মান্নান মাওলানা নামাজ পড়তে বসলেন। চকের কয়েকটা খেতে কলুই (মটর) বোনা হয়েছে, সরিষা বোনা হয়েছে, কোনও কোনও খেত ফাঁকা, আগাছা পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে শস্য দেওয়ার জন্য। কোনও কোনওটায় গজিয়েছে গাঢ় সবুজ দূর্বাঘাস। এরকম এক দূর্বাঘাসের জমিতে নামাজ পড়তে বসেছেন তিনি। হু হু করে বইছে উত্তরের হাওয়া। হাওয়ায় শীত শীত ভাব। তবে হেমন্তের রোদ কম তেজাল না, রোদে বসে নামাজ পড়ছেন বলে শীতভাব টের পেলেন না মান্নান মাওলানা। মোনাজাত শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে পড়ল মেন্দাবাড়ির বড়সারেঙের বড়মেয়ের বড়ছেলে এনামুল ঢাকার টাউনে থান কাপড়ের ব্যবসা করে, কন্ট্রাক্টরি করে অঢেল টাকা পয়সার মালিক হয়েছে। ধর্মপ্রাণ নরম স্বভাবের যুবক। মান্নান মাওলানা কয়েকবার তাকে দেখেছেন। বিধবা খালা দেলোয়ারা থাকে বাড়িতে। তাকে দেখতে আসে। খালার জন্য বেদম টান। এনামুলের। খালার কথায় ওঠে বসে।
আছরের নামাজ শেষ করার পর মান্নান মাওলানার আজ মনে হল দেলোয়ারার কাছে গেলে কেমন হয়! তাকে যদি বলা যায়, বাড়ির লগে একখান ছাড়াবাড়ি পইড়া রইছে তোমগো, কোনও ভাই বেরাদর নাই, দুই বইন তোমরা, বড় বইন থাকে টাউনে তুমি থাক দ্যাশে, বইনপোর (বোনের ছেলে) এতবড় অবস্থা, তারে কও ছাড়া বাইত্তে একখান মজজিদ (মসজিদ) কইরা দিতে। আল্লার কাম তো অইবোঐ, দ্যাশ গেরামে নামও অইব। ইমাম লইয়া চিন্তা করতে অইবো না, আমি ইমামতি করুম। টেকা পয়সা বেশি লাগবে না।
এসব কথা ভেবে মনের ভিতর বেশ একটা আনন্দ টের পেলেন মান্নান মাওলানা। দ্রুত হেঁটে মেন্দাবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিজেকে যেভাবে পরিপাটি করার করলেন, সব শেষে পানজাবির পকেট থেকে বের করলেন গোলাপি রঙের ছোট্ট একখানা চিরুনি। চিরুনির দাঁতের ফাঁকে কালো তেলতেলে ময়লা জমে পুর (পুরু) হয়ে আছে। এক হাতে ফরফর করে চিরুনি পরিষ্কার করলেন তারপর মন দিয়ে দাঁড়ি আঁচড়াতে লাগলেন।
১.১৬-২০ মান্নান মাওলানা
১.১৬
হঠাৎ করেই মান্নান মাওলানাকে দেখতে পেল নূরজাহান। দুই দিন পর ছাড়া পেয়ে পাগলের মতো ছুটছিল সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ভেবেছে সড়কে যাবে, দেখবে কত উঁচু হল সড়ক, কত দূর আগাল। তারপরই সেই চিন্তা বাতিল করে দিয়েছে। এক দুইদিনে এতবড় সড়ক উঁচু একটু হতে পারে, আগাবে আর কতটুকু! অল্প একটু যা আগায় খেয়াল করে না দেখলে বোঝা যায় না। তারচেয়ে সড়ক দেখতে যাওয়া উচিত কয়েকদিন পর পর, ওইভাবে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় কতটা আগালো।
মাঠ ভেঙে ছুটতে ছুটতে এই ভেবে আজ সড়কের দিকে যায়নি নূরজাহান। তার মনে পড়েছে মজনুর কথা। চারমাস হল মজনু চলে গেছে টাউনে। সেখানে খলিফাগিরি শিখছে। তিন চারদিন হল বাড়িতে আসছে। হয়তো দুই একদিনের মধ্যে আবার চলে যাবে। আজ হালদার বাড়িতেই যাবে সে, মজনুকে দেখে আসবে। চারমাসে কতটা বদলেছে মজনু, কেমন হয়েছে দেখতে।
টাউনে থাকলে চেহারা অন্যরকম হয়ে যায় মানুষের। মজনুর কেমন হয়েছে!
