ক্যা?
পুলিশ দারগারা জানে রানাইদ্যায় আমগো বংশের মানুষ বেশি। পাগলনিরে আমরা ঐ গেরামে হামলাইয়া রাকছি।
হ ঠিক কইছচ বাজান। তয় সুবইদ্দা (সুভাই) লইয়া যা। শইপ্পার (শফির) হৌর বাইত্তে থুইয়া আয়।
শইপ্পা অরে রাকতে রাজি অইবো না।
ক্যা?
ও থাকে ঘরজামাই। হেই বাইত্তে নিজের বইনরে নিয়া রাখবো কেমতে?
হ কথা ঠিক। তয় কি কুগইট্টা রাইক্কাবি? অজুফার জামাই বাইত্তে?
আবদুল অসহায় গলায় বলল, এই বইসা পাগল মাইয়া কেঐ কাঐর বাইত্তে রাকতে চাইবো, কও। আমরা অইলে চাইতাম?
না চাইতাম না। তয় শইপ্পা তর ভাই, অজুফা তর বইন। পাগলনি অউক আর যাই অউক, বিপদে পড়া বইনরে অরা জাগা দিবো না?
মা দিবো না। তোমার ওই দুইডা পোলা মাইয়া বহুত স্বার্থবাজ। নিজেরডা ছাড়া কিচ্ছু বোজে না।
মা কেঁদে ফেলল। তয় কি আমার মাইয়াডা বাঁচবো না? জেল ফাঁসিতে যাইবো?
একথায় আবদুলেরও চোখ ভরে পানি এল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি সামলাতে লাগল সে। তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, ওমা, আমরা যে মতো চিন্তা করতাছি পাগলনিরে লইয়া, আমরা যুদি কোনও ব্যবস্থা করিও, কোনওহানে অরে পাড়াইতে চাই, ও তো যাইবো না। চিইইর বাইকইর পাইড়া বেবাক আন্ধার কইরা হালাইবো।
মা হাহাকার করে উঠল। না বাজান না, তছি অমুন করবো না।
কেমতে বোজলা?
ও ভাল অইয়া গেছে বাজান, একদোম ভাল অইয়া গেছে।
এই অবস্থায়ও আবদুল খুবই অবাক হল। কী কইলা? ভাল অইয়া গেছে? হ বাজান। ও অহন আর পাগল না। এর মইদ্যে একদিন, বানেছার যেদিন মাইয়া অইলো, হেদিন আমার লগে বহুত কথা কইলো। এতো ভাল কথা কোনও পাগলে কয় না বাজান। ও একদোম ভাল অইয়া গেছে।
আবদুল কাতর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। না মা, তুমি বোজো নাই। ভাল ও অয় নাই। এইডা অর আরেক রকমের পাগলামি। যুদি ভাল অইতো তয় এমতে ও থাকতো না। দিনরে রাইত কইরা, রাইতরে দিন, নাইড়া মাথা, কেঁতার তল, না মা, এইডা ভালর লক্ষণ না। এইডা আরও বড় পাগলামি। মানুষ খুন কইরা ও বদ্ধপাগল হইয়া গেছে।
হ ঠিক কথাই কইছচ। আসলে এইডা আরও বড় পাগলামি।
একটু থেমে হাহাকারের গলায় তছির মা বলল, আহা রে, আহা। কী পোড়া কপাল মাইয়াডার আমার। জন্ম থিকা পাগল। যুদি পাগল না অইয়া ভাল অইতো তয় অজুফার লাহান অরও বিয়াশাদি অইতো, জামাই সংসার পোলাপান অইতো। জীবনডা মাইনষের জীবন অইতো। হেইডা তো অইলোঐ না, মইদ্যে থিকা ও অইলো খুনি। মানুষ খুন করলো। জীবন যেমতে কাটতে ছিল কাটতো, অহন যে যাইবো জেল ফাঁসিতে! গলায় ফাসের দড়ি লইয়া যে মরবো! আহা রে আহা, আল্লা মাবুদে ক্যান অর জীবনডা এমুন করলো? জন্ম থিকা যে পাগল হে তো কোনও গুনা করতে পারে না। তয় অরে জীবনডা ভর এমুন শাস্তি আল্লায় ক্যান দিলো? কোন গুনার শাস্তি এইডা?
মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
মায়ের পাশে বসা আবদুলও তখন নিঃশব্দে কাঁদছিল।
.
শোয়াব উল ঈমান নামক বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থে কাবাগৃহের আদি ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। সেই গ্রন্থে বলা হইয়াছে, হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম ও বিবি হাওয়া যখন বেহেশত থেকে দুনিয়ায় নির্বাসিত হইলেন, তখন আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম সারণদ্বীপে, অনেকের মতে বর্তমানে যাহা লঙ্কা, শ্রীলঙ্কা আর বিবি হাওয়া আরব দেশে পতিত হইলেন। প্রায় একশত বৎসর উভয়ে এইভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকিলেন। অতঃপর, অনেক সাধনার পর হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম আরব দেশে আসিয়া বিবি হাওয়ার সহিত মিলিত হইলেন। তখন হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম কৃতজ্ঞতাভরে আল্লাহতায়ালার সমীপে প্রার্থনা করিলেন, হে আল্লাহ, পাকপরোয়ারদিগার! বেহেশতে অবস্থান কালে বায়তুল মামুর নামক যে মসজিদে ফেরেশতাগণের সহিত আমি নিত্য তোমার ইবাদত করিতাম সেই রকম একটি মসজিদ তুমি আমাকে দান করো, যাহাতে দুনিয়াতেও আমরা তোমার গুণগান। করিতে পারি। আদম আলাইহেওয়াসাল্লামের এই প্রার্থনা আল্লাহপাক কবুল করিলেন। তখন সেই বেহেশতি বায়তুল মামুরের একটি প্রতিকৃতি দুনিয়াতে নামিয়া আসিল। হজরত আদম সন্তুষ্টচিত্তে সেইখানে ইবাদত বন্দেগি করিতে লাগিলেন। ইহাই হইতেছে কাবাগৃহ। একটি বেহেশতি ঝরনাও সেইখানে প্রবাহিত হইতে থাকে। সেই ঝরনাই পবিত্র জমজম।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনামিয়া ফিসফিস করে বলল, সোবহানাল্লাহ, সোবহানাল্লাহ।
জুমার নামাজের অনেক আগেই আজ খাইগো বাড়ির মসজিদে চলে আসছে সোনামিয়া। অনেকদিন ধরেই মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের মুরিদ হয়েছে সে। যখন তখন হুজুরের এখানে এসে বসে থাকে। হুজুরের কথা শোনে। ধর্মের কত কিছু যে জানেন হুজুর। যে-কোনও বিষয়ে প্রশ্ন করলে কোরান হাদীস থেকে বয়ান করে যান। কথা বলার ভঙ্গিটা কী সুন্দর! শুনলে শুধু শুনতেই ইচ্ছা করে।
আজ মসজিদে এসে সোনামিয়া দেখে তখনও নামাজিরা কেউ আসেনি। হুজুর একাকী চুপচাপ বসে আছেন মসজিদের বারান্দায়। যেন গভীর করে ভাবছেন কিছু। সোনামিয়াকে দেখে মৃদু হাসলেন। আসেন বাবা, আসেন।
তারপর কথায় কথায় সোনামিয়া জানতে চেয়েছিল দুনিয়ার প্রথম মসজিদের কথা। হুজুর এতক্ষণ ধরে সে-কথাই বলছিলেন। হয়তো আরও অনেক কথাই বলতেন, তার আগেই আজানের সময় হয়ে গেছে। নামাজিরা আসতে শুরু করেছে।
