এই যন্ত্রণার কারণ কি সে আবদুলকে বলবে?
কিন্তু তছি যদি কোনওমতে টের পায় বা জানতে পারে যে মা তার বড়ছেলেকে কথাটা বলে দিয়েছে তা হলে আর রক্ষা নাই। কাঁথার তলা থেকে দুইহাত বের করে গলা টিপে ধরবে মায়ের, মায়ের দশাও করবে রুস্তম রিকশাআলার মতো।
তবু কথাটা আবদুলকে বলা উচিত। এমনভাবে বলবে, এত সাবধানে যেন সে আর আবদুল ছাড়া দুনিয়ার আর কেউ জানতে না পারে। ছেলেকে সব খুলে বলতে পারলে মায়ের বুক কিছুটা হলেও হালকা হবে। কিছুটা হলেও বেঁচে যাবে মা।
তছির মা তারপর আবদুলের মতোই ফিসফিস করে বলল, তর লগে আমার একহান কথা আছে। এহেনে কওন যাইবো না। কেঐ য্যান না হোনে এমুন কইরা কওন লাগবো। কোনও নিটাল জাগায় ল।
নিটাল জাগা অহন বাড়ির সবহানে। তোমগো বউ পোলাপান লইয়া ঘরে হুইয়া রইছে। যেহেনে ইচ্ছা বইয়া কথা কইতে পারো।
তছির মা আগের মতোই ফিসফিস করে বলল, তয় যেই মিহি ইচ্ছা ল। এই ঘরের সামনে কওন যাইবো না। কোনওভাবে যুদি পাগলনির কানে যায় তয় সব্বনাশ অইয়া যাইবো। অর হাত থিকা আমারে বাঁচাইতে পারবি না।
মায়ের কথা শুনে আবদুল চিন্তিত হল। কও কী?
হ।
ছেলের হাত ধরে অনেকটা যেন জোর করেই তাকে নিয়ে বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে চলে এল তছির মা। এদিকটায় বিশাল দুইখানা বড়ইগাছ। বড়ইতলাটা ঝকঝকা তকতকা। বাড়ির পোলাপান খেলা করে বলে আবদুলের বউ যত্ন করে ঝাট দিয়ে রাখে। বড়ইতলার একপাশে কিছু খড়নাড়া কিছু শুকনা ধইনচা (ধনচে) পড়ে আছে। অর্ধেকটা গাছের ছায়ায় অর্ধেকটা রোদে। খড়নাড়ার উপর ছায়ার দিকটায় গিয়ে বসল মা-ছেলে। বসেই উল্কণ্ঠিত গলায় আবদুল বলল, কী অইছে মা?
ছেলের কাছে কথাটা বলার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় যে চাপা উত্তেজনা মায়ের মনে ছিল, এতক্ষণে সেই ভাব সে চাপা দিয়েছে। এখন ধীর গম্ভীর গলায় বলল, তয় তুই আর আমি ছাড়া কথাটা অন্য কেঐ জানলে, বাজানরে, সব্বনাশ অইয়া যাইবো।
আবদুল অধৈর্যের গলায় বলল, কী অইছে হেইডা কও। আসল কথা না কইয়া এত প্যাচাইল পারতাছো ক্যা?
তর বইনে এক বেডারে মাইরা হালাইছে।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না আবদুল। বলল, কী? কী করছে?
খুন করছে এক বেড়ারে, খুন।
আবদুলের বুকটা হিম হয়ে গেল। চোত মাসের বিকালের দিককার গরমেও কেমন শীত করে উঠল তার। গলা শুকিয়ে এল। ঢোক গিলে কোনওরকমে বলল, কী কইলা? খুন। করছে? আমার বইনে মানুষ খুন করছে?
হ।
কারে, কারে খুন করছে?
কথাটা তুই হোনছচ। ওই যে দুই-আড়াই মাস আগে একদিন ছিন্নগর থিকা আইয়া আমারে কইলি, রোস্তম নামের এক রিকশাআলার লাচ পাওয়া গেছে একহান ছাড়াবাড়ির লগের খালে….।
মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই আবদুল উত্তেজিত গলায় বলল, হ। বেড়ার গলায় গামছার ফাঁস আছিলো।
হ ওই খুনডা তর বইনে করছে।
কও কী তুমি?
