নামাজ শেষ হওয়ার বেশ খানিক পর মসজিদ থেকে বেরিয়েছেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। তখনও সোনামিয়া আছে, অন্য সবাই যে যার মতো চলে গেছে। সোনামিয়াকে কিছু একটা বলতে যাবেন তিনি, দেখেন মসজিদের বারান্দার দক্ষিণ কোণের দিকে ঘোমটা ঘামটা দিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। সঙ্গে দশ-এগারো বছরের একটি ছেলে। মা-ছেলে কাউকেই তিনি চিনতে পারলেন না।
চিনল সোনামিয়া। বলল, কী রে বাদলা, কীর লেইগা আইছচ?
বাদলা তার স্বভাব মতন চটপটা গলায় বলল, আমি আহি নাই। মায় আমারে লইয়াইছে।
কীর লেইগা?
হেইডা মারে জিগান।
সোনামিয়া রাবির দিকে তাকাল। কীর লেইগা আইছো কও।
ঘোমটায় মুখ ঢাকা রাবি বলল, আইছি হুজুরের কাছে।
এবার মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব নরম মায়াবী গলায় বললেন, কী জন্য আসছেন মা, বলেন।
আমার পোলাডার আইজ বিয়ালে মোসলমানি করামু। এর লেইগা আপনের কাছে লইয়াইছি। অরে আপনে ইট্টু দোয়া কইরা দেন হুজুর। কামডা য্যান ভাল মতন অয়। ও য্যান দুঃকু মুক্কু না পায়।
আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে।
বলেই ধীর পায়ে বাদলার কাছে এগিয়ে এলেন তিনি। বাদলার মাথায় হাত রেখে বললেন, আল্লাহপাক তার রহমতের সব দরজা তোমার জন্য খুলে দেবেন বাবা। কোনও ভয় নেই। ইনসাল্লাহ ভালয় ভালয় সব কাজ হয়ে যাবে।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের আচরণে এতটাই মুগ্ধ হল রাবি, বাদলাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ওই বাদলা, ছেলাম কর হুজুররে। ভাল কইরা ছেলাম কর।
বাদলা নত হয়ে পায়ে হাত দিল মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের। বাদলার পর রাবিও করল কাজটা। তারপর দ্রুত পায়ে দক্ষিণ দিককার আমগাছগুলির গা ছুঁয়ে নেমে যাওয়া পথ ধরে মাঠের দিকে নেমে গেল।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তখন সোনামিয়ার দিকে তাকিয়েছেন। মুসলমানি বা সুন্নতে খত্যর ইতিহাসটা আপনি জানেন বাবা?
সোনামিয়া বলল, না হুজুর। জানি না। কেমতে জানুম কন? আপনে তো কন নাই।
এখন কি শোনার সময় হবে আপনার?
ক্যান অইবো না?
দুপুর হয়ে গেছে। বাড়ি গিয়ে ভাত খাবেন না?
আমার অহনতরি খিদা লাগে নাই হুজুর। আরও ঘণ্টাহানি পর বাইত্তে গিয়া খামুনে।
তারপর হাসিমুখে বলল, আপনের লাগে নাই?
না বাবা। ভাত দিয়া গেছে?
জি দিয়ে গেছে।
আইজ কোন বাইত থিকা দিল?
কাজিবাড়ি থেকে।
কী খাইবেন জিগাই গেছিলো?
জি সকালবেলা এসে জানতে চেয়েছিল কী মাছ খাব। নাকি মুরগি রান্না করবে। এই কথাটা বলতে আমার কোনওদিনও ভাল লাগে না বাবা। গ্রামের একেকবাড়ি থেকে একেকদিন আমার খাবার দিচ্ছেন আপনারা, বেতনটা দিচ্ছে মসজিদ কমিটি। সবকিছু অতি সুন্দরভাবে চলছে। কিন্তু মানুষগুলো আপনাদের গ্রামের এত ভাল, যে বাড়ি থেকে যেদিন তিনবেলার খাবার পাঠাবার কথা সেই বাড়ি থেকে সেদিন কিংবা আগের দিন রাতে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে কোন বেলায় কী খাব। আমি বলি আপনারা যা খাবেন তাই দিয়ে যাবেন বাবা। আমার জন্য বিশেষ কিছু করতে হবে না। কিন্তু তারা শোনে না। জোরাজোরি করে। কাজিবাড়ির লোকেরাও তাই করেছে। শেষপর্যন্ত আমি বলেছি যে কোনও মাছ হলেই হবে। তারা মাছই পাঠিয়েছে।
তয় আপনে খাইয়া লন হুজুর। আমি বহি। তারবাদে মোছলাডা (মাছলা মাছায়েল) হুইন্না বাইত্তে যাই।
না আমারও এখনও ক্ষুধা লাগেনি।
তয় লন মজ্জিদের ভিতরেঐ বহি হুজুর। ভিতরডা ঠান্ডা।
চলুন।
দুইজন মানুষ আবার ঢুকেছে মসজিদে। খোলা দরজা বরাবর বসেছে। বসেই নিমীলিত চোখে, পরিষ্কার মায়াবী গলায় মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বলতে শুরু করেছেন মোসলমানি বা সুন্নতে খত্নার কথা। আল হোরায়রা রাদিআল্লাহুআনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসাল্লাম বয়ান করিয়াছিলেন, আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম নিজহস্তে নিজের খত্না করিয়াছিলেন। তখন তাহার বয়স আশি বৎসর। খৎনা করিলেন নিজহস্তের কুঠারের সাহায্যে।
এইটুকু শুনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল সোনামিয়া। আপনমনে ফিসফিস করে বলল, সোবানাল্লাহ, সোবানাল্লাহ।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তা খেয়াল করলেন না। আগের মতনই বলতে লাগলেন, হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লামের পূর্বে খনা করিবার নিয়ম ছিল না। সর্বপ্রথম তিনিই খনা করিবার জন্য পরোয়ারদিগারের আদিষ্ট হন। যখন আল্লাহপাকের এই আদেশ তিনি উপলব্ধি করিলেন তখন তাঁহার বয়স আশি বৎসর। তিনি আল্লাহপাকের আদেশ পালনে এতই অনুগত ও উদগ্রীব রহিয়াছিলেন যে আশি বৎসর বয়সেই খত্নার মতো কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক কর্তব্য অতি তৎপরতার সঙ্গে সম্পন্ন করিলেন। আল্লাহপাকের আদেশ প্রাপ্তির সময় তাহার কাছে কাঠ কাটিবার একখানা কুঠার ছিল। অন্য কোনও অস্ত্র ছিল না। আল্লাহপাকের আদেশ পালনে বিলম্ব হবে এই আশঙ্কায় তিনি তৎক্ষণাৎ কুঠারের সাহায্যেই নিজের হাতে নিজের খত্নকার্য সম্পন্ন করিয়াছিলেন।
সোনামিয়া আবার বলল, সোবানাল্লাহ, সোবানাল্লাহ।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে আরও অনেক কথা আপনাকে আমি বলব বাবা। আস্তে আস্তে বলব। তার কাছ থেকে ইসলাম ধর্ম বহু কিছু পেয়েছে।
আইচ্ছা হুজুর, আইচ্ছা কইয়েন।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তা হলে আপাতত…
তার কথা শেষ হবার আগেই যতটা দ্রুত সম্ভব উঠে দাঁড়াল সোনামিয়া। বিনীত গলায় বলল, জি হুজুর, জি। আপনে খাওয়াদাওয়া করেন। আমিও বাইত্তে যাই।
