নিজের কাছেই নিজে বলছে এমন গলায় তোতা বলল, আমার পোলাডা থাকত মা’র কাছে। মরণ কারে কয় বোজে না পোলাডা। দিনভইরা দাদিরে বিচড়ায়। এই মিহি যায়। ওই মিহি যায়। দাদি গো, ও দাদি, দাদি বইল্লা ডাক পাড়ে। মনে করে দাদি মনে হয় কোনওহানে গেছে, কোনও বাইত্তে ধরণীর কামে গেছে। ওই কামে কোনও কোনও রাইত্রেও থাকন লাগে, পোলাডা মনে করে অমুন কামেঐ গেছে দাদি, ফিরত আইবো। কয়দিন অইয়া গেল আহে না দেইক্কা আইজ বিয়ান থিকা চিইক্কর পাড়তাছে। দাদি গো, ও দাদি আমারে থুইয়া তুমি কই গেলা গা? দাদি, ও দাদি, তোমারে ছাড়া আমার তো ঘুম আহে না। আমার তো খিদা লাগে না।
কথা বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেলল তোতা। আবার গামছায় চোখ মুছল।
আজিজ ততক্ষণে বিড়ি ধরিয়েছে। তোতার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে কি শুনছে না বোঝা যাচ্ছে না। তোতার মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়ি টানছে ঠিকই, কিন্তু চোখের ভিতর যেন এখনকার এই দৃশ্য নেই। চোখের ভিতর যেন খেলা করছে অন্যকিছু।
আজিজের এই উদাসীনতা খেয়াল করল না তোতা। আগের মতোই আপনমনে বলল, পোলাডার লেইগা বহুত খারাপ লাগতাছে। অরে থামাই কেমতে? কেমতে বুজাইয়া কই, বাজান রে, দাদি তো তর মইরা গেছে। ওই যে হেদিন দেকলি না, হাইজ্জাকালে তালগাছতলায় বইয়া রইছিলো, তুই ডাক পাড়লি, হোনে না, তারবাদে যহন হাত ধইরা টান দিলি, ধুরুম কইরা পড়লো মাডিতে, তহনঐ তর দাদি মইরা গেছে। তারবাদে দেকলি না নাওয়াইয়া ধোয়াইয়া, কাফোনের সাদা কাপড় ফিন্দাইয়া তারে গোরস্তানে নিয়া গোর দিয়া আইলাম। বাজান রে, গোর দেওনের পর কেঐ আর ফিরত আহে না। তর দাদিও ফিরত আইবো না বাজান। মনে রে বুজ দে। অহন থিকা হারাডা জীবন দাদিরে ছাইড়া তর থাকন লাগব। দাদির লগে এই জীবনে তর আর কোনওদিন দেহা অইবো না।
কথা বলতে বলতে আবার কাঁদে তোতা, আবার চোখ মোছে। পোলায় আমার এই হগল কথা বুজবো না। ভাতপানি খাওন ছাইড়া দিছে, রাইত্রে উইট্টা বইয়া থাকে। দাদিরে ডাক পাড়ে। দাদি গো, ও দাদি! এই পোলারে আমি কেমতে বাঁচামু?
