.
দুপুরবেলা মামুদপটির ওদিক থেকে ফিরছিল আজিজ গাওয়াল।
কাঁধে তামা পিতল অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল লোটা বদনা কলসি ভরতি ভার। বেশ ওজনদার ভার। এমনিতে চোত মাসের প্রথম দিককার খাড়া রোদ, তার ওপর কাঁধে ওজনদার ভার, আজিজের দশা বেশ কাহিল। পথের ধারে ছায়াময় কোনও গাছপালা পেলে তার তলায় বসে খানিক জিরাবার মতলবে ছিল।
বহ্নিছাড়ার কাছাকাছি এসে ওরকম একটা জায়গা পেয়ে গেল।
বহ্নিছাড়ার পশ্চিম দিককার পুকুরের পশ্চিমপার দিয়ে চলে গেছে হালট। সেই হালটের পশ্চিমপাশে কানিখানেক জমির পর ঝাঁপড়ানো একটা হিজলগাছ। ভার কাঁধে হেলেদুলে সেই গাছটার কাছে এল আজিজ। এসে দেখে একজন মানুষ বসে আছে গাছতলায়। হিজলের গোড়ার দিকটায় ঢেলান দিয়ে পা দুইটা ঘাসের উপর মেলে দিয়ে বসে আছে মানুষটা। পরনে খয়েরি রঙের লুঙ্গি, মাজায় বান্দা গামছাটা এখন আর মাজায় নেই। ডান দিককার কাঁধে ফেলা। কিন্তু চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে মানুষটার। দুপুরের নির্জনতায় একাকী মাঠপারের হিজলতলায় বসে আকুল হয়ে কাঁদছে সে।
পলকেই মানুষটাকে চিনতে পারল আজিজ। পুরানবাড়ির তোতা। ধরণীচাচির সাইজ্জা পোলা।
তোতা এখানে এভাবে বসে কাঁদছে কেন?
গ্রামের লতাপাতা ধরে তোতার সঙ্গে আজিজের একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তোতার বাপ আজিজের বাপের দূর সম্পর্কের ভাই। সেই হিসাবে তোতাও আজিজের ভাই। ওই একই হিসাবে ধরণীচাচিকে চাচি ডাকত আজিজ। দিন কয়েক আগে মরল চাচি। যাকে দেখতে আজিজের বাড়িতে এসেছিল সে মরল বিয়ানরাতে।
তোতাকে দেখে এসব কথা মনে পড়ল আজিজের।
তোতা প্রথমে টের পায়নি ভার কাঁধে একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে হিজলতলায়। ভার যখন নামাতে গেছে আজিজ, চমকে তার দিকে তাকিয়েছে। তারপর যেন এরকম জায়গায় এভাবে বসে কান্নাটা তার ঠিক হয়নি, যেন ভারী একটা লজ্জার কাজ সে করে ফেলেছে এমন ভঙ্গিতে কাঁধের গামছা টেনে চোখ মুছল। গলা যতখানি সম্ভব স্বাভাবিক করে বলল, কই থিকা আইলা আইজ্জাদা?
তোতার পাশে বসল আজিজ। ক্লান্তির শ্বাস ফেলে বলল, গেছিলাম কান্দিপাড়া। কান্দিপাড়া থিকা কালিরখিলের ওইমিহি অইয়া আইছি মামুদপট্টি। গরমে এক্কেরে শেষ অইয়া গেছি। জিরানের লেইগা গাছতলায় আইছি। আইয়া দেহি তুই বইয়া রইছস? তুই এহেনে এমতে বইয়া রইছস ক্যা ভাই?
তোতা ধরা গলায় বলল, এমতে। এই খেতটা আমার। হিজলগাছটাও আমার খেতের মইদ্যে পড়ছে। আইছিলাম ধানের অবস্থা দেখতে। রইদ দেইখা গাছতলায় বইয়া রইছি।
তয় কানতাছিলি ক্যা?
তোতা বুঝল। তার কান্না দেখে ফেলেছে আজিজ। বলল, বোজ নাই কীর লেইগা কানতাছিলাম?
