তোতা ম্লান গলায় বলল, বুজছি।
আজিজ বলল, মান্নান মাওলানায় কইছিল চুন্নিবুড়ির জানাজা অইবো না। অর লাচ মড়কখোলায় হালাই দিয়াইতে ক, শিয়াল হকুনে খাইবো। তুই বিশ্বাস কর, হুইন্না আমি মনে মনে খুশি অইছিলাম। কেঐরে কইতে পারি নাই, আইজ তরে কইলাম। যদি অমতে হালায় দিয়াইতে পারতাম তয় তো দাফোন কাফোনের খরচাড়া আমার বাচতো। কাফোন। কিনতে গিয়া মোতালেইব্বাও কয়হান টেকা চুরি কইরা খাইতে পারতো না।
আজিজের কথা শুনে তোতা তখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আজিজের মুখের দিকে। এতকথা জীবনে কোনওদিন আজিজের সঙ্গে তার হয়নি। মেউন্না ধরনের মানুষটি যে এরকম করে ভাবে, এভাবে কথা বলে জানা ছিল না তোতার। আর কত সহজভাবে অকপটে নিজের ভাবনার কথা বলে যাচ্ছে! সত্যি, বহুকাল ধরে কাছ থেকে দেখা মানুষকেও আসলে দেখা যায় না। তার ভেতরটা কেমন, দেখা যায় না। মনের ভিতর কী আছে, বোঝা যায় না। কোনও কোনও সময় মানুষ নিজের অজান্তে মনের অনেকখানি খুলে বসে। আজিজও যেন আজ সেভাবেই বসেছে। আর তোতা নীরব দর্শক হয়ে দেখছে। তার মনের ভিতরটা।
আজিজ খুবই হিসাব করে বিড়ি খায়। দিনরাত মিলিয়ে কয়টা বিড়ি খাবে, কতক্ষণ পর পর খাবে সব তার হিসাব করা। কিন্তু এখন সেই হিসাবটা সে মানল না। লুঙ্গির কোচড় থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। তোতা বিড়ি খায় কি খায় না, তাকে জিজ্ঞাসা করা উচিত কি না, বিড়ি সাধা উচিত কি না ভাবল না, বিড়ি ধরিয়ে বড় করে টান দিয়ে নাকমুখ দিয়ে ধুমা। ছাড়ল। দুপুরবেলার হিজলতলা কুম্ভিপাতার বিড়ির গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গেল।
তোতা বিড়ি খায় না। তবে গন্ধটা তার ভাল লাগল।
বিড়ি টানতে টানতে আজিজ বলল, ধরণীচাচি বহুত ভাল মানুষ আছিল। এই পদের মানুষরে আল্লায় বহুত ভাল জানে। বেহস্ত নসিব এইপদের মাইনষেরেঐ আল্লায় করে।
তোতা বলল, কেমতে বোজলা?
বুজছি। বহুত ভাল কইরা বুজছি। একহান ঘটনায় আমি যেমতে চাচিরে বুজছি, দুইন্নাইর আর কেঐ তারে অমতে বোজে নাই। তরা তার পেডের পোলা অইয়াও বোজচ নাই।
কও তো ঘটনাটা।
যে মেয়েটি হয়ে মরল তার জন্মের দিন বানেছার আহুজ ঘরে ঢোকার আগে ধরণীচাচির সঙ্গে যা যা কথা আজিজের হয়েছিল সব তোতাকে সে খুলে বলল। সে কী চেয়েছিল, ধরণী চাচি কী বলেছিল সব বলল।
শুনে তোতা এতটাই অবাক হল, প্রথমে কোনও কথা বলতে পারল না। তারপর গভীর বিস্ময়ের গলায় বলল, কও কী?
আজিজ বলল, হ।
তুমি এমুন মানুষ?
