মোতালেব নির্বিকার গলায় বলল, জিগা।
আপনেগ বাড়ির নাম মোবাড়ি ক্যা? মেন্দা জিনিসটা কী?
মুখ ঘুরিয়ে বাদলার দিকে তাকাল মোতালেব। হাসল। আথকা এইডা তর মনে অইলো। ক্যা?
আথকা মনে অয় নাই। বহুতদিন ধইরাঐ মনে অয়। গেরামে খালি তিনডা বাড়ি মেন্দাবাড়ি। আর কোনও মেন্দাবাড়ি নাই। দেলরা বুজির মোকে একদিন হুনছি পুরা বিক্রমপুরেও বলে আর কোনও মেন্দাবাড়ি নাই।
পুরা বিক্রমপুরে কী রে বেড়া, পুরা বাংলাদেশেও নাই।
কন কী?
হ। এই তিনবাড়ি ছাড়া মেন্দা পদবির কোনও মানুষও নাই কোনওহানে।
মায় একদিন কইছিল এইডা কেমুন পদবি? মেন্দা? মাইনষের পদবি অয় চদরি খা সৈয়দ বেপারি ফকির। আপনেগো মেন্দা অইলো ক্যা?
হুনবি?
হ কন।
আমগো পরদাদারা আছিলো কাউলিপাড়ার মানুষ।
কাউলিপাড়াডা কোনহানে?
ফরিদপুর জিলায়। সাবাসনগর, বিলাসপুর এই হগল গেরামে আছিলো আমগো তারা। কাউলিপাড়ার বাবুরা আছিল তহনকার জমিদার। আমগো পরদাদারা আছিলো বাবুগো প্রজা।
কাম আছিলো কী তাগো? কী করতো?
গিরস্তালি। গোরু পালতো। তয় বহুত সাহসী মানুষ আছিলো তারা। আর সাই (মহা) জুয়ান, পাজি। কেঐর কথা হোনতো না। বাবুগো ধানখেতে গোরু ছাইড়া দিতো। বাবুরা ডাকলেও যাইতো না।
কন কী?
হ। তয় খেতখোলা গোরু ছাড়া ম্যালা নৌকাও আছিলো তাগো। এই নৌকার লেইগাঐ পদবি আছিলো তহন বেপারি।
বাদলা অবাক হল। বেপারি?
হ বেড়া। আমরা আদতে আছিলাম বেপারি।
বাদলা হি হি করে হাসল। অইয়া গেলেন মেন্দা।
মোতালেবও হাসল। হ। হোন ঘটনাডা।
আইচ্ছা কন।
একবার আমগো এক পরদাদায় বিরাট বিরাট দুইহান চিতলমাছ ধরছে। ধইরা বাইত্তে লইয়াইছে। তার মায় চিতলমাছ দেইক্কা কইলো, এতবড় দুইডা মাছ দা আমরা কী করুম। একহান মাছ জমিদার বাবুরে দিয়ায়। মাছ লইয়া হেয় গেছে জমিদারবাড়ি। জমিদারে মাছ দেইক্কা বহুত খুশি। জিগাইছে এতবড় মাছ পালি কই? আমার লেইগা লইয়াইছচ কী মনে কইরা? মাছের আবার দাম দেওন লাগবোনি? এতবড় জুয়ান মর্দ মানুষ, এত সাহসী, এত জিদি, বাবুর কথা হুইন্না কোনও জব দিতে পারে না। খালি মিনমিন মিনমিন করে। ওই মিনমিনানি দেইক্কা বাবু কইলো, এইডা এমুন মিনমিনায় ক্যা? মেন্দা নি? ওই যে বাবু মেন্দা কইলো, তারপর থিকাঐ বেপারিরা অইয়া গেল মেন্দা। বুজলি?
