দবির বলল, এমুন করতাছ ক্যা মাইয়াডার লগে? মাইয়াডা তো ঘুমাইয়া গেছে।
হ কইছে তোমারে! কিয়ের ঘুম, ও তো জাগনা।
নূরজাহানের দুইহাতে দড়ির মতো ফুটে উঠেছে দড়ির দাগ। সেই দাগ দেখে হায় হায় করে উঠল দবির। হায় হায়রে হাত দুইখান শেষ কইরা হালাইছে মাইয়াডার।
তারপর হাছড় পাছড় করে টেনে কোলে তুলল নূরজাহানকে। ওট মা ওট। আমি দেখতাছি কী অইছে!
নূরজাহান সত্যি সত্যি ঘুমায়নি। বাপের আদরে বুকের ভিতর উথাল দিয়ে উঠল তার অভিমানের কান্না। নাক টেনে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে লাগল সে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, হারাদিন বাইত্তে বইয়া থাকতে ভাল্লাগেনি মাইনষের? বাইর অইলে কী হয়? আমি কি ডাঙ্গর অইয়া গেছিনি, আমার কি বিয়া অইয়া গেছেনি যে বাইত থনে বাইর অইতে পারুম না!
হামিদা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, না ডাঙ্গর অন নাই আপনে, আপনে অহনতরি নাননা (ছোট) বাচ্চা।
এবার হামিদাকে ধমক দিল দবির। এই চুপ করো তুমি। হারাদিন খালি মাইয়াডার লগে লাইগগা রইছে!
তারপর কোল থেকে নামাল নূরজাহানকে। এই আমি তরে ছাইড়া দিলাম মা। যা যেহেনে ইচ্ছা ঘুইরা আয়, দেহি কেডা তরে আটকাইয়া রাখে?
আঁচলে ডলে ডলে চোখ মুছল নূরজাহান। একবার মায়ের দিকে আর একবার বাবার দিকে তাকাল তারপর হি হি করে হেসে বাড়ির নামার দিকে ছুটতে লাগল। চোখের পলকে হিজল ডুমুরে জঙ্গল হয়ে থাকা টেকের ওদিক দিয়ে শস্যের মাঠে চলে গেল। দবির মুগ্ধ চোখে ছুটতে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
উত্তরের হাওয়ায় শাড়ির আঁচল উড়ছে নূরজাহানের, পিঠে দুলছে বেণী, পায়ের তলায় সবুজ শস্যের মাঠ, মাথার ওপর হলুদ রোদে ভেসে যাওয়া বিশাল আকাশ, এই রকম পরিবেশে হরিণীর মতো ছুটতে থাকা নূরজাহানকে বাস্তবের কোনও মানুষ মনে হয় না, মনে হয় স্বপ্নের মানুষ।
এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ক্ষুধার কথা ভুলে গেল দবির। আজ প্রথম গাছ ঝুড়েছে, ভুলে গেল। হামিদার দিকে তাকিয়ে বলল, দেহে, চাইয়া দেহো কত সোন্দর দেহা যাইতাছে মাইয়াডারে। এর থিকা সোন্দর কিছু আল্লার দুইন্নাইতে আছে, কও? বনের পাখিরে কোনওদিন খাঁচায় আটকাইয়া রাকতে অয় না, পাখি যেমতে উইড়া বেড়ায়, বেড়াউক।
হামিদা গম্ভীর গলায় বলল, তোমার আল্লাদে যে কোন ক্ষতিডা একদিন অইবো মাইয়ার, বোজবা। তহন কাইন্দাও কূল পাইবা না।
.