কী করুম ক? বচ্ছর বচ্ছর পোলাপান অয়, না তর ভাবিছাবরে কিছু বুজাইতে পারি, না নিজে বুজি। রাইত্রে বউর লগে হুইলে বেউস অইয়া যাই। তহন আর পোলাপানের কথা মনে থাকে না। কয়দিন পর তর ভাবিছাবে যহন উকাল করতে শুরু করে তহন মনে মনে খালি ইসাব করি। ইসাবের খাতায় খালি যোগ বিয়োগ করি। আরেকজন আইতাছে, তারে খাওয়ামু কী? এর লেইগাঐ কথাডা চাচিরে কইছিলাম। মাইয়াডারে মাইরা হালাইতে চাইছিলাম। তয় আল্লায় কইলাম অনেক সময় মাইনষে যা চায় হেইডা করে। আমি মাইয়াডারে মাইরা হালাইতে চাইছিলাম, মারতে আমার অইলো না। আল্লায়ঐ অরে। উড়াইয়া নিলো।
তুমি বলে মাইয়াডার দাফোনও করো নাই?
না করি নাই। মা’র দাফোন করতে যেই পোলার বুক টনটনায় হে কেমতে ওডু মাইয়ার দাফোন করে? টেকা খরচের কাম কী?
এইডা লইয়া তো গেরামে কথা অইছে।
হ আমি হুনছি।
এর লেইগা মাওলানা হুজুরে বলে তোমারে ডাকাইবো?
কোন মাওলানা হুজুরে? খাইগো বাড়ির নাকি আতাহারের বাপে?
আতাহারের বাপে।
ডাকাইলে আর কী করুম? যামু। গালি দিলে গালি হুনুম। পায়ের খড়ম দিয়া পিডাইলে পিডাইবো।
বিড়িতে শেষটান দিল আজিজ, আগের মতোই ঘাসবনে ছুঁড়ে ফেলল। তয় তরে একহান কথা কই ভাই, এই জীবনডা এমুন আমি আর রাখুম না।
কী করবা?
বদলাইয়া হালামু।
কেমতে?
চাচি আমারে পথটা দেহাইয়া গেছে।
কী পথ?
হেইডা তরে আমি কমু না। তয় এইডা জাইন্না রাখিচ, এই আজিজ গাওয়াল আর কোনওদিন বাপ অইবো না। মনের মইদ্যে হামলাইয়া রাখা ইসাবের খাতাড়া ছিড়া হালাইবো।
তোতা আবার উদাস হয়েছে। মেলে দেওয়া পায়ের সামান্য দূর থেকে শুরু হওয়া রোদে ভেসে যাওয়া ধানিমাঠের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, তোমার কথা হুইন্না আবার মনে অইলো মা’র কথা। কী কষ্ট চাইরডা পোলাপান লইয়া এক সময় করছে। বাবায় কোনওদিন ফিরত আইলো না। একহান পয়সা নাই ঘরে। দুই-তিনকানি জমিন বর্গা দেওয়া। ধান যে পায়, বচ্ছর চলতে চায় না। ধরণীর কাম কইরা কইরা মায়। আমগো বাঁচাইয়া রাকছিলো। আশা করছিলো পোলারা বড় অইলে এই দুঃখের দিন শেষ অইবো। কাম কাইজ ব্যাবসা বাণিজ্য চাকরি বাকরি নাইলে গিরস্তালি কইরা পোলারা তারে খাওয়াইবো। কীয়ের কী! বড় অইয়া পোলারা যে যার লাহান নিজের ভাগের জমিন বেইচ্চা। গেল গা। মা’র লগে রইলাম খালি আমি। হেই আমিও বিয়ার পর মা’র মিহি আর ফিরা চাইলাম না। এক সংসারে থাইক্কাও বউ পোলাপান লইয়া ভিন্ন অইয়া গেলাম। মায় কুনসুম খায়, কই যায় কই থিকা আহে কিছু খবর রাখি না। পায়ে বাতের বেদনা আছিলো মা’র। ছোডকালে আমি যহন মাইয়াগো লাহান মা’র লগে লগে থাকতাম, বাতের বেদনা উটলেঐ মা’র পাও আমি টিপ্পা দিতাম। আইজ তোমার কথায় বোজলাম, ওই টিপনডাও আমি টিপতাম স্বার্থে। আপনা স্বার্থে। য্যান অন্য তিনপোলার থিকা মায় আমারে বেশি আদর। করে। য্যান মা’র ভাগের জমিনডু আমারে দিয়া দেয়।
