কুট্টি কথা বলল না। মন উথালপাথাল করছে। মন আশা করেছিল কী, শুনছে কী!
কুট্টি কেন কথা বলছে না এটা যেন ভেবেও দেখল না আলফু। বলল, ধান কাডন লাগবো বৈশাখ মাসের শেষ মিহি। বাড়িঘর পুকঐর কোনওহানেঐ কাম কাইজ অহন তেমুন নাই। অহনঐ যুদি মাসেকখানি দ্যাশে থাইক্কাহি তয় ভাল অয়। জ্বর থিকা উটছি, বাইত্তে ইট্টু জিরাইয়াও আইলাম।
একথায় কুট্টির কেমন অভিমান হল। বাড়ি না গেলে কি জিরানো আলফুর হবে না? এই বাড়িতে এখন কোনও কাজই নাই। দিনরাত আলফু যদি শুধুই জিরায়, কে তাকে মানা করবে? রাতভর দিনভর সে যদি পড়ে পড়ে ঘুমায়, খাওয়ার সময় উঠে যদি খায়, কে তাকে মানা করবে? তা ছাড়া জ্বরের সময় সে কি টের পায়নি কত মায়ায়, কত যত্নে স্নেহে মমতায় সেবায় কুট্টি তাকে সারিয়ে তুলেছে। বড়বুজান টেরও পায়নি এমন করে খাটাল আর বারান্দার মাঝখানকার দুয়ার খুলে চলে গেছে আলফুর বিছানায়, সারারাত বসে থেকেছে আলফুর শিথানে। মাথায় পানিপট্টি দিছে, হাত বুলায়া দিছে।
প্রথম রাতের পরই বড়বুজানকে কুট্টি বলে দিয়েছিল, আলফুর বহুত জ্বর।
শুনে বুজান বলল, ফাল্গুন চইত মাসে জ্বরজ্বারি অয়। মাথায় বেশি কইরা পানি দিতে কইচ, আর কাজিরপাগলা বাজারে কেঐরে পাডাইয়া আমগো বাড়ির কথা কইয়া করিম ডাক্তারের কাছ থিকা টেবুলেট (ট্যাবলেট) য্যান আইন্না লয়। মাথায় পানি দিলে আর টেবুলেট খাইলে দুই-তিনদিনের মইদ্যে ভাল অইয়া যাইবো। তর কাছে হাটবাজার করনের লেইগা যেই টেকা রাজা মিয়ার মায় দিয়া গেছিলো ওহেন থিকা পাঁচহান টেকা আলফুরে দিচ। টেকাডা বেতন থিকা কাড়া যাইবো। ওই টেকা দিয়া য্যান টেবুলেট আইন্না খায়।
তারপর কুট্টিকে সাবধান করেছেন বড়বুজান। জ্বরজ্বারি অউক আর যাই অউক, পুরুষপোলারা পুরুষপোলাঐ। আহ্লাদ দেহাইতে যাইচ না। ঝামেলায় পইড়া যাবি।
শুনে কুট্টি মনে মনে হেসেছে। ঝামেলায় আর নতুন করে পড়বে কী, পড়ে তো গেছেই। এতদিন দূর থেকে শরীরমন উন্মুখ হয়েছে, কাল রাতে নিঃশব্দে দুয়ার খুলে যখন আলফুর বিছানায় গিয়ে তার জ্বরে পোড়া কপালে হাত দিয়েছে, তারপর থেকে নিজের বলে কুট্টির আর কিছু নাই। সবই আলফুর হয়ে গেছে। শরীর, মন। যদিও কোনওটার ওপরই আলফু এখনও দখল নেয়নি কিন্তু কুট্টির তো ছুটি হয়ে গেছে।
বড়বুজানের কথা কিছুই আলফুকে কুট্টি বলেনি। জ্বরের ঘোরে দিনের বেলা আলফু শুয়ে থেকেছে পশ্চিমের ঘরে, যখন তখন সেই ঘরে গিয়ে পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি এনে বদনার নল দিয়ে পানি ঢেলে গেছে আলফুর মাথায়। রাবির জামাই মতলাকে দিয়ে করিম ডাক্তারের কাছ থেকে ট্যাবলেট আনিয়ে নিয়েছিল, সময় মতো ট্যাবলেট খাওয়াইছে। বুজানের দুধ থেকে দুধ বাঁচিয়ে আটার রুটি আর দুধ খাওয়াইছে, ভাত খাওয়াইছে জোর করে।
