হামিদার কথায় সেদিনের পর আজ আবার দবির টের পেল নূরজাহানের জন্য কী পরিমাণ টান তার মায়ের। নূরজাহান ছাড়া দুনিয়ার আর কোনও কিছু নিয়েই তার কোনও আগ্রহ নাই।
খুশি হল দবিরগাছি। মনে মনে বলল, নূরজাহানের মা গো, তোমার কাছে আমার আর কিছু চাওনের নাই। আমার মাইয়াডারে তুমি সব সময় এমতে আগলাইয়া রাইখো।
মুখে বলল, তয় আর কী! তয় আমি একলাঐ যাই।
হ যাও।
চকের দিকে নেমে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল দবির। আরেকহান কথা কই?
কও।
পরি আইছে, নূরজাহান আইজ পরির লগে কথাবার্তা কউক।
কউক। আমার অসুবিদা কী?
না কইতাছিলাম আইজ আর অরে কাম কাইজ করতে কইয়ো না। আইজ ও ইট্টু আজাইর থাউক। পরির লগে কথাবার্তা কইয়া দিনডা কাডাউক।
হামিদা হাসল। এইডা তুমি না কইলেও অইতো। আমি আগেঐ চিন্তা করছি আইজ অরে কিছু করতে কমু না। আইজ অর ছুটি।
তয় ঠিক আছে।
দবির খুশিমনে চকের দিকে নেমে গেল।
.
বড়বুজানের সঙ্গে কথা শেষ করে অনেকক্ষণ আগে রান্নাঘরে এসেছে কুট্টি। যে মানুষটার জন্য বড়বুজানের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে আনমনা হচ্ছিল সে, ভিতরে ভিতরে ছটফট করে মরে যাচ্ছিল, কখন কথা শেষ হবে, কখন বড়বুজানের কবল থেকে ছাড়া পাবে, কখন ছুটে যাবে মানুষটার কাছে, সেই মানুষটা নেই কেন? এইটুকু সময়ের মধ্যে কোথায় চলে গেল?
আসলে কি এইটুকু সময়?
না, সময় অনেকখানিই কেটে গেছে। দুই দুইটা মওতের খবরে বড়বুজান খুবই বিচলিত হয়েছিলেন। আজিজ গাওয়ালের মেয়েটার ব্যাপারে কথা কমই বলেছেন, বলেছেন বেশি ধরণীচাচিকে নিয়ে। তার মৃত্যুসংবাদে বড়বুজান কাতর হলেন। কীভাবে কী হল অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিজ্ঞাসা করলেন কুট্টিকে। বাদলার কাছ থেকে যেভাবে যা শুনেছে কুট্টি ঠিক সেভাবেই বড়বুজানকে সব বলল। শুনে বড়বুজান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, নিজের মওতের কথা বললেন। কবে আসবে তার, কখন কীভাবে আজরাইল এসে দাঁড়াবে শিথানে, জান কবচ করবে! দিনের আলোয় নাকি রাতের অন্ধকারে! নাকি দিনরাত্রির মিশেল দেওয়া সন্ধ্যাবেলা, ভোরবেলা! কখন, কখন আসবে মওত!
