এবার চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল কুট্টি। অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, যুদি এতডু বুইজা থাকেন তয় আপনেঐ কন মনডা আমার কীর লেইগা খারাপ।
আলফুও কুট্টির মতো করেই তাকিয়ে রইল কুট্টির দিকে। চোখে পলক না ফেলে ধীর শান্ত গলায় বলল, আমার লেইগা। আমার লেইগা তোমার মন খারাপ। দুইদিন আগে আমি। যে তোমারে কইছিলাম আমি ইট্টু দ্যাশে যাইতে চাই, মাসেকহানি বাইত্তে থাইক্কাহি, এই কথা হোননের পর থিকা তোমার মন খারাপ। তারপর থিকা আমার মিহি ভাল কইরা চাও না, আমার লগে কথা কও না। ভাত খাইতে দিয়া অন্যমিহি চাইয়া থাকো, আমার শইলের কথা জিগাও না। কপালে হাত দিয়া দেহ না আবার জ্বর আইলোনি?
গলায় কী ছিল আলফুর কে জানে, কুট্টির মনের ভিতরটা খানখান হয়ে গেল। বুক থেকে চোখের দিকে ঠেলে উঠতে চাইল অভিমানের কান্না। অতিকষ্টে কান্নাটা কুট্টি ধরে রাখল। মাথা নিচু করে বলল, আপনের লেইগা আমার মন খারাপ অইবো ক্যা? আপনে আমার কে?
তোমার এই কথার জব অহন আমি দিতে পারুম না। তয় দিমু একদিন, সমায় মতন দিমু।
জব দেওনের কিছু নাই। আমি জানি আমি আপনের কেউ না, আপনে আমার কেউ না।
কেউ না অইলে নিজের কথা তোমারে আমি কইছি ক্যা?
কুট্টি আবার চোখ তুলে তাকাল। কোন কথা কইছেন আমারে?
দ্যাশে যাওনের কথা! ওই কথা তো তোমারে না কইয়া বড়বুজানরেঐ কইতে পারতাম। বড়বুজানরে কইয়া তার পরদিনই যাইতাম গা। যাওনের সমায় তোমারে কইতাম, আসি গিয়া। তোমারে কওনের পর আইজ দুইদিন অইলো, গেলাম না ক্যা? বড়বুজানরেও যাওনের কথাডা কইলাম না ক্যা?
ক্যান যান নাই, ক্যান কন নাই?
আলফু আবার তাকাল কুট্টির দিকে। মায়াবী গলায় বলল, তোমার লেইগা।
কী?
হ। তোমার লেইগা যাই নাই, তোমার লেইগাঐ কথা কই নাই বড়বুজানের লগে।
ক্যা আমি আপনেরে যাইতে না করছি?
হ করছো।
কুট্টি অবাক হল। কুনসুম করলাম?
করছো।
কী কন আপনে? আমি তো কোনও কথা কই নাই।
অনেক সময় কথা না কইয়াও অনেক কথা কওন যায়। তুমি হেদিন না কইয়া কইছো আমি য্যান দ্যাশে না যাই।
কুট্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাইবেন না ক্যান? আমার লেইগা আপনে ক্যান এহেন বইয়া থাকবেন। আমি তো আপনের আপনা কেঐ না। দ্যাশে আপনের বউ পোলাপান আছে, মা বইন আছে, হেরা আপনের আসল আপনা। আপনা মাইনষের কাছে আপনে যাইবেন না ক্যা?
তুমিও আমার আপনা।
কেমতে?
এই বাইত্তে আমি ম্যালাদিন ধইরা কাম করি। তুমিও করো। দুইজন দুইজনরে চিনি বহুত বচ্ছর ধইরা, কেঐ কোনওদিন কেঐর আপনা আছিলাম না। আমার যহন মন চাইতো দ্যাশে যাইতাম গা। তোমারে জিগাইতামও না। তুমিও ফিরা চাই না আমি বাইত্তে আছি
গেছি গা। যে যারে লইয়া আছিলাম। তুমি তোমারে লইয়া, আমি আমারে লইয়া। যেই রাইত্রে আমার জ্বর আইলো, নিজের কথা না ভাইবা, মান ইজ্জতের ডর না ডরাইয়া দুয়ার খুইল্লা তুমি আমার কাছে আইলা, আমার কপালে হাত দিলা, তহন থিকা আমি জানি আমি তোমার কে, তুমি আমার কে?