দিনভর পশ্চিমের ঘরে থাকলেও সন্ধ্যাবেলা আলফু চলে এসেছে বড়ঘরের বারান্দায়। রাতভর জ্বরে পুড়ত। বুজান টের পাবার ভয়ে শোয়ার সময় মাঝখানকার দরজা বন্ধ করার ভান করেও করত না কুট্টি। আবজায়া রাখত এমন ভাবে, দেখলে যে কেঐ ভাববে দরজাটা বন্ধ। তারপর নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকত কিছুক্ষণ। যখন টের পেত বুজান ঘুমিয়ে গেছে তখন উঠে যেত আলফুর কাছে। শব্দ হবে বলে রাতে মাথায় পানি দিত না, দিত পানিপট্টি। দিত নিঃশব্দে মাথা টিপে।
দুয়েকদিন ধরা পড়ে যেতে যেতেও পড়েনি। গভীররাতে আলফুর মাথা টিপছে কুট্টি, ঘুম ভেঙে বুজান ডাকলেন, কুট্টি ও কুট্টি, ওট বইন। পেশাব করুম।
শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালের মতন পা টিপে টিপে নিজের বিছানায় চলে এসেছে কুট্টি। এসে প্রথমে শুয়ে পড়েছে তারপর যেন বড়বুজানের ডাকে ঘুম ভেঙে উঠেছে, এমন করে উঠে বসেছে।
দিনেরবেলাও হয়েছে এমন। পশ্চিমের ঘরে জুরে অচেতন আলফুর মাথায় হয়তো পানি দিচ্ছে কুট্টি, বড়বুজান ডাকলেন, কুট্টি ও কুট্টি, কই গেলি, আ?
কুট্টি মিথ্যা সাড়া দিয়েছে, আমি রান্নঘরে। কাম সাইরা আইতাছি।
এই বাড়ির মানুষরা হাড় কৃপণ। অসুখ বিসুখের সময় ঝি গোমস্তাকে অষুদবিষুদের পয়সা দিলেও বেতন থেকে পয়সাটা কেটে রাখে। আলফুরটাও রাখবে। কিন্তু জ্বরের সময় কথাটা শুনে মন খারাপ হবে আলফুর এজন্য কথাটা তাকে বলেনি কুট্টি। যার জন্য এত ভাবনা কুট্টির আর সে কিনা জ্বর থেকে উঠেই চলে যেতে চাইছে বাড়ি। মুখে না বললেও কুট্টি তার কথায় বুঝেছে, বউর আদরযত্নের আশায়ই বাড়ি যেতে চাইছে। এদিকে যে একজন মানুষ নিজের দিনরাত হারাম করে, বড়বুজানকে ফাঁকি দিয়ে, নিজের ভিতর থেকে নিজেকে ছুটি দিয়ে মানুষটার সেবা করে গেল তার কথা একবারও ভাবল না? এত করতে পেরেছে যে মানুষটি সে কি আরও পারবে না? বউর কাছে আলফু যা পাবে তা কি কুট্টির কাছে পাবে না?
এসব ভেবে কুট্টি স্তব্ধ হয়ে রইল। বুক ঠেলে উঠতে চাইল গভীর কষ্টের কান্না। কান্নাটা জোর করে রাখল সে।
.
পরির কথা শুনে নূরজাহান হতভম্ব হয়ে গেল। কী কইলি? গোর দেয় নাই খুকিরে? কেঁতা কাপড়ের মইদ্যে পঁাচাইয়া বিলে হালাই দিয়াইছে?
পরি মন খারাপ করা গলায় বলল, হ।
হায় হায় এইডা কেমুন কাম অইলো? তর মায় কিছু কয় নাই?
মায় কইলে বাবায় হের কথা না হুইন্না পারলেতানি? মা-বাবায় দুইজনেঐ চাইছে যে মইরা গেছে তার লেইগা আর টেকাপয়সা খরচা করনের কাম নাই। কাফোনের কাপড়চোপড় কিনতে টেকা লাগতো না?
