নূরজাহান চুপ করে রইল।
পরি বলল, আমি পরে মাইনষের কাছে হুনছি মাকুন্দা কাকায় চুরি করে নাই, তারে চোর সাজাইয়া গেরাম থিকা বিদায় করনের লেইগা হুজুরে এই কামডা করছে।
হ, এইডাঐ আসল কথা। আর কামডা হেয় ক্যান করছে জানচ?
না। ক্যান?
তর দাদির লেইগা।
আমার দাদি কী করছে? হেয় তো মইরা গেছে।
মইরাঐত্তো ভেজালডা লাগাইছে। হুজুরে কইছিল তর দাদি চুন্নি আছিলো, চুন্নির জানাজা অইবো না। আর খাইগো বাড়ির মাওলানা সাবে তার জানাজা পড়াইছে। হুজুরের বাড়ির গোমস্তা অইয়া মাকুন্দা কাকায় আইছিল হেই জানাজা পড়তে। কাকার উপরে এইডা
অইলো হুজুরের আসল রাগ।
বুজছি।
মাকুন্দা কাকায় আমারে বেবাক কথা কইছে। জীবন ভইরা হুজুরের বাড়ির গোরুডি হেয় পালছে, এর লেইগা গোরুডির লেইগা আছিলো ম্যালা টান। শীতের রাইত্রে গোরুডিরে হেয় দেকতে গেছিলো। হেই ফাঁকে হুজুর আর তার পোলায় ধইরা ….।
কথা শেষ করল না নূরজাহান, চোখ মুখ অন্যরকম হয়ে গেল তার। বলল, যেই মাইর মাকুন্দা কাকারে অরা মারছিল, কাকার মোকহান দেইক্কা আমি আর কিছু সইজ্জ করতে পারি নাই। এর লেইগাঐ ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিলাম হুজুরের মোকে। মাইয়া না অইয়া আমি যুদি পোলা অইতাম, তয় যেই লাডি দিয়া হুজুরে আর তার পোলায় কাকারে পিডাইছিল হেই লাডি দিয়া অগো দুই বাপপুতেরে আমি ঠিক ওমতে পিডাইতাম।
কথাগুলি বলেই দিশাহারা হল নূরজাহান। চট করে এগিয়ে এসে পরির একটা হাত ধরল। ভয়ার্ত গলায় বলল, যাহ্ কথার তালে বেক কথা তরে কইয়া হালাইলাম। আল্লার কিরা লাগে তর, এই হগল কথা কেরে তুই কইচ না পরি। ক কেঐরে কবি না।
পরি দৃঢ় গলায় বলল, না কমু না।
আল্লার কিরা?
আল্লার কিরা।
এবার মুখ থেকে ভয়ার্ত ভাব উধাও হল নূরজাহানের। তবু পরির হাতটা সে ধরে রাখল।
পরি বলল, নূরজাহান বুজি, তোমার কথা হুইন্না আইজ আমি ছ্যাপ ছিডানের কারণ বোজলাম। অহন আমারে আসল কথাগুনির জব দেও।
ক।
আমি জানি, কুট্টি ফুবুও ওদিন কইছে, বিয়া অওনের পর মাইয়াগোপোলাপান অয়, তয় মায় যে কইছিল হুজুরের পোলায় তোমারে ধইরা লইয়া গিয়া আকাম কুকাম কইরা পেটপোট বাজাইয়া দিব, পোলাপান হওয়াই দিব, এইডা কেমতে অইবো? আকাম কুকাম জিনিসটা কী? পেট অয় কেমতে? পোলাপান অয় কেমতে?
নূরজাহান গম্ভীর গলায় বলল, অহনঐ এই হগল জাননের কাম নাই তর। আটু বড় হ, এমতেঐ জাইন্না যাবি। বেবাক মাইয়াঐ জানে।
না আমি অহনঐ জানুম। অহনঐ তুমি আমারে কইবা।
নূরজাহানকে ভয় দেখাল পরি। না কইলে কইলাম তুমি যে আমারে কিরা দিছ হেই কিরা আমি ভাইঙ্গা হালামু।
পরির ভঙ্গি দেখে হাসল নূরজাহান। তুই বহুত চালাক অইছচ রে পরি। আইচ্ছা কইতাছি। তয় তুই কইলাম এই হগল কথা আর কেঐরে কইচ না।
কারে কমু?