ক্যা এর আগে জানেন নাই?
না। তয় ইট্টু ইট্টু বুজছিলাম।
কবে থিকা বোজছেন কন তো?
মাকুন্দারে লইয়া নিজের ভাত যেদিন চাউলতাতলায় বইয়া ভাগ কইরা খাইছিলাম।
ঠিক কইছেন। একদোম ঠিক। তয় আমারে কিছু বোজতে দেন নাই ক্যা?
তোমার কথা চিন্তা কইরাঐ তোমারে বোজতে দেই নাই।
কুট্টি আবার তাকাল আলফুর দিকে। কথাডা বুজলাম না।
আলফু বলল, আমি বিয়াতো মানুষ। তিনডা পোলাপান ডাঙ্গর অইয়া গেছে। তোমার থিকা বসে অনেক বড়। আমি তোমারে কী দিতে পারুম, কী করতে পারুম তোমার লেইগা?
আমি কিছু চাই না আপনের কাছে।
আলফু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কুট্টি বলল, আমারও তো বিয়া অইছিলো।
অইছিলো তয় সংসারের বন্ধন তো তোমার নাই। আমার আছে। এই হগল চিন্তা কইরা তোমার মিহি আউগ্নাই নাই আমি। তোমারে বোজতে দেই নাই তোমার মনে যা। আমার মনেও তা।
আলফুর কথা শুনতে শুনতে কখন যে মনের ভিতর চেপে বসা অভিমান কেটে গেছে কুট্টির, কখন যে মন হয়ে গেছে শরতকালের মেঘ সরে যাওয়া আকাশের মতো কুট্টি তা টের পায়নি। এখন মন জুড়ে আশ্চর্য এক ভাললাগা, আশ্চর্য এক অনুভব। এই ভাললাগা মনের মানুষকে হঠাৎ করে পাওয়ার জন্য, এই অনুভব মনের মানুষের সঙ্গে মন বিনিময়ের অনুভব।
আর আলফুর কথা শুনে কী যে মুগ্ধ কুট্টি, কী যে মুগ্ধ। এই মুগ্ধতা জীবনে প্রথম তার। দিনের পর দিন চুপচাপ থাকা মানুষটি তা হলে এইরকম! এত সুন্দর করে কথা বলে, এত সুন্দর করে বোঝে মনের মানুষকে! ইস এই মানুষকেই কিনা ভুল বুঝেছিল কুট্টি!
ততক্ষণে বিকাল একেবারেই ফুরিয়ে গেছে। গাছপালা ঝোঁপঝাড় ঘরদুয়ারের আনাচ কানাচ থেকে বেরিয়ে আসছিল অন্ধকার। নিজস্ব গাছপালায় ফিরছিল দিন শেষের পাখিরা। মাঠ থেকে মাঠে ছড়িয়ে যাচ্ছিল সন্ধ্যাবেলার হাওয়া আর পশ্চিম আকাশে পাকা কুমড়ার ফালির মতো উঠেছিল লক্ষ কোটিবার ওঠা পুরানা চাঁদ।
বড়ঘরের খাটাল থেকে বড়বুজান ডাকলেন, কুট্টি ওই কুট্টি, আন্দার অইয়া গেছে। কুপিবাত্তি আঙ্গা।
কুট্টি উঠে দাঁড়াল।
আলফু বলল, তয় দ্যাশে কইলাম আমি যাইতাছি না।
শুনে এই প্রথম সুন্দর করে হাসল কুট্টি। গভীর মমতার গলায় বলল, হাইজ্জাকালে বাইরে থাকনের কাম নাই। হাত পাও ধুইয়া তাড়াতাড়ি ঘরে আহেন।
সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত পায়ে খাটালের দিকে চলে গেল কুট্টি।