বুজুম না ক্যা, বুজছি। চাচির লেইগা।
হ। এহেনে আইয়া বহনের পর মা’র কথা বহুত মনে পড়ছিল। কুনসুম যে চকু বাইয়া পানি নামছে, উদিস পাই নাই।
আজিজ তারপর চিরকালীন সেই প্রবোধের কথাটা বলল, কাইন্দা আর কী করবি ভাই? যে গেছে সে তো আর ফিরত আইবো না। আর মা-বাপ কেঐর চিরকাল থাকে না। আমার মায়ও তো মরলো। কেমুন মরণডা মরলো ক! রাইতের বেলা তিয়াস লাগছিল, পানি মনে কইরা খাইল মাইট্টা তেল। বড়ঘরের একহান খামে উলু লাগছে, খামোয় দেওনের লেইগা। মাইট্টা তেল আইন্না রাকছিলাম, হেই তেল খাইয়া মরলো। লোসকান অইলো আমার দুইহান। মাইট্টাতেলও গেল, মায়ও গেল। খামড়ায় অহনতরি আর মাইট্টা তেল দেওয়া অয় নাই।
আজিজের কথা শুনে গা জ্বলে গেল তোতার। আশ্চর্য মানুষ! তেল খাইয়া মায় মরছে তাতে নাকি দুইটো লোকসান হইছে। তেল গেছে, মাও গেছে। পরের দিককার কথায়। বোঝা গেল মায়ের থেকে তেলটাই তার বেশি দরকার ছিল। মা মরছে মরছে, তেলটা না খেয়ে মরলেই পারত। ঘরের খামটা রক্ষা পেত আজিজের।
তোতার একবার ইচ্ছা হল এসব নিয়ে কিছু কথা আজিজকে সে শোনায়। তারপরই মনে হল, কী দরকার কটু কথা বলার! কথায় কথা বাড়বে। সে আজিজকে বললে আজিজও তাকে কিছু বলবে। নিজের সংসার হওয়ার পর ছনুবুড়ির দিকে আর কখনও ফিরে তাকায়নি আজিজ। সংসারে থেকেও ছনুবুড়ি হয়ে গিয়েছিল সংসারের বাইরের মানুষ। ছেলের সংসারে তিনওক্ত খাবার পেত না। তার ওপর বানেছার যা তা ব্যবহার। এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে, এর বদনাম ওকে ওর বদনাম তাকে, এই করে পেটের আহার জোটাত। যখন এইসব কায়দায়ও আহার জুটত না তখন করত চুরি। আজিজ জানত সব কিন্তু মা’কে নিয়ে ভাবত না।
তোতা কি ভাবত?
সেও কি একটু অন্য রকমভাবে আজিজের মতোই আচরণ করেনি তার মায়ের সঙ্গে। বিয়ের পর, সংসারে বউ পোলাপান আসার পর সেও কি আর ভেবেছে মায়ের কথা? তার বউ কি আজিজের বউয়ের মতন না হোক, একটু কম হলেও যা তা ব্যবহার তোতার মায়ের সঙ্গে করেনি?
এসব কথা কমবেশি গ্রামের সবাই জানে। সুতরাং আজিজকে ওসব নিয়ে কথা শোনাতে গেলে আজিজই বা তাকে ছাড়বে কেন?
মনে মনে ভাবা কথা মনে মনেই চেপে গেল তোতা। উদাস চোখে সামনের ধানখেতের দিকে তাকিয়ে রইল। মনের ভিতর বারবারই ভেসে উঠছিল মায়ের মুখ। জন্মের পর থেকে দেখে আসা মুখ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলাল। এক বয়সের মানুষ আরেক বয়সে যেন দুই
ভুবনের দুই বাসিন্দা। একই মানুষের চেহারায় এখন যেন দুইজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছে। তোতা। একজন সেই প্রথম জীবনের, স্বামী উধাও হয়ে যাওয়া, চার চারটা সন্তান নিয়ে দিশাহারা মা। আরেকজন ক’দিন আগের, বুকের কাছে গভীর মায়ায় যে জড়িয়ে রেখেছে। নাতির মুখ।
