কিন্তু যে মানুষটার জন্য এত ছটফটানি কুট্টির, তার সঙ্গে কথা আছে বলে কোথায় চলে গেল সে। মাত্র জ্বর থেকে উঠেছে এই শরীর নিয়ে রোদে বেরুলে জ্বর আবার আসবে।
কুট্টি নিজেই কি একটু খুঁজে দেখবে কোথায় গেল সে। চালতাতলায় নাকি ঘাটপারে? নাকি ছাড়াবাড়ির দিকে গেল! খেতখোলার দিকে যায়নি তো? পাঁচদিনের জ্বরে ঘর থেকে বেরোয়নি। পাঁচদিনে খেতের অবস্থা কী, ইরিধানের চারা কতটা বাড়ল, শরীরের কথা ভুলে এসব দেখতে চলে যায়নি তো!
কুট্টি কি একটু খুঁজে দেখবে?
হাতের কাছে খাদায় ভিজানো হয়েছে ঘইন্না মাছের পুঁটকি। বহুদিন ধরে টিনের পটে ছিল সুঁটকি। বেজায় শক্ত। অত শক্ত সুঁটকি কাটতে গেলে গুঁড়া হয়ে যাবে। ভিজিয়ে নরম করে তবে কাটতে হবে। এভাবে পুঁটকি ভিজিয়ে রেখে অন্যদিকে গেলেই উঠানে তক্কে তক্কে। থাকা কাকগুলি এসে ঢুকবে রান্নাঘরে। খাদায় ভিজানো পুঁটকি ঠোঁটে নিয়ে উড়াল দিবে। পাঁচ ছানা নিয়ে বিড়ালটাও আছে উঠানে। ফাঁক পেলে কাণ্ডটা সেও ঘটাতে পারে। বিড়ালরা সহজে পানির কাছে আসে না। খিদার জ্বালায় আসতেও পারে। খাদায় ভিজানো পুঁটকির। যে দিকটা উপর দিকে আছে কায়দা করে সেখানটাই কামড়ে ধরবে। তারপর যে-কোনও ঘরের পাটাতনের তলায় গিয়ে ছানাদের নিয়ে আরাম করে খাবে। ওদিকে বড়বুজানকে বলা হয়ে গেছে তাকে আজ দুপুরে ঘইন্না মাছের পুঁটকি দিয়ে ভাত খাওয়াবে কুট্টি, আর এদিকে সুঁটকি গেল কাক বিড়ালের পেটে, না এটা ঠিক হবে না।
তা ছাড়া মানুষটাকে নিয়ে এত আদেখলাপানা দেখানোও ঠিক হবে না। মানুষটা তাকে বেহায়া ভাবতে পারে। লোভী ভাবতে পারে। দুনিয়ার বেশিরভাগ পুরুষই মেয়েমানুষের মন বোঝে না। মেয়েরা যা ভাবে, পুরুষরা ভাবে তার উলটা।
তারপরও মানুষটার জন্য অস্থিরতা কুট্টির কমে না। জ্বর থেকে ওঠা দুর্বল শরীরে কোথায় চলে গেল? আসছে না কেন? যে কথা কুট্টিকে বলতে চায় বলছে না কেন? কুট্টি যে উদগ্রীব হয়ে আছে তার কথা শোনার জন্য কেন বুঝতে পারছে না!
এসব ভাবতে ভাবতে পিয়াজ কুটতে বসেছে কুট্টি। ঘইন্না সুঁটকি ম্যালা পিয়াজ দিয়ে ভুনা করতে হয়। প্রথমে তেল মশলা পিঁয়াজ, তারপর পুঁটকির টুকরা ছেড়ে সরার ঢাকনা দিতে হবে কড়াইতে। পুঁটকি সিদ্ধ হয়ে আসার পর থেকে কাঠের হাতায় ডলে ডলে ঘেঁতলাতে হবে। রান্না শেষ হওয়ার পর পুঁটকির চেহারা দাঁড়াবে ভর্তার মতো। গন্ধে ভরে যাবে ঘরবাড়ি। পেটের ভিতর চনচন করে উঠবে ক্ষুধা।
ধারালো বঁটিতে পিয়াজ কুটতে কুটতে কুট্টি বোধহয় আনমনা হয়েছিল। এসময় উঠান থেকে হঠাৎই উড়াল দিল দুটা কাক। কুট্টি বুঝে গেল মানুষটা ফিরেছে। বুকের ভিতরটা অচেনা আবেগে ভরে গেল। একপলক মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ নামাল সে।
কিন্তু মুখটা আলফুর একটু যেন ফরসা লাগছে!