বাদলা আবার হাসল। হ বুজছি। কিচ্ছাডা বহুত ভাল।
মোতালেব একটু রাগলো। কিচ্ছা না বেডা। সত্য ঘটনা।
আইচ্ছা ঠিক আছে।
ছেউল্লার বাড়ি ছাড়িয়ে ওরা ততক্ষণে বিলে নেমে গেছে। চারদিকে চৈত্রমাসের বাজখাই রোদ। এই রোদে বিলভরা ইরিধানের খেত গোড়ায় পানি নিয়ে ঝিমঝিম করছে। দূরে গোরস্থানের লগে পুকুরে ম্যালা লোকজন। কারও হাতে পো, কারও ঝকিজাল। এখনও পলোয় চাব দিতে শুরু করেনি কেঐ, খ্যাও দিতে শুরু করেনি ঝকিজাল। পুকুর জোড়া ঠাসা কচুরি। কচুরি তোলা শুরু হয়ে গেছে। কচুরি তোলা হয়ে গেলে পরিষ্কার পানিতে পলো নিয়ে নামবে লোকে, খ্যাও দিতে শুরু করবে ঝাঁকিজাল।
ওদিকে তাকিয়ে বাদলা উত্তেজিত হল। মোতালেবকাকা, বেবাকতে তো নাইম্মা গেছে। আমরা যাওনের আগেঐ বেবাক মাছ ধইরা হালাইবো।
এতদূর থেকেও আগেই ব্যাপারটা দেখে নিয়েছে মোতালেব। শান্ত গলায় বলল, আরে বেডা। খালি কচুরি উড়াইতাছে। আস্তে হাঁট। কচুরি উডাইন্না শেষ কইরা মাইনষে যহন পলো লইয়া জাল লইয়া নামবো তহন গিয়া আমরা পুকঐর পারে খাড়ামু। অহন গেলে কচুরি উড়ান লাগবো। কচুরি উডান বহুত কষ্টের কাম। মাইনষে উড়াইয়া সাফা করুক, আমি গিয়া পলো লইয়া নামুম। কোনও কষ্ট করুম না, মাছটি ধইরা লইয়ামু।
শুনে খুশি হল বাদলা। আপনে বহুত চালাক মানুষ মোতালেবকাকা।
আমার লগে থাক, তুইও চালাক অইয়া যাবি।
হ আছি তো আপনের লগে। চালাকও ইডু ইট্টু অইতাছি।
খানিক চুপচাপ হেঁটে বাদলা বলল, মেন্দাগো আর কোনও কিচ্ছা নাই?
মোতালেব আবার একটা ধমক দিল। তরে না কইলাম, কিচ্ছা না, সত্য ঘটনা।
হ কইছেন।
তয়?
মোক দিয়া আইয়া পড়ছে। কন আরও সত্য ঘটনা কন।
আমার পরদাদার নাম আছিলো কিয়ামুদ্দিন হাজি। তার ভাই আছিলো কাদির মেন্দা। এমুন জুয়ান আছিলো, এইরকম চইত মাইস্যা রইদ্রে নৌকা মাথায় দিয়া হাঁটতো।
কী? কী মাথায় দিয়া হাঁটতো?
নৌকা। ডিঙ্গিনৌকা, কোষানৌকা মাথলার লাহান মাথায় দিয়া হাঁটতো। সাবাসনগর বিলাসপুর এই হগল গ্রাম আছিলো পদ্মার পারে। পদ্মায় তহন ম্যালা কুমইর (কুমির) আছিল। একদিন গাঙ্গে নাইতে নামছে কাদির মেন্দা, তার পাও কামড় দিয়া ধরছে বিরাট এক কুমইরে। হেয় করছে কী, কুমইরডারে টাইন্না ছুডাইছে। তারবাদে পারে উড়াইয়া আছড়াইয়া আছড়াইয়া মারছে।
শুনে বাদলা হতভম্ব। কন কী, কুমইর আছড়াইয়া মারছে?
হ বেড়া। যেই মানুষ নাও মাথায় দিয়া হাঁটতো, হেয় একহান কুমইর আছড়াইয়া মারতে পারবো না?
হ পারনের তো কথা।
মোতালেব একটু চুপ করে রইল। কাঁধে ধরা পলো এক কাঁধ থেকে আরেক কাঁধে আনল। আইজ থিকা একশো সইত্তর বচ্ছর আগে ফরিদপুরের সাবাসনগর বিলাসপুর এই হগল গ্রাম পদ্মায় ভাইঙ্গা যায়। আমার পরদাদারা আছিল ছয় ভাই। ওই যে কইলাম, বহুত জুয়ান আছিলো তারা। তয় গাঙ্গের লগে তো জুয়ানকি চলে না। গাঙ্গের ভাঙ্গনে তারা গেল বাস্তুহারা অইয়া। বাড়িঘর জাগাজমিন বেবাক গেল পদ্মায়। ছয়ভাই বউ পোলাপান লইয়া নৌকায় কইরা পদ্মা পাড়ি দিল। ভাইগ্যাকূলে আইয়া নামলো। নাইম্মা তাগো এক জ্ঞাতি আউয়াল তালুকদারের পরদাদার লগে দেহা অইলো। আউয়াল তালুকদারের পরদাদার নামডা আমি ভুইল্লা গেছি।
