চাচি তো তরেঐ দিছে।
হ। তয় মরণের আগেও আমাবইশ্যায় পুন্নিমায় বাতের বেদনাডা উটতো মা’র। রাইতভইরা বেদনায় কষ্ট পাইতো মায়, কেফিনের দুয়ার আটকাইয়া বউর লগে হুইয়া ঘুমাইতাম আমি। খাটালে যে মায় বাতের বেদনায় কোঁকায়, উদিসও পাইতাম না।
এইডাও কইলাম স্বার্থের কারণে।
হ। অহন তো মা’র পাও টিপ্পা আমার কোনও লাভ নাই। মা’র ভাগের জমিন তো আমি পাইয়াঐ গেছি। বউ পোলাপান সংসার বেবাকঐ পাইয়া গেছি। আর মায় মরণেও আমার লাভ অইছে। ধরণীর কাম কইরা কইরা বারো তেরেশো টেকা জমাইছিলো মায়, হেই টেকাডি অহন আমার।
আজিজ হাহাকারের গলায় বলল, স্বার্থ স্বার্থ। মাইয়াডা হওনের দিন চাচিরে পাঁচহান টেকা দিছিলাম। নেয় নাই দেইক্কা বহুত খুশি হইলাম আমি। যাউক পাঁচহান টেকা তো বাঁচলো!
মাঠের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তোতার দিকে তাকাল আজিজ। তোতা রে, আমি ম্যালা ডাঙ্গর অওনের পর আমার বাপে মরছে। আমি একহান মাত্র পোলা, তাও বাবায় আমারে দুই চোকে দেখতে পারতো না। গিরস্তালির কামে খেতে লইয়া যাইতো, গোরু রাকতে বিলে পাডাইতো, কোনও কামঐ আমি ঠিক লাহান করতাম না। এই মিহি ওই মিহি যাইতাম গা। এর লেইগা বাবায় আমারে মারতে চাইতো। তয় কোনওদিন মারতে। পারে নাই, বোজছচ।
ক্যা?
মায় মারতে দেয় নাই। বাবায় থাই থাপড় উডাইলেঐ পাগলের লাহান দৌড়াইয়া আইতো মায়। আমারে সরাইয়া দিয়া খাড়ইতো বাবার সামনে। খবরদার আমার পোলার শইল্লে হাত উডাইবা না। পোলার দরদ তুমি কী বুজবা? গরভে রাকছি আমি। লাইল্লা। পাইল্লা ডাঙ্গর করছি আমি। তুমি কে আমার পোলার শইল্লে হাত উডানের? বাপ অইতে একমিনিট লাগে, মা অইতে লাগে দশমাস দশদিন। জন্মের পরও বুকের দুধ দিয়া, আদর। যত্ন দিয়া পোলাপান ডাঙ্গর করে মায়। বাপে করে কী! খালি খাওনদাওন জোগাড় করে। খাওনদাওন লইয়া বড়াই কইরো না। যেই পোলাপানের বাপ না থাকে মায়ঐ তাগো খাওয়াইয়া বাঁচাইয়া রাখে। আলার মা’য় রাকছে না তার পোলাপানরে! বাবায় থাইম্মা যাইতো। আমার শইল্লে আর হাত উডাইতো না।
একটু থামল আজিজ। বিয়াশাদি কইরা হেই মারে আমি কেমতে ভুইল্লা গেলাম! খাওন দাওন দিতাম না। পেডের দায়ে মায় কূটনামি করতো, চুরি চোট্টামি করতো, বেবাকঐ আমি হোনতাম। এককান দিয়া হোনতাম আরেককান দিয়া বাইর কইরা দিতাম। সব থিকা। বড় অন্যায় যেইডা করতাম, কহেক বচ্ছর ধইরা কাইজ্জাকিত্তন লাগলে মা’র শইল্লে হাত উডাইতো বানেছা। যেমতে অমতে মারতো আমার মা’রে। আমি দেইক্কাও দেকতাম না। বইয়া বইয়া বিড়ি খাইতাম। মাইর খাইয়া কানতে কানতে যেই মিহি ইচ্ছা যাইতো গা আমার মায়। আইজ মনে অইতাছে, বাপের মাইরের হাত থিকা যেই মায় আমারে হারাডা। জীবন বাঁচাইয়া রাকছে, আমার চোক্তের সামনে হেই মায়রে পিছাদাও পিডাইছে আমার। বউয়ে, আমি কোনওদিন আমার মা’রে বাঁচাইতে যাই না। যুদি মা’র পক্ষ লই তয় বউ বিগড়াইবো। সংসারে অশান্তি। স্বার্থ, হায় রে স্বার্থ।
কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা ভেঙে এল আজিজের। বুক ঠেলে উঠল বহুকাল। ধরে চেপে রাখা কান্না। রোদে ভেসে যাওয়া শস্যের চকমাঠের দিকে তাকিয়ে গভীর কষ্টের কান্নায় কাঁদতে কাঁদতে আজিজ বলল, মাগো মা, আমারে তুমি মাপ কইরা দিয়ো মা। তোমার এই মেউন্না পোলাডারে তুমি মাপ কইরা দিয়ো। আমি তোমার লেইগা কিছু করতে পারি নাই মা। আমারে তুমি মাপ কইরা দিয়ে।
আজিজের কান্না দেখে নিজের মায়ের জন্য নিঃশব্দে চোখ ভাসছিল তোতার।
.
কেমন কেমন করে যেন মোতালেবের লগে খাতির করে ফেলেছে বাদলা। সারাক্ষণই মোতালেবকাকা মোতালেবকাকা করছে আর তার পিছন পিছন ঘুরছে। কবুতর দেখছে, কবুতরদের খাবারও দিচ্ছে। কোনও কোনও সময় উঠানের কোণে, ঘরের ছনছায় ছেড়ে পেছড়ে বসে থাকা মোতালেবের আতুড় লুলা মেয়ে ময়নার সঙ্গেও কথাবার্তা বলছে। এর মধ্যে একদিন সকালবেলা মোতালেবের বউ মউলকা বানিয়েছিল, টিনের থালায় করে একসঙ্গে দুইখান মউলকা দিয়েছিল মোতালেবকে। বাদলা ছিল সামনে, একখান মউলকার। অর্ধেকটা ভেঙে বাদলাকে দিয়েছিল মোতালেব।
এরকম কাণ্ড যে ঘটতে পারে জানা ছিল না বাদলার। খুবই মগ্ধ হল সে। সেই মউলকা। খেতে খেতে মোতালেবের যেন আরও ভক্ত হয়ে গেল। মোতালেবের ফুটফরমাশ খেটে দিচ্ছে, মোতালেব যেখানে যাচ্ছে বাদলাও যাচ্ছে। আর সারাক্ষণ নানা রকমের কথা। বলছে।
এসব দেখে বাড়ির লোকজন তো অবাকই, বেশি অবাক রাবি আর মতলা। দেলোয়ারা তো একদিন হাসিমুখে রাবিকে বললেনই, কী রে রাবি, তর পোলায় দেহি মোতালেইব্বার ট্যান্ডল অইয়া গেছে।
রাবি লাজুক গলায় বলল, হ। দুইজনের বহুত খাতির।
ভালঐ অইছে। কাইজ্জাকিত্তনডা কমলো।
আজ দুপুরের মুখে লুঙ্গি কাছা মেরে মাজায় শক্ত করে গামছা বেঁধেছে মোতালেব। কাঁধে নিয়েছে পলো। নিয়ে বাদলাকে বলল, যাবি নিরে বাদলা?
বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, কই?
গোরস্থানের পুকরে যামু। ওই পুকুরে আইজ মানুষ নামবো। পলো চাবাইতে যামু। তুই যুদি ডুলা রাকচ তয় তরেও মাছের ভাগ দিমুনে।
বাদলা রাজি। লন কাকা।
তারপর ডুলা হাতে মোতালেবের পিছন পিছন চকে নেমেছে। আজকাল কথা বলার স্বভাব হয়েছে বাদলার। চকে নেমেই মোতালেবকে বলল, মোতালেবকাকা, একহান কথা জিগামু?