হ। সত্য। পাগলনি আমারে বেবাক কইছে।
রোস্তম রিশকাআলারে ও পাইলো কই? অতদূর গেছিলো কেমতে?
রিশকাডা লইয়াইছিল এনামুল। পাগলনিরে দশহান টেকাও দিছিল। পাগলনি চাইছিল মুরলিভাজা খাইতে। মুরলি খাওনের লোভ দেহাইয়া কুমতলবে রোস্তম অরে রিশকায় উডাইছিল….।
এবারও মায়ের কথা শেষ করতে দিল না আবদুল। ধরা গলায় বলল, বুজছি বুজছি। আর কওন লাগবো না। কেমতে কী হইছে আমি অহন পানির লাহান বোজতাছি।
যেন নিজের কাছে নিজে বলছে এমন গলায় আবদুল বলল, হায় হায় অহন কী অইবো? থানার পুলিশ দারগারা তো বেবাক খোঁজখবর লইয়া হালাইবো, কেমতে কী অইছে, কে খুন করছে বেবাক বিচড়াইয়া বাইর কইরা হালাইবো। ধরা পড়লে পাগলনির তো ফাঁসি অইবো।
হ এই চিন্তায়ঐত্তো মইরা যাইতাছি আমি।
শিশুর মতো অস্থির গলায় আবদুল বলল, ওমা, হেদিন থিকাঐ পাগলনি এই ভেক ধরছে? নাইড়া অইয়া গেছে, হারাদিন কেঁতার তলে পইড়া থাকে, ঘুমায়। ঘর থিকা বাইর অয় না। খায়ও না। রাইত্রে উইট্টা চুপ্পে চুপ্পে বেবাক কাম করে। নায় পোয়, দিন রাইত্রের ভাত তুমি রাইক্কা দেও হেই ভাতপানি খায়!
হ।
তয় এমুন কইরা ও বাঁচতে পারবো?
কেমতে কমু বাজান?
দুইদিন আগে আর পরে পুলিশ দারোগারা বিচড়াইয়া বাইর করবোঐ ওদিন রিশকা লইয়া কোন গেরামে আইছিলো রোস্তম। কারে নামাইয়া কারে উডাইছিলো রিশকায়। কেমতে কী অইছে বেবাক বাইর কইরা হালাইবো।
হ আমিও এই ডর ডরাইতাছি।
একটু থেমে বলল, তয় এতডি দিন অইয়া গেল অহনতরি তো কিছু অইলো না বাজান। পুলিশ দারগারা ভুইল্লা যায় নাই তো ঘটনা?
আরে না। পাগল অইছো তুমি। খুনের মামলা পুলিশ দারগারা কোনওদিন ভোলে না। বারো বচ্ছর পর অইলেও বিচড়াইয়া ঠিকঐ বাইর করবো।
এবার তছির মা একেবারে ভেঙে পড়ল। তয় অর বাচন নাই বাজান? পুলিশ দারগার হাত থিকা, ফাঁসির দড়ি থিকা অর বাঁচন নাই?
আবদুল ভাঙাচোরা গলায় বলল, আল্লাহ ছাড়া কেঐ কইতে পারবো না। অরে অহন বাঁচানের মালিক আল্লায়।
নাকি অরে বাইত থিকা কোনওহানে সরায় দিবি বাজান? অন্য কোনওহানে গিয়া পলাই থাকুক।
কই সরাই দিবা? কই পলাই থাকবো?
তগ জ্ঞাতিগুষ্ঠির কাছে। রানাইদ্যা।
না, জ্ঞাতিগুষ্ঠিরা নানান পদের চিন্তা ভাবনা করবো। কীর লেইগা পাগলনিরে আমরা ওই গেরামে পাইছি এই হগল লইয়া প্যাচাইল পোচাইল পাইড়া আরও ভেজাল লাগাই দিব। আর পুলিশ দারগারা আইয়া যুদি অরে বাইত্তে বিচড়াইয়া না পায় তয় পয়লাঐ যাইবো রানাইদ্যা।
