হের লেইগা এমুন করবো?
পোলাপানের লেইগা আমার মা-বাপের কোনও মায়া নাই।
নূরজাহান রাগল। মায়া না থাকলে বচ্ছর বচ্ছর হওয়ায় ক্যা?
হেইডা তাগো কে কইবো!
পরির কথা শুনে নূরজাহান টের পাচ্ছিল হঠাৎ করেই যেন কেমন বড় হয়ে গেছে সে। কথাবার্তা চিন্তাভাবনা এমনকী মুখের ভাবভঙ্গিও বড়দের মতো।
কোন ফাঁকে এমন হল পরি? নূরজাহান যে টের পেল না।
আগে তো দুই-চারদিন পর পরই তাদের বাড়ি যেত নূরজাহান। পরির সঙ্গে দেখা হত। আজ দেড়-দুইমাস না হয় বাড়ি থেকে বেরোয় না সে, পরি কেন, তাদের বাড়িতে না এলে গ্রামের কারও সঙ্গেই নূরজাহানের দেখা হয় না। পরির সঙ্গেও হয়নি।
কিন্তু দেড়-দুই মাসে একটি মেয়ে এভাবে বড় হয়ে যেতে পারে! বদলে যেতে পারে!
কথাটা নূরজাহান বলল, পরি, তুই কইলাম বড় অইয়া গেছচ।
নূরজাহানের দিকে তাকাল পরি। হ আমারও মনে অয় আমি বড় অইয়া গেছি।
ক্যান মনে হয় রে?
বহুত কথা চিন্তা করি আমি।
কেমুন কেমুন কথা ক তো আমারে!
নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে পরি বলল, হুইন্না তুমি আমারে পাকনা মাইয়া ভাববা না তো!
নূরজাহান হাসল। না।
আমি কইলাম আইজ এই হগল কথা কওনের লেইগাঐ তোমগো বাইত্তে আইছি।
সত্যঐ?
হ। তুমি তো আমার থিকা অনেক বড়। তুমি বেবাক কিছু জানো। যা জানো বেবাক আমারে বুজাইয়া দিবা।
নূরজাহান চিন্তিত হল। কী বুজাইয়া দিমু তরে?
আমি যা যা জিগামু।
একটু থেমে বলল, যেদিন খুকি অইলো হেদিন মিয়াবাইত্তে গেছিলাম কুট্টি ফুবুর কাছে। ফুবুরেও জিগাইছিলাম দুয়েকহান কথা। ফুবু যা কইলো হেই হগল তো আমি জানিঐ। আমি ক্যা, আমার থিকা ছোড জরিও জানে। কুট্টি ফুকু যুদি বেবাক কথা আমারে হেদিন কইতো তয় মনে অয় আমি আইজ তোমগো বাইত্তে আইতাম না।
নূরজাহান বলল, ও তয় তুই খুকি মরছে দেইক্কা, খুকিরে গোর দেয় নাই দেইক্কা মন খারাপ কইরা আমগো বাইত্তে আহচ নাই? আইছচ আমার লগে ওই হগল প্যাচাইল পারতে?
পরি নির্বিকার গলায় বলল, হ।
একটু চুপ করে রইল নূরজাহান। তারপর বলল, ওই পরি, ছোড অউক আর যাই অউক একজন মানুষ মরল তগো বাইত্তে, তরা কেঐ কান্দচ নাই?
না আমরা ভাইবইনরা কেঐ কান্দি নাই। বাবায় তো নাঐ। বাবার মোক দেইক্কা মনে অইলো মাইয়াডা মরণে হেয় খুশি। খালি মায় ইট্টু উঁ উঁ করলো। হেইডাও আমার মনে অয় অন্তর থিকা না। মাইনষেরে দেহানের লেইগা। অন্তর থিকা যুদি মাইয়াডার লেইগা হের মায়া অইতো তাইলে তো বাবারে কইয়া গোরঐ দেওয়াইতো খুকির!