তর ভাই বইনগো।
আরে না।
আল্লার কিরা?
আল্লার কিরা।
নূরজাহান তারপর মেয়েমানুষ পুরুষমানুষের শরীর, বিয়া সন্তান জন্মের রহস্য যতটা সে জানে বোঝে ততটাই ফিসফিসা গলায় বুঝিয়ে বলল পরিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলি শুনল পরি, শুনে চিন্তিত গলায় বলল, তয় পুরুষপোলাগো তো আরাম বেশি। তাগো কাম একটাঐ, মাইয়া মাইনষের লগে হোওন। কষ্ট তো বেবাক মাইয়া মাইনষের। আমার মা’রে দেইক্কাও কষ্টটা আমি বুজছি। নয়-দশটা মাস এত বড় পেট লইয়া কষ্ট করে। তারবাদে আহুজ পড়নের দিন, যহন বেদনা ওড়ে, আহা রে কী কষ্ট। মা’য় বেদনায় মরে আর বাবায় বইয়া বইয়া উক্কা খায়।
নূরজাহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ বেডাগো সুবিদা অনেক। ধর আমি যুদি মাইয়া না অইয়া পোলা হইতাম, তয় হুজুরের মোকে ছ্যাপ দিতাম না, দিতাম পিডান। কাকারে যেমুন পিডাইছে অমুন পিডানহান দিতাম। তারবাদে বিচার সাল্লিশ যা অইতো অইতো। এমুন কইরা বাইত্তে তো পলায় থাকন লাগতো না আমার। মাইয়ামানুষ দেইখা পলাইয়া রইছি। কোনওহানে যাই না। আমারে লইয়া মা-বাপের যেই ডর আমারও হেই একঐ ডর। যুদি আতাহাররা আমারে ধইরা লইয়া যায়, জোর কইরা আকাম কুকাম করে! আর মাইয়া মাইনষের শইল এমুন, একবার ওইকাম হইয়া গেলে শইলডা গেল নষ্ট অইয়া। যত সোন্দরঐ হচ কেঐ তরে আর বিয়া করতে চাইবো না।
পরি চিন্তিত গলায় বলল, বুজছি। আইজ বেবাক কথা বুজছি আমি। তয় বুইজ্জা নিজে যে মাইয়ামানুষ অইয়া জন্মাইছি হেইডার লেইগা বহুত দুঃখ অইতাছে আমার। ইস, আল্লায় যে ক্যান আমারে মাইয়ামানুষ বানাইয়া পাডাইলো!
একটু থেমে বলল, আমার যেই বইনডা মরছে, মইরা বাইচ্চা গেছে। মাইয়ামানুষ অইয়া বাঁইচ্চা থাকনের থিকা মইরা যাওন অনেক ভাল।
.
তোমার কী অইছে?
বিকালবেলা বড়ঘরের সিঁড়ির মাঝবরাবর উদাস হয়ে বসে আছে কুট্টি। নামার দিক থেকে আমরুজতলা পেরিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল আলফু। কুট্টি তাকে একপলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিল, আগের মতোই উদাস হয়ে গেল। আলফু খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তারপর প্রশ্নটা করল।
কুট্টি আর আলফুর দিকে তাকাল না। পায়ের দিককার সিঁড়ির ধাপগুলির দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করা গলায় বলল, কী অইবো! কিছু হয় নাই।
আমার মনে অয় অইছে।
না।
তয় তোমার মনডা এমুন খারাপ ক্যা?
কুট্টি তবু আলফুর দিকে তাকাল না। আগের মতোই মাথা নিচু করে বলল, আপনে কেমতে বোজলেন আমার মন খারাপ?
বুজা যায়। জ্বরের সমায় থিকা আমি তোমার মনডা বুজি। চরের মাডির লাহান মুলাম তোমার মন।
