বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, কাম নাই নামের। আপনে কন।
হ কই। হেয় কইলো, লন মেদিনমণ্ডল যাই। হেইডা হিন্দু বাবুগো গেরাম। দুই-চাইর ঘর মোসলমানও আছে। গেলে বাবুরা তালুক দিতে পারে, থাকখাওনের জাগাজমিন দিতে পারে। আমগো লাহান জুয়ান মর্দ মানুষগো বহুত দরকার তাগো। এই আমার পরদাদায় আইলো মেদিনমণ্ডল গেরামে। আহনের পর ঠিকঐ বাবুরা তাগো তালুক দিল, জাগা সম্পত্তি দিল। তালুক পাইয়া আউয়ালের পরদাদায় অইয়া গেল তালুকদর। আর আমার পরদাদারা পাইলো জাগাসম্পত্তি, বাড়িঘর। তালুক পাইলো না দেইক্কা তালুকদার অইতে পারলো না। কাউলিপাড়ার জমিদাররা মেন্দা কইছিলো মেন্দাঐ রইয়া গেল।
একটু থামল মোতালেব। তয় একহান কথা কইলাম দেলরা বুজি আর আমি দুইজনেঐ তরে ভুল কইছি। এই মেদিনমণ্ডল গেরাম ছাড়াও কইলাম আরেকহান মেন্দাবাড়ি আছে।
সত্যই?
হ।
কোন গেরামে?
ভাইগ্যাকূল। ওই যে কাদির মেন্দা, নৌকা মাথায় দিয়া চলতো, কুমইর আছড়াইয়া মারতো, হেয় কইলাম মেদিনমণ্ডল আহে নাই। ভাইগ্যাকূলেঐ রইয়া গেছিলো। এর লেইগা ওই গেরামে আরেকহান মেন্দাবাড়ি আছে। তয় আমগো লগে তাগো কোনও সমন্দ নাই। কে কোনহানে গেছে গা কে জানে! মেন্দা পরিচয়ও অহন আর অনেকের নাই। নামের লগে পদবিডা কেঐ আর লাগায় না। এই ধর আমার নাম। পুরা নাম অইলো আব্দুল মোতালেব মেন্দা। মেন্দা তো আমিঐ লাগাই না। নাম কই মোছাড়া। খালি আব্দুল মোতালেব।
পুকুরের কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। হঠাৎ করেই যেন মোতালেবের মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, ওই বাদলা, তর বলে মোসলমানি?
বাদলা মহা উৎসাহের গলায় বলল, হ।
কবে?
শুক্কুরবার বিয়ালে।
ঠিক আছে। মোসলমানির সমায় আমি কইলাম ধরুম তরে।
আইচ্ছা ধইরেন।
তর মা’রে কইয়া রাখিচ। আর ক্ষীর য্যান আমারে ইট্টু বেশি কইরা খাওয়ায়।
বাদলা আবার হাসল। আইচ্ছা কমু নে।
একটু থেমে বলল, ও মোতালেবকাকা, মোসলমানি করনের সমায় কেমুন লাগে? অনেক দুঃকু পাওয়া যায়?
আরে না বেডা। খালি একহান পিপড়ার কামোড়। তুই উদিসঐ পাবি না। তয় তর মা’রে কইচ আবদুলরে দিয়া করাইতে। হাজামবাড়ির মইদ্যে আবদুলের কামড়াঐ ভাল।
বাদলা আবার বলল, আইচ্ছা।
.
রোয়াইলতলার ছাপরাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল খুবই মোলায়েম গলায় তার মাকে ডাকতে লাগল। মা, ওমা মা।
দুপুরের ভাত খেয়ে মেয়ের পাশে একটু কাত হয়েছিল তছির মা। তছি কাঁথা মুড়া দিয়া শুয়ে আছে। তার পাশে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে শুয়েছিল মা। কখন ঘুমঘুম ভাব হয়েছে। উদিস পায়নি। আবদুলের ডাকে ভাবটা কাটল। ধীর শান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসতে বসতে বলল, কী রে বাজান, ডাক পারচ ক্যা?