পরির কথা শুনে নূরজাহান আবার টের পেল, যতটা না বয়স তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি বড় হয়ে গেছে পরি। যেসব কথাবার্তা বলছে, যেভাবে বলছে, পরির বয়সি কোনও মেয়ের এভাবে বলার কথা না। নিশ্চয় সংসারের সবকিছু খেয়াল করতে শুরু করেছে সে, সবকিছু ভাবতে এবং বুঝতে শুরু করেছে। গভীরভাবে সবকিছু নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছে বলেই এভাবে বলতে পারছে।
পরিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে পরির পাশে বসেও আনমনা হয়ে রইল নূরজাহান। বাইরে তখন দুপুর। খা খা করছে রোদ। হাওয়া নাই। ঘরের ভিতরও টের পাওয়া। যাচ্ছে রোদের তাপ। রান্নাচালার পিছন দিককার বাঁশঝাড়ে শিস দিচ্ছে কী একটা পাখি। দুই তিনটা লোভী কাক নেমেছে বাড়ির উঠানে। ভাত চড়িয়ে মাছ কুটতে বসেছে হামিদা। টাকিমাছ। কাকগুলি সেই মাছের লোভে আছে। ফাঁক পেলে যখন তখন মাছের টুকরা নিয়ে উড়াল দিবে।
ভাত চড়াবার আগে এইঘরে একবার এসেছিল হামিদা। পরিকে বলে গেছে, তুই কইলাম অহন যাবি না পরি। নূরজাহানের লগে বইয়া কথাবার্তা ক। দুফইরা ভাত খাইয়া তারবাদে যাবি।
শুনে নূরজাহান বলেছিল, পরি, বাইত্তে কইয়াছচ যে তুই আমগো বাইত্তে আইছচ?
না।
তয় বাড়ির মাইনষে তরে বিচড়াইবো না?
না। বেশি পোলাপানআলা বাইত্তে কেঐ কাঐরে বিচড়ায় না। আর খুকি মরণে আমি তো গেছি আজাইর অইয়া।
কেমতে?
কুলের ভাইডা আছিল মা’র কুলে। বইনডা অওনে মা’র কুল থিকা আইয়া পড়ছিল আমার কুলে। সাতদিন আমার কুলে আছিল। আইজ বইনডা মরণে ভাইডা আবার গেছে গা মা’র কুলে। আমার অহন কোনও কাম নাই। এর লেইগা আমারে কেঐ বিচড়াইবো না।
শুনে হামিদা আর কথা না বলে চলে গিয়েছিল রান্নাচালায়।
যে শাড়িটার পাড় সিলাই করছিল নূরজাহান, শাড়িটা দলা মোচড়া হয়ে আছে চৌকির ওপর। সুই সুতা রাখা আছে শাড়ির উপর। নূরজাহান একবার শাড়িটার দিকে তাকাল, তারপর চৌকির উত্তর দিকে সরে গিয়ে বেড়ার সঙ্গে ঢেলান দিয়ে বসল। হাসিমুখে বলল, আইচ্ছা তয় অহন ক কী কবি?
চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসেছিল পরি। নূরজাহানের দেখাদেখি সেও পা তুলল চৌকিতে তারপর আসনপিড়ি করে বসে ফ্রক টেনেটুনে পায়ের দিক যতটা সম্ভব ঢেকে দিল। দিয়ে বলল, আগে কও, হুজুরের মোকে তুমি ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিলা ক্যা?
আচমকা এই প্রশ্নটা করবে পরি, নূরজাহান কল্পনাও করেনি। সে একটু চমকাল। তারপর বলল, তুই বলে কবি অন্যকথা, এই হগল জিগাচ ক্যা?
যেদিন তুমি কামডা করছ হেদিন বাবায় আর মায় তোমারে লইয়া যেই হগল কথা কইছে হেইডা আমি আঐল থিকা হুনছি। বাবায় তেমুন কিছু কয় নাই, কইছি মায়।
কী কইছে?
কইছে হুজুরের লগে এমুন কাম করছো তুমি, হুজুরের পোলায় তোমারে ধইরা লইয়া যাইবো। নিয়া আকাম কুকাম কইরা তোমার পেটপোট বানাইয়া দিবো। পোলাপান অইয়া যাইবো তোমার।