কুট্টি আবার তাকাল। সত্যি মুখ ফরসা লাগছে আলফুর। আট-নয়দিনের দাড়ি মোচ সাফ হয়ে গেছে।
কুট্টি বুঝল এই কাজেই গিয়েছিল আলফুর। তবু বলল, কই গেছিলেন?
রান্নাঘরের তিনদিকে বেড়া আর একটা দিকে কিছু নাই, খোলা। দু-চারদিন পর পর রান্নাঘরের মেঝে পিঁড়া লেপেপুঁছে তকতইকা করে রাখে কুট্টি। রোজ সকালে উঠে রান্নাঘর উঠান এসব ঝট দেয়। ফলে চারদিকটা বেশ পরিষ্কার।
রান্নাঘরের ভোলা দিককার পিড়া বরাবর বসল আলফু। গেছিলাম চাউলতাতলায়। ওহেনে বইয়া মুক বানাইলাম। তারবাদে ঘাডে গিয়া মোক হাত ধুইয়া আইলাম। বেলেড বুলেড রাইক্কা দিছি জাগা মতন।
কুট্টি হাসল। ভাল করছেন। অহন মোকহান সোন্দর অইছে। জ্বরে যা কাহিল না করছিল মোচ দাড়িতে তার থিকা বেশি কাহিল দেহাইতাছিল।
আলফু কথা বলল না। আনমনা হয়ে রইল।
কুট্টি বলল, খিদা লাগছেনি? খাইবেন কিছু?
না, কী খামু কও?
উরুম আইন্না দেই?
না থাউক।
জ্বর থিকা ওডনের পর মাইনষের কইলাম অনেক খিদা লাগে। খিদা লাগলে খাইতে অয়। খাইলে শইল তাড়াতাড়ি ভাল অয়।
আলফু হাসল। না খিদা আমার লাগে নাই। ঘণ্টাহানি পর লাগবো। তহন তো ভাত অইয়া যাইবো।
হ।
তরকারি আইজ কী রানতাছো?
সেচিশাক, ঘইন্না সুঁটকি আর ডাইল।
ঘইন্না সুঁটকির কথা শুনে আলফু খুশি হল। সুঁটকি রানতাছো? ভাল, ভাল। জউরা (জ্বরো) মোকে সুঁটকি দিয়া ভাত খাইতে সাদ লাগবো।
কুট্টি খুশি হল। হ, এইডা আমি জানি। জ্বর থিকা ওডনের পর ইট্টু ঝালঝোল খাইতে মন চায়।
একটু থেমে মাথা নিচু করে কুট্টি বলল, আপনের কথা চিন্তা কইরাঐ পুঁটকিডি আমি আইজ বাইর করছি।
শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আলফু। জ্বরের রাইত থিকা আমারে লইয়া বহুত চিন্তা করো তুমি, না?
কুট্টি লজ্জা পেল। তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে কথা ঘুরাল। আপনে যে কইছিলেন আমার লগে কথার কাম আছে। কী কথা?
আলফু সরল গলায় বলল, না তেমুন কিছু না।
কুট্টি নিভে গেল। আলফুর কথা আছে তার সঙ্গে শোনার পর থেকে যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল শরীর আর মনে, যেরকম ছটফটানি অস্থিরতা, আর যে অপেক্ষাটা ছিল এতক্ষণ ধরে, আচমকাই নিভে গেল সব। কোনওরকমে বলল, তাও কন। হুনি।
আমি ইট্টু দ্যাশে যাইতে চাই।
কুট্টি চমকাল। কী?
হ। বচ্ছর অইয়াইলো দ্যাশে যাই না। দুই-চাইর মাস পর পর মাওয়ার ঘাডে গিয়া দ্যাশের মানুষ বিচড়াইয়া বাইর কইরা তাগো লগে টেকাপয়সা পাড়াই। চউরা দ্যাশের মাইনষে বিক্রমপুর অহন ভইরা গেছে। ঘাডে গেলেঐ আমগো চরের মানুষজন পাওয়া যায়। তয় খালি টেকা দিয়া তো অয় না। বুড়া মায় আছে, বউ পোলাপান আছে তাগো লগে তো ইট্টু দেহাও করন লাগে, না কী কও?