তোতার কথা শুনে আজিজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতের বিড়ি শেষ হয়ে এসছিল, শেষটান দিয়ে ভার রাখা জায়গাটার ওদিকে ঘাসবনে ফেলে দিল। বলল, মানুষ বহুত স্বার্থপর রে ভাই। নিজের সুক সুবিদা ভালমন্দ ছাড়া আর কিছু বোজতে চায় না।
আচমকা এরকম কথা আজিজ কেন বলল বুঝতে পারল না তোতা। চোখ মুছে আজিজের দিকে তাকাল। আথকা এমুন কথাডা কীর লেইগা কইলা আইজ্জাদা? কথাডা বুজলাম না।
বুজাইয়া কইলে বুজবি।
তয় কও।
দেক, মাইট্টা তৈল খাইয়া আমার মায় মরলো, আমি তরে কইলাম আমার সেখান হইল দুইখান। মায়ও গেলো, মাইট্টা তেলও গেলো। সত্য কথাডা তরে কই, মায় মরছিলো মরছিল, মাইট্টাতেলহানি যুদি থাকতো, আমি মনে হয় খুশিঐ অইতাম। বড়ঘরের খামড়া বাঁচাইতে পারতাম। অহনও মাইট্টাতেল কিন্না আইন্না বাঁচামু ঠিকঐ, তয় কয়ডা টেকা আমার যাইবো। যেই মায় দশমাস দশদিন পেডে রাইক্কা, মতো কষ্ট কইরা জন্ম দিল, লাইল্লা পাইল্লা ডাঙ্গর করলো, বিয়াশাদি কইরা সংসার পোলাপান অওনের পর হেই মা’র মিহি আমরা আর ফিরা চাই না। মায় যেন পর অইয়া যায়, কান্দের বোজা অইয়া যায়। তিনওক্ত খাওনও তারে দিতে চাই না। খালি সংসার, খালি পোলাপানের কথা চিন্তা করি। বুজি না এমুন চিন্তা আমার মায়ও আমারে লইয়া একদিন করছে। আইজ আমার মা’র মিহি আমি যেমুন ফিরা চাই না, এমুন একদিন আইবো যহন আমার পোলাপানেও আমার মিহি চাইয়া দেকবো না। আমারেও ভাত দিবো না। আমার কাছে মা’র থিকা মাইট্টাতেলের দাম বেশি। তর কাছে তর মা’র থিকা অহন তর পোলার চিন্তা বেশি। মায় মরছে মরছে, তারে। লইয়া চিন্তা করতাছচ না, করতাছচ পোলাডারে লইয়া। পোলারে বাঁচাবি কেমতে। এর। লেইগাঐ কইলাম, মানুষ বহুত স্বার্থপর। নিজেরে ছাড়া কিছু ভাবে না।
আজিজের কথা শুনতে শুনতে তোতা একটু বিচলিত হল। ঠিক কথাই সে বলেছে। আসলে তো মা’র কথা ভাবছিল না তোতা, ভাবছিল নিজের ছেলেটির কথা। নিজের ছেলের ভালমন্দ কথার রেশ ধরে তার ভাবনা চলে গিয়েছিল মায়ের স্মৃতিতে। কান্নাটা তার ছেলের জন্য না মায়ের জন্য বুঝতে পারছিল না।
এখন আজিজের কথায় বুঝল।
তারপর ছনুবুড়িকে নিয়ে যেসব কথা মনে হয়েছিল তোতার সেসব কথা আজিজকে না বলে মনের ভিতর চেপে রাখার জন্য নিজের ওপর খুশি হল। আজিজকে ওসব কথা বললে। আজিজ নিশ্চয় খুব খারাপ ভাবে তাকেও কিছু কথা বলত। এখন যেভাবে বলল তাতে যে মায়ের ব্যাপারে আজিজের সঙ্গে তার আসলে কোনও ব্যবধান নাই সেটা পরিষ্কার।
আজিজ বলল, চিন্তা কইরা দেহিচ কথাডি আমি সত্য কইলাম না মিছা।
তোতা ধীর গলায় বলল, না সত্য কথা কইছো। খাঁটি কথা। সত্যঐ আমরা বহুত স্বার্থপর।
হোন, আমি তরে আমার মনের আরেকহান কথা আইজ কই। মা’র দাফোনকাফোনের লেইগা যেই খরচাডা অইছে, হেইডাও আমার করতে ইচ্ছা করে নাই। মনে মনে মা’র উপরে বিরক্ত অইছি। কী কাম আছিলো মরণের? না মরলে তো টেকাডি আমার খরচা হয়। না। মনের মইদ্যে খালি খচখচ খচখচ করছে। হিসাবের একহান খাতায় মনে মনে আমি খালি হিসাব কিতাব করছি। মা’র দাফোনকাফোনের টেকাডা আমি কবে রুজি করতে পারুম, কবে উডাইতে পারুম। তারবাদে আবার এইডাও বুজছি, যেই টেকা যায় হেই টেকা আর কোনওদিন ওডে না। পরে যেই টেকা তর হাতে আইবো, হেইডা তো তুই আগের টেকাড়া না গেলেও রুজি করতি! বোজছচ আমার কথা?