১.১৫
দেশগ্রামের যে কোনও বাড়িতে ঢোকার আগে নিজেকে একটু পরিপাটি করেন মান্নান মাওলানা। মাথার গোল টুপিখানা খুলে টাক পড়া মাথায় একবার দুইবার হাত বুলান তারপর টুপিখানায় দুই তিনটা ফুঁ দিয়ে মাথায় পরেন। নাদুসনুদুস দেহ তাঁর ঢাকা থাকে হাঁটু ছাড়িয়ে বিঘতখানেক নেমেছে এমন লম্বা পানজাবিতে। লুঙ্গি পরেন গুড়মুড়ার ওপরে। লম্বা পানজাবিতে ঢাকা পড়ে থাকার ফলে পায়ের কাছে লুঙ্গির অল্প দেখা যায়। পানজাবি পরেন ঢোলাঢালাই, হলে হবে কী, দিন যত যাচ্ছে, বয়স যত বাড়ছে ভূড়িখানাও ততই বাড়ছে তার। নাভির কাছে গিট দিয়ে পরেন লুঙ্গি। এমনিতেই অতিকায় ভুড়ি তার ওপর লুঙ্গির গিট, পেটের কাছে এসে ঢোলা পানজাবিতেও বেড় পায় না তাঁর দেহ। টাইট হয়ে অনেকটা গেঞ্জির কায়দায় ভুঁড়িতে সেটে থাকে।
মুখখানা মান্নান মাওলানার মাঝারি মাপের চালকুমড়ার মতন। ছোট্ট খাড়া নাকখানার তলা নিখুঁত করে কামানো। দুই পাশের জুলপি থেকে ঘন হয়ে নেমেছে চাপদাঁড়ি। থুতনির কাছে এসে সেই দাঁড়ি যোগ হয়ে নেমেছে বুক বরাবর। বেশ অনেককাল আগেই পাক ধরেছে দাঁড়িতে। তখন থেকেই নিয়মিত মেন্দি (মেহেদি) লাগাচ্ছেন। ফলে পাকা দাঁড়িগুলিতে লাল রঙ ধরেছে, কাঁচাগুলি হয়েছে গভীর কালো।
চোখ দুইটা মান্নান মাওলানার ষাড়ের মতন, যেদিকে তাকান তাকিয়েই থাকেন, সহজে পলক পড়ে না চোখে। যেন কথা বলবার দরকার নাই, হাত পা ব্যবহার করবার দরকার নাই, দৃষ্টিতেই ভস্ম করে ফেলবেন শত্রুপক্ষ। এইজন্য মান্নান মাওলানার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না কেউ। ভুল করে অচেনা কেউ তাকালেও দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে পলকেই সরিয়ে নেয় চোখ।
আজ বিকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন মান্নান মাওলানা। চক বরাবর হাঁটতে শুরু করেছেন, শোনেন খাইগো (খানদের) বাড়ির মসজিদে আছরের আজান হচ্ছে। এই মসজিদের আজান শুনলেই বুকের ভিতর মৃদু একটা ক্রোধ টের পান তিনি। খানেরা কী যেন কী কারণে মান্নান মাওলানাকে একদমই দেখতে পারেন না। বাড়ির লাগোয়া লাখ লাখ টাকা খরচা করে মসজিদ করলেন। চারখানা মাইক লাগালেন মিনারের চারদিকে। দেশগ্রামে বিদ্যুৎ নাই, ব্যাটারিতে চলে মাইক, ব্যাপক খরচ। সেই খরচের তোয়াক্কা করেন না তারা। অবশ্য চারমুখি চারখানা মাইক দেওয়াতে আজানের ললিত সুর হাওয়ার টানে পলকে পৌঁছে যায় চারপাশের গ্রামে। এক মসজিদের আজানে কাজ হচ্ছে অনেক গ্রামের। এ এক বিরাট ছোয়াবের কাজ।
কিন্তু মসজিদ করতে গিয়ে কেন যে নিজ গ্রামের লোকের দিকে তাকালেন না তারা, কেন যে মান্নান মাওলানাকে মসজিদের ইমাম না করে ইমাম আনালেন নোয়াখালী থেকে, এই রহস্য মাথায় ঢোকে না মান্নান মাওলানার। মসজিদ তৈরি হওয়ার সময় সারাদিন ঘুরঘুর করেছেন খান বাড়িতে। মন দিয়ে তদারক করেছেন মসজিদের কাজের, আজানের সময় আজান দিয়েছেন, মসজিদের কাজ করছে যেসব ওস্তাগার জোগালু সেই সব ওস্তাগার জোগালুদের নিয়ে নামাজ পড়েছেন, ইমামতি করেছেন। কিন্তু মসজিদ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর আর ডাক পড়ল না। ক্রোধটা সেই থেকে তৈরি হয়ে আছে মান্নান মাওলানার বুকে। যদিও তিনি বোঝেন ইমাম সাহেবের কোনও দোষ নাই, তাঁকে আনা হয়েছে বলেই এসেছেন, চাকরিও করছেন ধর্মের কাজও করছেন, তার জায়গায় মান্নান মাওলানা হলেও একই কাজই করতেন, তবু ক্রোধটা হয়। পাঁচ ওয়াক্তের আজানে পাঁচবার মনে পড়ে তার ইমামতি আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছেন খান বাড়ির কর্তারা। তার ক্ষমতা চলে গেছে আরেকজনের হাতে। তবু আজান আজানই, যেই দেউক, আজান হলেই নামাজ পড়তে হরে, ধর্মের বিধান।
