তখন মনে পড়ে তার বোন একজন লোককে খুন করেছে। যখন তখন সেই খুনের জের ধরে পুলিশ আসবে বাড়িতে। কাঁথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাগল বোনটাকে ধরে নিয়ে যাবে। তারপর জেল, ফাঁসি।
এখন মোতালেবের কথা শুনে মনে হল ঠিক কথাই বলছে মোতালেব। এক খুনের কথা ভেবে অন্যমনস্ক হয়ে থাকা আবদুল যদি মুসলমানি করতে গিয়ে পরিমাণের চেয়ে বেশি কেটে ফেলে বাদলার অঙ্গ তা হলে তো সেও হয়ে গেল বোনের মতো আরেক খুনি। বোনটা না হয় পাগল, পাগলে কী না করে, আবদুল তো পাগল না। আবদুল সুস্থ মাথার ধীর স্থির মানুষ।
আবদুল তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। না, এরকম অন্যমনস্ক থেকে কাজটা সে করতে পারে না। তা ছাড়া এটা হচ্ছে ধর্মের কাজ। দুনিয়াদারির দারোগা পুলিশের চেয়েও বড় একজন দারোগা পুলিশ বসে আছেন সাত আশমানের উপর। সবদিকে চোখ তাঁর। ধর্মের কাজে কেউ গাফিলতি করছে দেখলে সেই মানুষের উপর গজব নাজেল করবেন। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করবেন সেই মানুষকে।
না না এমুন কাজ আবদুল করতে পারে না। তার মনে যা আছে তা মনেই থাকুক। যে পবিত্র কাজে সে এসেছে সেই কাজ সুন্দরভাবে শেষ হোক।
আবদুল দৃঢ় গলায় বলল, সব ঠিক আছে। কোনও চিন্তা কইরেন না মোতালেবকাকা।
শুনে খুশি হল মোতালেব। তয় আনুম বাদলারে?
হ আনেন।
তুই রেডি?
হ একদোম রেডি।
বাড়ির পোলাপানরা এইদিকে আজ বিকালে কেউ ভিড়তে পারছে না মোতালেবের ভয়ে। বাড়িতে আগেই মোতালেব রাষ্ট্র করে দিয়েছে, এদিকটায় যেন কেউ না আসে। মুসলমানির কাজ পোলাপানদের দেখা উচিত না। কাজটা ভয়ের। যে কেউ ভয় পেতে পারে। সুতরাং যে যার পোলাপান আগলে রাখার চেষ্টা করছে।
তারপরও ঘরদুয়ারের আনাচ কানাচ থেকে উঁকি মারছে কেউ কেউ। বাড়ির বউঝিরাও কেউ কেউ করছে কাজটা। যেই মোতালেব তাদের দিকে তাকাচ্ছে অমনি চট করে মুখ সরিয়ে নিচ্ছে আড়ালে।
রাবি এতক্ষণ ছিল নিমতলার চুলার পারে। খাজুইরা মিঠাই, নারকেল দুধ আর ভেঁকিছাটা চিকন চাউল দিয়ে ক্ষীর বেঁধেছে। দেলোয়ারাও ছিলেন তার সঙ্গে। বাড়িতে মুসলমানি হলে নানান পদের নাড়ু আসে আত্মীয় বাড়ি থেকে। রাবির তো আর তেমন কোনও আত্মীয়স্বজন নাই। নাড়ু নিয়ে আসবে কে! এজন্য দেলোয়ারা নিজেই আজ প্রায় সারাদিন বসে বাদলার জন্য তিল মুড়ি কাউন আর নারকেলের নাড়ু বানিয়েছেন। খানিক আগে হাতের কাজ শেষ করে নাড়ু মোয়া নিয়ে ঢুকেছেন বড়ঘরে। রাবিও তার ক্ষীরের হাঁড়ি নিয়ে গেছে। দুইজনেই তারা এখন বড়ঘরে ওইসব জিনিসের তদারক করছে। বারান্দার চৌকিতে বসে আছে। মতলা। তার সামনে নতুন লুঙ্গি আর নতুন সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা বাদলা দাঁড়িয়ে। ডর ভয় কিচ্ছু যেন নাই ছেলেটির। অতি উৎসাহে মুসলমানির জন্য অপেক্ষা করছে।
এসময় মোতালেব এসে ঢুকল ঘরে। ল রে বাদলা।
বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, লন।
খাটালে বসা দেলোয়ারা বললেন, ওই রাবি, তুই এইমিহি থাকিচ না। তুই বাইর বাড়ি মিহি যা গা। মোসলমানি হওনের পর আমি তরে ডাক দিমু নে।
কেন দেলোয়ারা তাকে চলে যেতে বলছেন বুঝতে পারল না রাবি। বলল, ক্যা, পোলার মোসলমানির সামনে আমি থাকুম না?
না। মোসলমানির সমায় দুকু পাইয়া পোলায় যহন কানবো হেই কান্দনডা তর অন্তরে গিয়া লাগবো। হেই কান্দনডা মা-বাপের হোনন উচিত না।
কথাটা মোতালেবও বলল, হ। বুজি ঠিকঐ কইছে। তুই আর মতলা বাইর বাড়ি মিহি যা গা।