ইট্টু বাইরে আহো। কথার কাম আছে।
কাঁথার তলায় তছি জেগে না ঘুমিয়ে বোঝা যায় না। তবে দিনেরবেলাটা সে কমবেশি ঘুমায়। জেগে থাকে সারাটা রাত।
তবে কারও গলার বা পায়ের শব্দ পেলে যে ঘুমঘোরেও চমকে ওঠে সে, ভেঙে যায় ঘুম, মা সেটা টের পায়। যদিও তছি নিজে কোনও শব্দ করে না, কথা বলে না, কাঁথার তলার অন্ধকার দুনিয়ায় লুকিয়ে থাকে, তবু মা টের পায়।
এখনও পেল।
আবদুলের ডাকে তার যেমন তন্দ্রা ভাঙছে, সে যেমন জেগে উঠছে, তছিও তেমনই জেগে উঠছে। ভাইর গলা চিনে আশ্বস্ত হয়েছে।
তছির মা ঝাঁপ সরিয়ে ঘর থেকে বেরুল। কী রে বাজান? কী অইছে?
বাইরে তখন বিকাল প্রায় হয়ে আসছে। তবু রোদের তেজ কমেনি। গাছপালা উঠান পালান আর ঘরের চাল রোদের তেজে ভাল রকমই পুড়ছিল।
মা’কে দেখে ভারী আনন্দের একখান হাসি হাসল আবদুল। একহান কাম আইছে।
এই কাম যে মুসলমানির মা তা বুঝে গেল। মুসলমানির কাজ পেলে এভাবেই বলে হাজামবাড়ির লোকে। অন্যান্য নানানপদের কাজ করে তারা বেঁচে থাকে ঠিকই কিন্তু মূল পেশার কাজ যখন হাতে আসে তখন চেহারায় খেলা করে অন্য রকমের ভাললাগা।
আবদুলের চেহারায় আজ তেমন ভাললাগা খেলা করছিল।
ছেলের মুখ দেখে মাও খুশি। বলল, ভাল, খুব ভাল। তয় কোন গেরামের কাম? কোন বাড়ির?
আমগো গেরামেরঐ। মেন্দাবাড়ির।
কোন মোবাড়ি?
ওই তো দেলরা আম্মাগো বাড়ি।
মা অবাক। ওই বাইত্তে মোসলমানি করানের পোলা কো?
আবদুল হাসল। আছে।
কেডা?
দেলরা আম্মাগো ঘরে থাকে রাবি আর মতলা, অগো পোলা বাদলা।
হ বুজছি। তয় কামডা কবে?
এইত্তো রাবি আইয়া কইয়া গেল। শুক্কুরবার বিয়ালে।
অরা টেকাপয়সা দিতে পারবো?
আমিও পয়লা এইডা চিন্তা করছি। রাবিরে কইলাম। হুইন্না কইলো হেইডা চিন্তা কইরেন না। অন্যহানে কাম কইরা যা পান আমার পোলার কামেও হেইডাঐ পাইবেন।
তয় মনে হয় দেলরা দিব টেকাডা।
আমারও মনে অয়। দেলরা আম্মায় দিলে আর কোনও চিন্তা নাই। কাম অওনের লগে লগেঐ টেকা হাতে পামু।
মায়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আবদুল বলল, পাগলনির খবর কী? রাইত ভইরা জাইগ্না থাকে, দিন ভইরা ঘুম, বাইত থিকা তো দূরের কথা আইজ দুই-আড়াইমাস ঘর থিকাঐ বাইর অয় না। এইডা কেমুন পাগলামি মা?
চোখ তুলে ছেলের মুখের দিকে তাকাল মা। খানিক তাকিয়ে থেকে ভাবল, কথাটা কি আবদুলকে সে বলবে! একা একা এই যন্ত্রণা সে আর বুকে চেপে রাখতে পারছে না। তছির সঙ্গে তার জীবন বদলে গেছে। তারও দিন গেছে রাত হয়ে, রাত হয়েছে দিন। হাত পা কান মাথা শরীর সব বাঁধা পড়ে আছে রোয়াইলতলার ঘরে। আবদুলের যে ছেলেটা, বারেক দিনরাত চব্বিশঘণ্টা দাদির কাছে সেই বারেকের দিকেও আগের মতো নজর দিতে পারছে না।