মেন্দাবাড়ির সামনে দিয়ে ছুটে যেতে যেতে মজনুর চেহারা কল্পনা করছিল নূরজাহান এজন্য মান্নান মাওলানাকে প্রথমে দেখতে পায়নি। দেখল একেবারে কাছাকাছি এসে, আথকা। দেখে চমকাল সে, নিজের অজান্তে থেমে গেল পা। তবে পলকের জন্য, তারপরই আবার ছুটতে যাবে, মান্নান মাওলানা গম্ভীর গলায় বললেন, ঐ ছেমড়ি, খাড়ো।
নূরজাহান দাঁড়াল, মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল।
দাঁড়ি আঁচড়ানো শেষ করে মান্নান মাওলানা তখন চিরুনি পরিষ্কার করছেন। সেই ফাঁকে নূরজাহানের চোখের দিকে তাকালেন। দউবরার মাইয়া না তুই?
দবিরকে কেউ দউবরা বললে রাগে গা জ্বলে যায় নূরজাহানের, সে যেই হোক। এখনও তেমন হল। মান্নান মাওলানার চোখের দিকে ভয়ে কখনও তাকায় না নূরজাহান। তাকালে বুকের ভিতর ভয়ার্ত অনুভূতি হয়। এখন আর তেমন হল না। চোখ তুলে মান্নান মাওলানার চোখের দিকে তাকাল। চাপা রাগি গলায় বলল, আমার বাপের নাম দউবরা না, দবির, দবির গাছি।
চিরুনি পকেটে রাখলেন মান্নান মাওলানা কিন্তু নূরজাহানের চোখ থেকে চোখ সরালেন না। গলা আরেকটু গম্ভীর করে বললেন, কচ কী!
ঠিকঐ কই। আমার বাপরে কোনওদিন দউবরা কইবেন না।
কইলে কী অইবো?
নূরজাহানের প্রায় মুখে এসে গিয়েছিল, কইলে দাঁড়ি টাইন্না ছিড়া হালামু। কী ভেবে কথাটা সে চেপে রাখল। তবে গলার ঝাঁঝ কমাল না, বলল, আমারে খাড়ঐতে কইলেন ক্যা?
আগের মতোই নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে মান্নান মাওলানা বললেন, কথার কাম আছে।
কী কথা?
এতবড় মাইয়া এত ফরফর কইরা ঘোরচ ক্যা? যেহেনে যাই ওহেনেঐ দেহি তরে।
দেকছেন কী অইছে? আমার ইচ্ছা আমি যাই।
আর যাইতে পারবি না।
লগে লগে ঠোঁট বাঁকাল নূরজাহান। তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, ইহ্ যাইতে পারবো না। আপনে আমার বাপ লাগেন যে আপনের কথা হোনন লাগবো?
নূরজাহানের কথায় রক্ত মাথায় লাফিয়ে উঠল মান্নান মাওলানার। রাগে দিশাহারা হয়ে গেলেন। চিৎকার করে বললেন, কচ কী, আরে কচ কী তুই! আমার মুখের উপরে এতবড় কথা! তরে তো আমি জবেহ কইরা ফালামু। তরে তো কেঐ বাচাইতে পারবো না। মজজিদের ইমাম অইলে অহনঐ সাল্লিশ (সালিশ) ডাকাইতাম আমি, ল্যাংটা কইরা তর পাছায় দোররা মারতাম। বেপরদা বেহাইইয়া মাইয়াছেইলা, মাওলানা ছাহেবের মুখে মুখে কথা কয়! খাড়ো মজজিদখান বানাইয়া লই, এই গেরামের বিচার সাল্লিশ বেবাক করুম আমি। শরিয়ত মোতাবেক করুম, তর লাহান মাইয়ারা বরকা (বোরখা) না ফিনদা বাইতথন বাইর অইতে পারবো না। চুদুরবুদুর (এদিক ওদিক, ইতরামো ফাজলামো অর্থে) করলে গদে (গর্তে) ভইরা একশো একহান পাথথর ফিক্কা (ছুঁড়ে) মারুম।