হয়তো আসবে রাতের অন্ধকারে। ঘরের কোণে তখন নিভুনিভু হয়ে জ্বলবে হারিকেন। পালঙ্কের মুখামুখি পাটাতনের মেঝেতে ঘুমে অচেতন হয়ে থাকবে কুট্টি, দরজার ওপাশের উত্তরের বারান্দায় থাকবে আলফু, পাঁচ ছানা নিয়ে বেড়ালটা চুপচাপ ঘুমাবে পালঙ্কের তলায়, বাইরের অন্ধকার কিংবা চাঁদের আলোয় হু হু করে বইবে গভীর রাতের হাওয়া, ঘুমন্ত গাছের পাতারা তিরতির করে কাঁপবে, গলায় মৃদুশব্দ তুলে উড়ে যাবে রাতচরা পাখিরা, কেউ টের পাবে না এরকম সময়ে আজরাইল এসে দাঁড়িয়েছে দুনিয়ার বহুকালের পুরানা এক মানুষ মিয়াবাড়ির বাসিন্দা বড়বুজানের শিথানে। তোশকের পর তোশক ফেলা নরম বিছানায় শোয়া, শীতকাল হলে থুতনি তরি ঢাকা থাকবে মোটা লেপে, গরমকাল হলে পাতলা চাদরে, এই সবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দেহের অভ্যন্তর থেকে তার রুহ কবচ করে নিয়ে যাবে আজরাইল। পরদিন অনেক বেলা হওয়ার পর হয়তো টের পাবে কুট্টি। তারপর একে একে জেনে যাবে গ্রামের সব মানুষ। খবর যাবে ঢাকায়। রাজা মিয়া আর রাজা মিয়ার মা ছুটে আসবেন। সামান্য একটু কান্নাকাটি। তারপর গোরস্থানে নিয়ে দাফন কাফন। দুই-চারটা দিন তাঁকে নিয়ে টুকটাক কথা বলবে মানুষজন, তারপর ভুলে যাবে। এই তো মানুষের জীবন।
আর যদি দিনেরবেলা হয় বড়বুজানের মউত কুট্টি হয়তো তখন রান্নাঘরে, হয়তো রান্না শেষ করে নাইতে গেছে পুকুরঘাটে, বিকালের মুখে মুখে হয়তো সিঁড়িতে বসে আরামছে মাথা আঁচড়াচ্ছে, কাঁকুইয়ের ফাঁদ থেকে নিজের মাথার উকুন বের করে নিজেই মারছে, ওদিকে সামান্য দূরে যে পালঙ্কে শোয়া মানুষটা মরে যাচ্ছে, টেরও পাবে না।
ভোরবেলা হলে কুট্টি থাকবে থালবাসন ধোয়ার কাজে, সন্ধ্যাবেলা কুপিবাতি জ্বালাবার কাজে, অর্থাৎ যখনই আসুক বড়বুজানের মওত এত কাছে থেকেও কুট্টি উদিস পাবে না।
আলার মা’র মৃত্যুর কথা শুনে নিজেকে নিয়ে এসব কথাই কুট্টিকে বলছিলেন বড়বুজান। কথার কিছু কানে যাচ্ছিল কুট্টির কিছু যাচ্ছিল না। তার মন পড়েছিল রান্নাঘরের সামনে বসা মানুষটার কাছে।
কী কথা সে কুট্টিকে বলবে!
কুট্টিকে চুপ করে থাকতে দেখে বড়বুজান বলেছিলেন, কী অইলো, ওই ছেমড়ি, চুপ কইরা আছচ ক্যা?
কুট্টি আনমনা গলায় বলেছে, কী কমু?
ক কিছু। আমার মরণ লইয়া ক কিছু।
একথায় কেন যে হঠাৎ করে গভীর মমতায় মন ভরে গিয়েছিল কুট্টির। বড়বুজানের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, না এমতে আপনে মরবেন না। আইজ এতডি বচ্ছর আপনেরে আমি দেইক্কা রাকছি, আর আমি উদিস পামুনা আপনে মইরা যাইবেন, এইডা অইবো না। আপনে মরবেন আমার কুলে। আমার চোকের সামনে।
শুনে বুড়া মানুষটা কেঁদে ফেললেন, আল্লায় য্যান হেইডাঐ করে। আলার মা’র লাহান একলা একলা মরণ য্যান আমার না অয়। আর কেঐ না অউক, আমি য্যান তর সামনে মরি।
তারপর কুট্টি তার স্বভাব মতো বদলাল। অইছে, এত মরণ মরণ কইরেন না তো! সহাজে আপনেরে আমি মরতে দিতাছি না। আপনি মরলে আমার উপায় অইবো কী? চুপচাপ হুইয়া থাকেন, আমি রান্নঘরে গেলাম। আইজ আপনেরে ঘইন্না পুঁটকি দিয়া ভাত খাওয়ামু।
